ঘুড়ি


ঘুড়ি  সাধারণত কাগজ, সিল্কের কাপড় ও অন্য কোনো পাতলা জিনিস দিয়ে তৈরি সমদ্বিবাহু আকৃতির আকাশে উড়ানোর একটি খেলনা। এটি অর্ধবৃত্তাকার কাঠামোর উপর তৈরি করা হয় এবং উড়ার সময় যাতে ভারসাম্য থাকে সে জন্য এতে একটি লেজ জুড়ে দেওয়া হয়। ঘুড়ির এক পিঠ সমতল, এর লেজ ভারসাম্য রক্ষা ছাড়াও ঘুড়িকে নিয়ন্ত্রিত এবং স্থিরভাবে উড়তে সহায়তা করে। ঘুড়ির সাহায্যে মানুষ আকাশে উড়তে সক্ষম। এটি অযান্ত্রিক আকাশযান হিসেবেও ব্যবহূত হতে পারে। ধারণা করা হয় যে, আলেকজান্ডার উইলসন স্কটল্যান্ডে প্রথম আবহাওয়াবিদ্যা বিষয়ক তথ্য জানতে ঘুড়ি ব্যবহার করেন। ১৭৪৯ সালে তিনি ঘুড়ির সঙ্গে থার্মোমিটার বেঁধে আকাশে উড়িয়ে দেন। ১৭৫২ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বিজলি ও বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণার জন্য ঘুড়ি ব্যবহার করেন। ১৮৯৩ সালে লরেন্স হারগ্রেভ নামে একজন অস্ট্রেলিয়ান বক্স ঘুড়ি আবিষ্কার করেন এবং তা আবহাওয়াবিদ্যা ও বায়ুগতিবিদ্যা অধ্যয়নে সফলভাবে ব্যবহার করেন। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল উড়োজাহাজ নির্মাণের সমস্যা পরীক্ষা করতে গিয়ে চতুর্ভুজাকৃতির ঘুড়ি ব্যবহার করেন।

ভুয়াদর ঘুড়ি
ছাতা ঘুড়ি
কচ্ছপ ঘুড়ি
লাটিম ঘুড়ি
প্রজাপতি ঘুড়ি
তারা ঘুড়ি

চীন, জাপান ও অন্যান্য পূর্ব এশীয় দেশে ঘুড়ি তৈরি শত শত বছর ধরে জনপ্রিয় এবং ঘুড়ি উড়ানো একটি বিনোদন ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা ঘুড়ি উড়ানো উপভোগ করে। বাংলাদেশসহ অনেক এশীয় দেশে শীতকাল এবং গ্রীষ্মকালের শেষভাগে ঘুড়ি উড়ানোর খেলা প্রায় উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশাল আকৃতির ঘুড়ি এক নাগাড়ে বহুদিন আকাশে উড়তে দেখা যায়।

মুগল আমলে ঢাকার অভিজাত লোকজনের বিবিধ বিনোদনের মধ্যে ঘুড়ি উড়ানো ছিল অন্যতম। কোনো কোনো সূত্রমতে ১৭৪০-এর দশকে নায়েব-ই-নাজিম  নওয়াজিশ মুহম্মদ খান-এর আমলে ঘুড়ি উড়ানো  উৎসব একটা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। তখন থেকেই বাণিজ্যিক আকারে ঘুড়ি তৈরি শুরু হয় এবং বাড়ির ছাদ, খোলা জায়গা বা উন্মুক্ত ময়দান থেকে আকাশে প্রচুর সংখ্যক ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। বর্তমানকালেও ঢাকায় ঘুড়ি তৈরি ও বিক্রয়ের দোকান দেখা যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রামের লোকজন ধর্মীয় উৎসবের সময় ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা একবার ঘুড়ির ডোর সংকুচিত করে আবার ছেড়ে দেয় আর এভাবে তারা ঘুড়ি উড়ানো খেলা দেখায় এবং কৌশলে বাতাসে ঘুড়ি চালনা করে। সহজতর প্রতিযোগিতার বিষয় হচ্ছে কত উপরে ঘুড়ি উঠানো যায় কিংবা ঘুড়ির অলঙ্করণ কত চমৎকার করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা হচ্ছে সুতা কাটাকাটি এবং এতে শেষ পর্যন্ত যে টিকে থাকে সে হয় চ্যাম্পিয়ন। ঐতিহাসিক বিবরণ ও রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ১৮ এবং ১৯ শতকে ঢাকার অভিজাত লোকেরা ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতার টিমকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন।

ঘুড়ি নির্মাণ শিল্পে জ্যামিতিক জ্ঞানের প্রয়োজন আছে এবং নকশা তৈরি ও বিভিন্ন উপাদান যেমন খিল, পটি, লাটাই ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়। যথাযথ আকার ও ওজনের পরিমাপে ঘুড়ি তৈরি না হলে ঠিকভাবে তা উড়বে না অথবা কিছুদূর উপরে উঠার পর শুধু ঘুরতে থাকবে। সাধারণত ঘুড়ি দুই প্রকারের সুতাওয়ালা ঘুড়ি এবং সুতাবিহীন ঘুড়ি। সুতাওয়ালা ঘুড়ির মধ্যে আছে গুড্ডি, ঢাউশ, চং, চোঙা আর সুতাবিহীন ঘুড়ির মধ্যে আছে ফানুস, বেলুন, হাউই, উড়োজাহাজ, রকেট ইত্যাদি। বিভিন্ন প্রকারের ঘুড়ির মধ্যে গুড্ডিই বেশি জনপ্রিয়। সাধারণত এ ঘুড়ি বর্গাকার আকৃতিতে বানানো হয় এবং কিছু কিছু রম্বসাকৃতি ও চতুর্ভুজাকৃতির হয়ে থাকে। এ প্রকারের ঘুড়ির একটি ধরন হলো সাপ ঘুড়ি বা সাপা। এটার লম্বা লেজ থাকে যা দেখতে সাপের মতোই। মাছ বা প্রজাপতির আকারেও ঘুড়ি বানানো হয়। ঢাউশ শব্দ থেকে বোঝা যায় এটা বিশাল আকৃতির উপবৃত্তাকারের ঘুড়ি। আকাশে উড়ার সময় দেখতে অনেকটা উড়ন্ত চিলের মতো লাগে বলে একে অনেক সময় চিলি বলা হয়। বড় আকৃতির অন্য একটি ঘুড়ির নাম উড়োজাহাজ ঘুড়ি। এটি ক্ষুদ্র আকাশযানের আকারে আকাশের অনেক উপরে উড়ে এবং এটিকে উড়ানোর জন্য শক্ত সুতা বা ডোরের প্রয়োজন হয়। অন্য এক ধরনের ঢাউশ ঘুড়ি হলো ঢোপ। এটি একটি ত্রিমাত্রিক আকাশযান, যা জেট বিমানের মতো উড়ে। চং ঘুড়ি দেখতে অনেকটা ট্রাপিজিয়ম-এর মতো, যার উপরের আর নিচের বাহু দুটো পরস্পর সমান্তরাল এবং উপরের বাহু নিচের বাহু অপেক্ষা নয় থেকে আঠারো সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় থাকে। কিছু কিছু চং ঘুড়ি দেখতে মানুষের মতোই। তাই এটাকে মানুষ চং বলা হয়। এটা উড়ানো হয় রাতে এবং এর দুহাতে দুটো মশাল জ্বালিয়ে দেওয়া হয় আর সে আলোতে এটাকে দেখা যায় হেলে-দুলে হাত পা নেড়ে আকাশে উড়তে। সুতাবিহীন ঘুড়ির মধ্যে অন্যতম সুন্দর হলো ফানুস। এটা বেশ প্রাচীন এবং বানাতেও সহজ। ফানুস আসলে মুখ খোলা বিরাট আকারের বেলুন। ফানুসের নিচের দিকে একটা প্রশস্ত মুখ থাকে। অবশ্য দেহের আয়তনের তুলনায় মুখটা সরু। মুখটা খোলা থাকে এবং একটা খিল বৃত্তাকারে বাঁকিয়ে মুখটা গোল করে প্রস্ত্তত করা হয়। ফানুসের সমস্ত দেহটা পাতলা কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয়। ফানুসের মুখের নিচে লোহার একটা শিক ঝুলানো থাকে। ঝুলন্ত শিকটার মাঝখানে তুলা বা ন্যাকড়া জড়িয়ে যে কোনো দাহ্য তেল দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া হয়। উড়ানোর সময় ফানুস মশালের মতো শিখাসহ জ্বলতে থাকে আর ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে থাকে। ফানুস আকাশে কয়েক মাইল পর্যন্ত উড়ে থাকে। বলা হয় যে, ফানুস থেকে মানুষ উড়ন্ত বেলুনের ধারণা লাভ করেছে এবং এক অর্থে ঘুড়ি সামগ্রিকভাবে মানুষকে বায়ুগতিবিদ্যা চর্চা করতে শিখিয়েছে, পরবর্তী সময়ে যা উড়োজাহাজ নির্মাণে অবদান রেখেছে।  [সাদাত উল্লাহ খান]