"দিলখুশা" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

(Added Ennglish article link)
 
(Text replacement - "সোহ্রাওয়ার্দী" to "সোহ্‌রাওয়ার্দী")
 
(একজন ব্যবহারকারী দ্বারা সম্পাদিত একটি মধ্যবর্তী সংশোধন দেখানো হচ্ছে না)
২ নং লাইন: ২ নং লাইন:
 
'''দিলখুশা'''  ঢাকার নওয়াবদের একটি বাগানবাড়ি। ঢাকার বর্তমান [[বঙ্গভবন|বঙ্গভবন]] এলাকা এবং এর সংলগ্ন উত্তরের একটি বিরাট জায়গা নিয়ে এটি বিস্তৃত ছিল। উক্ত এলাকায় এককালে মির্জা মুহম্মদের রঙমহল ছিল। এর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হতো একটি বড় খাল। খালটি সংস্কারের পর একটি হ্রদে পরিণত এবং [[মতিঝিল, ঢাকা|মতিঝিল]] নামে পরিচিত হয়। কালক্রমে এলাকাটিও ঐ নামই ধারণ করে।  [[মীরজুমলা|মীরজুমলা]]র নৌবাহিনীর [[দারোগা|দারোগা]] মীর মুকিমের বাড়ি ছিল বর্তমান বঙ্গভবনের পশ্চিম দিকের এলাকায়।  
 
'''দিলখুশা'''  ঢাকার নওয়াবদের একটি বাগানবাড়ি। ঢাকার বর্তমান [[বঙ্গভবন|বঙ্গভবন]] এলাকা এবং এর সংলগ্ন উত্তরের একটি বিরাট জায়গা নিয়ে এটি বিস্তৃত ছিল। উক্ত এলাকায় এককালে মির্জা মুহম্মদের রঙমহল ছিল। এর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হতো একটি বড় খাল। খালটি সংস্কারের পর একটি হ্রদে পরিণত এবং [[মতিঝিল, ঢাকা|মতিঝিল]] নামে পরিচিত হয়। কালক্রমে এলাকাটিও ঐ নামই ধারণ করে।  [[মীরজুমলা|মীরজুমলা]]র নৌবাহিনীর [[দারোগা|দারোগা]] মীর মুকিমের বাড়ি ছিল বর্তমান বঙ্গভবনের পশ্চিম দিকের এলাকায়।  
  
১৮৬৬ সালে নওয়াব [[গণি, খাজা আব্দুল|খাজা আবদুল গণি]] জনৈক ই.এফ স্মিথ সাহেবের নিকট থেকে এ বাগানের পশ্চিমাংশের জায়গাটি ক্রয় করেন। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র [[আহসানুল্লাহ, খাজা|খাজা আহসানুল্লাহ]]র ব্যবহারের জন্য এখানে একটি সুন্দর বাগানবাড়ি তৈরি করেন। এর নাম দেন দিলখুশা অর্থাৎ মনপ্রফুল্ল। নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৭ সালে এ বাগানের পূর্বাংশের ১৫ বিঘা জমি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির নিকট থেকে লিজ নিয়ে এর সীমানা বৃদ্ধি করেন। উল্লেখ্য, একই সময় তিনি সরকারের নিকট থেকে পল্টন এলাকায় ৮০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে [[কোম্পানি বাগান|কোম্পানি বাগান]] নামে একটি পার্ক তৈরি করেছিলেন। #[[Image:দিলখুশা_html_88407781.png]]
+
[[Image:DilkhusaPalace.jpg|thumb|400px|right|দিলখুশা প্রাসাদ]]
 
+
১৮৬৬ সালে নওয়াব [[গণি, খাজা আব্দুল|খাজা আবদুল গণি]] জনৈক ই.এফ স্মিথ সাহেবের নিকট থেকে এ বাগানের পশ্চিমাংশের জায়গাটি ক্রয় করেন। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র [[আহসানুল্লাহ, খাজা|খাজা আহসানুল্লাহ]]র ব্যবহারের জন্য এখানে একটি সুন্দর বাগানবাড়ি তৈরি করেন। এর নাম দেন দিলখুশা অর্থাৎ মনপ্রফুল্ল। নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৭ সালে এ বাগানের পূর্বাংশের ১৫ বিঘা জমি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির নিকট থেকে লিজ নিয়ে এর সীমানা বৃদ্ধি করেন। উল্লেখ্য, একই সময় তিনি সরকারের নিকট থেকে পল্টন এলাকায় ৮০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে [[কোম্পানি বাগান|কোম্পানি বাগান]] নামে একটি পার্ক তৈরি করেছিলেন।
[[Image:DilkhusaPalace.jpg]]
 
 
 
#দিলখুশা প্রাসাদ
 
  
 
দিলখুশা বাগানবাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এখানে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ইমারত ছিল লাল রঙের একটি দ্বিতল প্রাসাদ ভবন। বৃহদাকার এ প্রাসাদ ভবনে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন। ১৮৮৮ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে [[আহসান মঞ্জিল|আহসান মঞ্জিল]] ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নওয়াব সাহেব তাঁর পরিবার পরিজনসহ প্রায় তিন বছর এখানে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর কন্যা মেহের বানু ও জামাতা খান বাহাদুর খাজা মুহম্মদ আজমকে বসবাসের জন্য প্রাসাদটি দান করেছিলেন। এ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশে নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৩ সালে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। দানা-দিঘি নামে পরিচিত উক্ত দিঘির শান বাঁধানো ঘাটের উপর একটি সুন্দর হাওয়াখানা ছিল। এর অদূরে ছিল মানুক হাউস নামে একটি বৃহদাকার ও সুদৃশ্য প্রাসাদ। অাঁকাবাঁকা লেক, বিভিন্ন ধরনের ফোয়ারা, রঙবেরঙের মাছ সম্বলিত চৌবাচ্চা, দেশি-বিদেশি নানা জাতের মনোরম বৃক্ষরাজি, ফল ও ফুলের বাগান দ্বারা দিলখুশা বাগানটি সাজানো ছিল। উক্ত প্রাসাদের চত্বরে বুলবলাইয়া নামে একটি সুদৃশ্য টাওয়ার শোভা পেত। এক স্থানে ৩৬.৫৮ মিটার উচু একটি মাটির কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে তার উপর নির্মাণ করা হয়েছিল একটি সুদৃশ্য বাংলো। বাগানের উত্তরাংশে বারোদুয়ারি নামে চতুর্দিকে খোলা এবং মেঝে মার্বেল পাথরে মোড়া একটি বৈঠকখানা ছিল। এর অদূরে ফুল বাগানের মাঝে সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরের তৈরি সুন্দর একটি অষ্টকোণাকৃতির চন্দ্রাতপ ছিল।  
 
দিলখুশা বাগানবাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এখানে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ইমারত ছিল লাল রঙের একটি দ্বিতল প্রাসাদ ভবন। বৃহদাকার এ প্রাসাদ ভবনে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন। ১৮৮৮ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে [[আহসান মঞ্জিল|আহসান মঞ্জিল]] ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নওয়াব সাহেব তাঁর পরিবার পরিজনসহ প্রায় তিন বছর এখানে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর কন্যা মেহের বানু ও জামাতা খান বাহাদুর খাজা মুহম্মদ আজমকে বসবাসের জন্য প্রাসাদটি দান করেছিলেন। এ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশে নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৩ সালে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। দানা-দিঘি নামে পরিচিত উক্ত দিঘির শান বাঁধানো ঘাটের উপর একটি সুন্দর হাওয়াখানা ছিল। এর অদূরে ছিল মানুক হাউস নামে একটি বৃহদাকার ও সুদৃশ্য প্রাসাদ। অাঁকাবাঁকা লেক, বিভিন্ন ধরনের ফোয়ারা, রঙবেরঙের মাছ সম্বলিত চৌবাচ্চা, দেশি-বিদেশি নানা জাতের মনোরম বৃক্ষরাজি, ফল ও ফুলের বাগান দ্বারা দিলখুশা বাগানটি সাজানো ছিল। উক্ত প্রাসাদের চত্বরে বুলবলাইয়া নামে একটি সুদৃশ্য টাওয়ার শোভা পেত। এক স্থানে ৩৬.৫৮ মিটার উচু একটি মাটির কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে তার উপর নির্মাণ করা হয়েছিল একটি সুদৃশ্য বাংলো। বাগানের উত্তরাংশে বারোদুয়ারি নামে চতুর্দিকে খোলা এবং মেঝে মার্বেল পাথরে মোড়া একটি বৈঠকখানা ছিল। এর অদূরে ফুল বাগানের মাঝে সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরের তৈরি সুন্দর একটি অষ্টকোণাকৃতির চন্দ্রাতপ ছিল।  
  
[[Image:দিলখুশা_html_88407781.png]]
+
[[Image:DilkhusaBulbulaiyaTower.jpg|thumb|400px|left|বুলবলাইয়া টাওয়ার]]
 
+
দিলখুশা বাগান এলাকায় প্রবেশপথের সন্নিকটে একটি কৃত্রিম জলাশয়ে পোষা হতো কয়েকটি কুমির। এর পরেই ছিল একটি খোলা মাঠ। সেখানে পরিবারের সদস্যরা [[খেলাধুলা|খেলাধুলা]] করা ছাড়াও শীতকালে [[ঘুড়ি|ঘুড়ি]] উড়ানোর প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। দিলখুশা বাগানের উত্তর সীমানা-দেয়াল ঘেঁষে পরবর্তীকালে কয়েকটি একতলা ভবন তৈরি করা হয়।  
[[Image:DilkhusaBulbulaiyaTower.jpg]]#দিলখুশা বাগান এলাকায় প্রবেশপথের সন্নিকটে একটি কৃত্রিম জলাশয়ে পোষা হতো কয়েকটি কুমির। এর পরেই ছিল একটি খোলা মাঠ। সেখানে পরিবারের সদস্যরা [[খেলাধুলা|খেলাধুলা]] করা ছাড়াও শীতকালে [[ঘুড়ি|ঘুড়ি]] উড়ানোর প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। দিলখুশা বাগানের উত্তর সীমানা-দেয়াল ঘেঁষে পরবর্তীকালে কয়েকটি একতলা ভবন তৈরি করা হয়।  
 
  
 
দিলখুশা এলাকাটি দুজন সুফি সাধকের জন্যও বিখ্যাত। দিলখুশা বাগানের পশ্চিম প্রবেশদ্বারের উত্তর পাশে অবস্থিত শাহ জালাল দাখিনী (রঃ)-এর দাখিনি মসজিদটি বর্তমানে রাজউক ভবনের চত্বরে রয়েছে।
 
দিলখুশা এলাকাটি দুজন সুফি সাধকের জন্যও বিখ্যাত। দিলখুশা বাগানের পশ্চিম প্রবেশদ্বারের উত্তর পাশে অবস্থিত শাহ জালাল দাখিনী (রঃ)-এর দাখিনি মসজিদটি বর্তমানে রাজউক ভবনের চত্বরে রয়েছে।
 
বুলবলাইয়া টাওয়ার#
 
  
 
উক্ত মসজিদের আঙিনায় শাহ নিয়ামতউল্লাহর মাজার ছাড়াও নওয়াব পরিবারের কন্যা মেহের বানু, শওকত আরা বানু, জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দীন প্রমুখের সমাধি রয়েছে। এছাড়া বঙ্গভবন এলাকায় এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধে শাহজালাল দখিনী সমাহিত আছেন।  
 
উক্ত মসজিদের আঙিনায় শাহ নিয়ামতউল্লাহর মাজার ছাড়াও নওয়াব পরিবারের কন্যা মেহের বানু, শওকত আরা বানু, জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দীন প্রমুখের সমাধি রয়েছে। এছাড়া বঙ্গভবন এলাকায় এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধে শাহজালাল দখিনী সমাহিত আছেন।  
২২ নং লাইন: ১৬ নং লাইন:
 
১৯০৫ সালে ঢাকায় [[পূর্ববঙ্গ ও আসাম|পূর্ববঙ্গ ও আসাম]] প্রদেশের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি দফতর তৈরির প্রয়োজনে দিলখুশা বাগানের দক্ষিণাংশ সরকার লিজ নেয়। উত্তরাংশের এলাকা নওয়াব এস্টেটের অধিকারে থাকে। মাঝখান দিয়ে নির্মিত একটি রাস্তা উভয় অংশকে পৃথক করে ফেলে। ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদের পর সংস্কারের অভাবে বাগানবাড়িটি জরাজীর্ণ হতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের শেষ নাগাদ বাকি অংশটুকুও সরকার এবং ডিআইটি কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করে নেয়।  
 
১৯০৫ সালে ঢাকায় [[পূর্ববঙ্গ ও আসাম|পূর্ববঙ্গ ও আসাম]] প্রদেশের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি দফতর তৈরির প্রয়োজনে দিলখুশা বাগানের দক্ষিণাংশ সরকার লিজ নেয়। উত্তরাংশের এলাকা নওয়াব এস্টেটের অধিকারে থাকে। মাঝখান দিয়ে নির্মিত একটি রাস্তা উভয় অংশকে পৃথক করে ফেলে। ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদের পর সংস্কারের অভাবে বাগানবাড়িটি জরাজীর্ণ হতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের শেষ নাগাদ বাকি অংশটুকুও সরকার এবং ডিআইটি কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করে নেয়।  
  
এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই দিলখুশা বাগানবাড়িতে সংঘটিত হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে জনৈক ইটালিয়ান পন্ডিত এদেশে সংস্কৃত ভাষা চর্চার মান ও অবস্থা সমীক্ষা করতে আসেন। নওয়াব আবদুল গণি এদেশীয় পন্ডিতদের সমন্বয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি দিলখুশা বাগানবাড়িতে একটি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। লে. গভর্নর স্যার স্টুয়ার্ট [[বেইলী, স্যার স্টুয়ার্ট কলভিন|বেইলি]] ঢাকা সফরে এলে ১৮৮৮ সালের ২১ আগস্ট এ বাগানে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। খ্রিস্ট নববর্ষ উপলক্ষে শাহবাগের ন্যায় দিলখুশা বাগানবাড়িতে ১৮৯১ সালে কৃষি ও শিল্প মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। #[[Image:দিলখুশা_html_88407781.png]]
+
এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই দিলখুশা বাগানবাড়িতে সংঘটিত হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে জনৈক ইটালিয়ান পন্ডিত এদেশে সংস্কৃত ভাষা চর্চার মান ও অবস্থা সমীক্ষা করতে আসেন। নওয়াব আবদুল গণি এদেশীয় পন্ডিতদের সমন্বয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি দিলখুশা বাগানবাড়িতে একটি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। লে. গভর্নর স্যার স্টুয়ার্ট [[বেইলী, স্যার স্টুয়ার্ট কলভিন|বেইলি]] ঢাকা সফরে এলে ১৮৮৮ সালের ২১ আগস্ট এ বাগানে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। খ্রিস্ট নববর্ষ উপলক্ষে শাহবাগের ন্যায় দিলখুশা বাগানবাড়িতে ১৮৯১ সালে কৃষি ও শিল্প মেলার আয়োজন করা হয়েছিল।  
 
 
[[Image:DilkhusaManukHouse.jpg]]
 
 
 
#মানুক হাউস
 
 
 
১৯০২ সালে ছোট লাট উডবার্ন ঢাকা সফরে এসে ২২ জুলাই দিলখুশায় নওয়াব [[সলিমুল্লাহ, খাজা|খাজা সলিমুল্লাহ]]র সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৯০৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের নবনিযুক্ত ছোটলাট [[ফুলার, স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড|ফুলার]] সাহেবের স্ত্রী দিলখুশা বাগানে প্রদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মানে এক অভ্যর্থনা সভা করেন। ১৯১৪ সালের ২০ জুলাই গভর্নর লর্ড [[কারমাইকেল, লর্ড|কারমাইকেল]] ও তাঁর পত্নীকে এখানে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এখানে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ডেপুটি প্রেসিডেন্ট মেজর সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে [[সোহ্রাওয়ার্দী, হোসেন শহীদ|হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী]] এবং মওলানা [[ভাসানী, মওলানা আবদুল হামিদ খান|আবদুল হামিদ খান ভাসানী]] এখানে অবস্থিত খাজা নসরুল্লাহর বাড়িতে এক রাজনৈতিক আলোচনায় মিলিত হন।  [মোহাম্মদ আলমগীর]
 
  
'''গ্রন্থপঞ্জি  '''ঢাকা প্রকাশ, ১৮৭৪, ১৮৮৫, ১৮৮৮, ১৮৯১, ১৯০২, ১৯২৪ সাল দ্রষ্টব্য; রহমান আলী তায়েশ, তাওয়ারিখে ঢাকা, আ.ম.ম শরফুদ্দিনের বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৮৫; হাকিম হাবিবুর রহমান, আসুদগানে ঢাকা, মওলানা আকরাম ফারুক ও রুহুল আমীন চৌধুরীর বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৯০।  
+
[[Image:DilkhusaManukHouse.jpg|thumb|400px|right|মানুক হাউস]]
 +
১৯০২ সালে ছোট লাট উডবার্ন ঢাকা সফরে এসে ২২ জুলাই দিলখুশায় নওয়াব [[সলিমুল্লাহ, খাজা|খাজা সলিমুল্লাহ]]র সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৯০৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের নবনিযুক্ত ছোটলাট [[ফুলার, স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড|ফুলার]] সাহেবের স্ত্রী দিলখুশা বাগানে প্রদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মানে এক অভ্যর্থনা সভা করেন। ১৯১৪ সালের ২০ জুলাই গভর্নর লর্ড [[কারমাইকেল, লর্ড|কারমাইকেল]] ও তাঁর পত্নীকে এখানে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এখানে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ডেপুটি প্রেসিডেন্ট মেজর সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে [[সোহ্‌রাওয়ার্দী, হোসেন শহীদ|হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী]] এবং মওলানা [[ভাসানী, মওলানা আবদুল হামিদ খান|আবদুল হামিদ খান ভাসানী]] এখানে অবস্থিত খাজা নসরুল্লাহর বাড়িতে এক রাজনৈতিক আলোচনায় মিলিত হন।  [মোহাম্মদ আলমগীর]
  
[[en:Dilkusha]]
+
'''গ্রন্থপঞ্জি'''  ঢাকা প্রকাশ, ১৮৭৪, ১৮৮৫, ১৮৮৮, ১৮৯১, ১৯০২, ১৯২৪ সাল দ্রষ্টব্য; রহমান আলী তায়েশ, তাওয়ারিখে ঢাকা, আ.ম.ম শরফুদ্দিনের বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৮৫; হাকিম হাবিবুর রহমান, আসুদগানে ঢাকা, মওলানা আকরাম ফারুক ও রুহুল আমীন চৌধুরীর বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৯০।  
  
 
[[en:Dilkusha]]
 
[[en:Dilkusha]]

২১:৫৯, ১৭ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে সম্পাদিত সর্বশেষ সংস্করণ

দিলখুশা  ঢাকার নওয়াবদের একটি বাগানবাড়ি। ঢাকার বর্তমান বঙ্গভবন এলাকা এবং এর সংলগ্ন উত্তরের একটি বিরাট জায়গা নিয়ে এটি বিস্তৃত ছিল। উক্ত এলাকায় এককালে মির্জা মুহম্মদের রঙমহল ছিল। এর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হতো একটি বড় খাল। খালটি সংস্কারের পর একটি হ্রদে পরিণত এবং মতিঝিল নামে পরিচিত হয়। কালক্রমে এলাকাটিও ঐ নামই ধারণ করে।  মীরজুমলার নৌবাহিনীর দারোগা মীর মুকিমের বাড়ি ছিল বর্তমান বঙ্গভবনের পশ্চিম দিকের এলাকায়।

দিলখুশা প্রাসাদ

১৮৬৬ সালে নওয়াব খাজা আবদুল গণি জনৈক ই.এফ স্মিথ সাহেবের নিকট থেকে এ বাগানের পশ্চিমাংশের জায়গাটি ক্রয় করেন। তিনি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর ব্যবহারের জন্য এখানে একটি সুন্দর বাগানবাড়ি তৈরি করেন। এর নাম দেন দিলখুশা অর্থাৎ মনপ্রফুল্ল। নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৭ সালে এ বাগানের পূর্বাংশের ১৫ বিঘা জমি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির নিকট থেকে লিজ নিয়ে এর সীমানা বৃদ্ধি করেন। উল্লেখ্য, একই সময় তিনি সরকারের নিকট থেকে পল্টন এলাকায় ৮০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে কোম্পানি বাগান নামে একটি পার্ক তৈরি করেছিলেন।

দিলখুশা বাগানবাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এখানে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ইমারত ছিল লাল রঙের একটি দ্বিতল প্রাসাদ ভবন। বৃহদাকার এ প্রাসাদ ভবনে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাঁর জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন। ১৮৮৮ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে আহসান মঞ্জিল ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে নওয়াব সাহেব তাঁর পরিবার পরিজনসহ প্রায় তিন বছর এখানে বসবাস করেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁর কন্যা মেহের বানু ও জামাতা খান বাহাদুর খাজা মুহম্মদ আজমকে বসবাসের জন্য প্রাসাদটি দান করেছিলেন। এ বাগানবাড়ির দক্ষিণাংশে নওয়াব আহসানুল্লাহ ১৮৭৩ সালে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। দানা-দিঘি নামে পরিচিত উক্ত দিঘির শান বাঁধানো ঘাটের উপর একটি সুন্দর হাওয়াখানা ছিল। এর অদূরে ছিল মানুক হাউস নামে একটি বৃহদাকার ও সুদৃশ্য প্রাসাদ। অাঁকাবাঁকা লেক, বিভিন্ন ধরনের ফোয়ারা, রঙবেরঙের মাছ সম্বলিত চৌবাচ্চা, দেশি-বিদেশি নানা জাতের মনোরম বৃক্ষরাজি, ফল ও ফুলের বাগান দ্বারা দিলখুশা বাগানটি সাজানো ছিল। উক্ত প্রাসাদের চত্বরে বুলবলাইয়া নামে একটি সুদৃশ্য টাওয়ার শোভা পেত। এক স্থানে ৩৬.৫৮ মিটার উচু একটি মাটির কৃত্রিম পাহাড় বানিয়ে তার উপর নির্মাণ করা হয়েছিল একটি সুদৃশ্য বাংলো। বাগানের উত্তরাংশে বারোদুয়ারি নামে চতুর্দিকে খোলা এবং মেঝে মার্বেল পাথরে মোড়া একটি বৈঠকখানা ছিল। এর অদূরে ফুল বাগানের মাঝে সম্পূর্ণ মার্বেল পাথরের তৈরি সুন্দর একটি অষ্টকোণাকৃতির চন্দ্রাতপ ছিল।

বুলবলাইয়া টাওয়ার

দিলখুশা বাগান এলাকায় প্রবেশপথের সন্নিকটে একটি কৃত্রিম জলাশয়ে পোষা হতো কয়েকটি কুমির। এর পরেই ছিল একটি খোলা মাঠ। সেখানে পরিবারের সদস্যরা খেলাধুলা করা ছাড়াও শীতকালে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতার আয়োজন করত। দিলখুশা বাগানের উত্তর সীমানা-দেয়াল ঘেঁষে পরবর্তীকালে কয়েকটি একতলা ভবন তৈরি করা হয়।

দিলখুশা এলাকাটি দুজন সুফি সাধকের জন্যও বিখ্যাত। দিলখুশা বাগানের পশ্চিম প্রবেশদ্বারের উত্তর পাশে অবস্থিত শাহ জালাল দাখিনী (রঃ)-এর দাখিনি মসজিদটি বর্তমানে রাজউক ভবনের চত্বরে রয়েছে।

উক্ত মসজিদের আঙিনায় শাহ নিয়ামতউল্লাহর মাজার ছাড়াও নওয়াব পরিবারের কন্যা মেহের বানু, শওকত আরা বানু, জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দীন প্রমুখের সমাধি রয়েছে। এছাড়া বঙ্গভবন এলাকায় এক গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিসৌধে শাহজালাল দখিনী সমাহিত আছেন।

১৯০৫ সালে ঢাকায় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি দফতর তৈরির প্রয়োজনে দিলখুশা বাগানের দক্ষিণাংশ সরকার লিজ নেয়। উত্তরাংশের এলাকা নওয়াব এস্টেটের অধিকারে থাকে। মাঝখান দিয়ে নির্মিত একটি রাস্তা উভয় অংশকে পৃথক করে ফেলে। ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদের পর সংস্কারের অভাবে বাগানবাড়িটি জরাজীর্ণ হতে থাকে। পঞ্চাশের দশকের শেষ নাগাদ বাকি অংশটুকুও সরকার এবং ডিআইটি কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করে নেয়।

এ অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনাই দিলখুশা বাগানবাড়িতে সংঘটিত হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে জনৈক ইটালিয়ান পন্ডিত এদেশে সংস্কৃত ভাষা চর্চার মান ও অবস্থা সমীক্ষা করতে আসেন। নওয়াব আবদুল গণি এদেশীয় পন্ডিতদের সমন্বয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি দিলখুশা বাগানবাড়িতে একটি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। লে. গভর্নর স্যার স্টুয়ার্ট বেইলি ঢাকা সফরে এলে ১৮৮৮ সালের ২১ আগস্ট এ বাগানে নওয়াব আহসানুল্লাহ তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। খ্রিস্ট নববর্ষ উপলক্ষে শাহবাগের ন্যায় দিলখুশা বাগানবাড়িতে ১৮৯১ সালে কৃষি ও শিল্প মেলার আয়োজন করা হয়েছিল।

মানুক হাউস

১৯০২ সালে ছোট লাট উডবার্ন ঢাকা সফরে এসে ২২ জুলাই দিলখুশায় নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহর সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৯০৬ সালের ১৮ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের নবনিযুক্ত ছোটলাট ফুলার সাহেবের স্ত্রী দিলখুশা বাগানে প্রদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মানে এক অভ্যর্থনা সভা করেন। ১৯১৪ সালের ২০ জুলাই গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ও তাঁর পত্নীকে এখানে এক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এখানে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার ডেপুটি প্রেসিডেন্ট মেজর সোহরাওয়ার্দীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এখানে অবস্থিত খাজা নসরুল্লাহর বাড়িতে এক রাজনৈতিক আলোচনায় মিলিত হন।  [মোহাম্মদ আলমগীর]

গ্রন্থপঞ্জি ঢাকা প্রকাশ, ১৮৭৪, ১৮৮৫, ১৮৮৮, ১৮৯১, ১৯০২, ১৯২৪ সাল দ্রষ্টব্য; রহমান আলী তায়েশ, তাওয়ারিখে ঢাকা, আ.ম.ম শরফুদ্দিনের বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৮৫; হাকিম হাবিবুর রহমান, আসুদগানে ঢাকা, মওলানা আকরাম ফারুক ও রুহুল আমীন চৌধুরীর বঙ্গানুবাদ, ঢাকা, ১৯৯০।