তুলা


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১৬:৩৫, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

তুলা  Malvaceae গোত্রের Gossypium গণের অাঁশ উৎপাদক অর্থকরী ফসল। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ছিল তুলা চাষের জন্য প্রসিদ্ধ। ঢাকা জেলার তুলা ছিল সর্বোৎকৃষ্ট। এ তুলার সুতা থেকেই তৈরি হতো ঢাকাই মসলিন

ক্ষেত থেকে তুলা আহরণ

তুলা সাধারণত ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলে ভাল জন্মে। ৪০° উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২০° দক্ষিণ অক্ষাংশে অবস্থিত অঞ্চলে তুলার চাষ বেশি হয়। সমতল বা ঢালু জমি তুলা চাষের উপযোগী। তুলা চাষের জন্য উর্বর দো-অাঁশ মাটি প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে তাপ ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত উভয়ই প্রয়োজন হয়। তুলার বোল বের হলে আর্দ্র ও শুষ্ক রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার প্রয়োজন। সামুদ্রিক আবহাওয়া তুলা চাষের সহায়ক। তুলা লাগানোর সময় জুলাই মাসের মাঝামাঝি আর ফসল তোলা হয় শেষ মধ্য-জানুয়ারিতে। পরিণত গাছ থেকে তিনবার ফসল তোলা যায়। অতঃপর এ জমিতে শীতের  শাকসবজিপাট বা আউশ ধান ফলানো যায়। বাংলাদেশে উৎপন্ন তুলার জাত (cultivar) হলো আমেরিকান তুলা (Gossypium hirsutum)। এটিকে মেঠো-তুলাও বলে, কেননা সমতলে জন্মে। শিমুল তুলা চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বন ছাড়াও দেশের সর্বত্র জন্মে। অন্যদিকে কুমিল্লা-তুলা (Gossypium arboreum) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় জন্মে। উল্লেখ্য যে পাহাড়িরা তুলার জন্য মুগল সরকারকে রাজস্ব প্রদান করত। পাহাড়ি নারীরা তুলা থেকে সুতা করে নানারকম কাপড় বুনতো। নিজের কাপড় নিজে বুনন করার প্রথা এখনও লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি জাতের এ তুলা আদিবাসীরা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে, অর্থাৎ রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ও বান্দরবান জেলাসমূহে সীমিত পরিমাণে চাষ করে। এ তুলার সুতা উৎকৃষ্ট মানের না হওয়ায় এটি মূলত কুটির শিল্পে ব্যবহূত হয়, যদিও কিছুটা রপ্তানি করা হয়। উৎপন্ন ফসলের পরিমাণও খুব কম, হেক্টরপ্রতি মাত্র ১০ কিলোগ্রাম।

বাংলাদেশে প্রায় ১১,৭৬৩ হেক্টর জমিতে মেঠো-তুলার চাষ হয়। দেশে বার্ষিক উৎপন্ন তুলার পরিমাণ প্রায় ২১,২৯৫ মে টন যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার মাত্র ১৬% মেটায়। তুলা চাষের দায়িত্বে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ  তুলা উন্নয়ন বোর্ড। এ সংস্থা চাষিদের ভাল বীজ ও তুলা চাষের প্রয়োজনীয় পরামর্শ যোগানের জন্য তিনটি বীজ উৎপাদন কেন্দ্র পরিচালনা করে, তবে বেশির ভাগ চাষিই নিজ ক্ষেত থেকে বীজ সংগ্রহ করে।

প্রাচীনকাল থেকেই চীন, ভারত ও মিশরে তুলার ব্যবহার হয়ে আসছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ তুলা বস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহূত হয়। বাকি ২৫ শতাংশ কার্পেট, পর্দা, গৃহস্থালির রকমারি জিনিস তৈরির জন্য এবং অবশিষ্ট তুলা শিল্পের বিভিন্ন কাজে ব্যবহূত হয়ে থাকে। তুলার বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়। তুলা গাছের কাঠ নরম, হালকা, টেকসই নয়। দিয়াশলাই বাক্স ও কাঠি তৈরিতে এ কাঠ ব্যবহূত হয়। এছাড়া প্যাকিং বাক্স, খেলনা, নিম্নমানের পেনসিল ইত্যাদি তৈরিতে তুলা গাছ ব্যবহূত হয়।

পৃথিবীর প্রধান তুলা উৎপাদনকারী দেশসমূহের মধ্যে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও মিশর উল্লেখযোগ্য। তুলা উৎপাদনে চীন পৃথিবীর মধ্যে শীর্ষে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। চীনের তুলা তেমন উন্নতমানের নয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলা খুবই উন্নতমানের। মিশরের নীল নদের অববাহিকায় প্রচুর উচ্চমানের তুলার চাষ হয়ে থাকে।  [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই চাষের প্রায় সব পর্যায়েই কতকগুলি কীটপতঙ্গ তুলা ফসলের ক্ষতি করে। বাংলাদেশে প্রায় ২৪টি ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পটেড বোলওয়ার্ম (Earias vittella), আমেরিকান বোলওয়ার্ম (Helicoverpa armigera), গোলাপি বোলওয়ার্ম (Pectinophora gossypiella), জাবপোকা (Aphis gossypii) এবং লাল মাকড় (Tetranychus species) সর্বাধিক ক্ষতি করে। অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার মধ্যে থ্রিপস, গান্ধিপোকা, মিলিবাগ, চুঙ্গিপোকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বেশ কয়েকটি রোগ দ্বারা তুলাগাছ আক্রান্ত হলেও এর মধ্যে ফিউজেরিয়াম উইল্ট, ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট, অ্যাঙ্গুলার লিফ স্পট, ড্যাম্পিং অফ, অ্যানথ্রাকনোজ, এবং লিফ স্পট উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য তুলা উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে তুলার রোগের প্রাদুর্ভাব মোটামুটিভাবে কম।

তুলার ফিউজারিয়াম উইল্ট (fusarium wilt) রোগ হয় Fusarium oxysporum নামের এক ছত্রাকের সংক্রমণে। তুলাগাছের বয়স যখন ১-৩ সপ্তাহ তখন সাধারণত শিকড়ের মাধ্যমে এ রোগজীবাণু গাছের দেহে প্রবেশ করে। গাছ যখন ৫-৬ সপ্তাহের হয় তখন এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত এবং পাতা ও ফল ছোট আকারের হয়ে থাকে। বেশিমাত্রায় আক্রান্ত হলে পাতা ক্রমে হলুদ ও পরে বাদামি রং ধারণ করে। অনেক সময়ে মূলের অগ্রভাগ কালো হয়ে যায় এবং আক্রান্ত কচি গাছ মারা যায়।

ব্যাকটেরিয়াল ব্লাইট (bacterial blight) বা পাতা ধসা রোগ সৃষ্টি হয় Xanthomonas malvacearum নামে এক ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে। তবে বাংলাদেশে এ রোগ তেমন দেখা যায় না। চারা ধসা রোগ (damping off disease) Rhizoctonia solani নামের এক ছত্রাকের সংক্রমণে দেখা দেয়। এটি তুলার চারার একটি মারাত্মক রোগ। স্যাঁতসেঁতে ভেজা মাটিতে জন্মানো গাছে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। কিউপ্রাভিট, কপার অক্সিক্লোরাইড, বা ডায়াথেন-এম ছত্রাকনাশক দ্বারা নিয়ন্ত্রণ না করলে এ রোগে অনেক চারা মারা যাবার সম্ভাবনা থাকে। তুলাগাছের অ্যানথ্রাকনোজ (anthracnose) রোগ হয় Glomerala gossipii নামের এক ছত্রাকের আক্রমণে। এ রোগে চারা এমনকি গঠন্মুখ ফল (boll) আক্রান্ত হয়ে থাকে। এতে পাতার উপর, কান্ডে এবং ফলের উপর বৈশিষ্ট্যময় দাগ তৈরি হয় এবং এ অংশগুলি এক সময়ে পচে যেতে থাকে। কুষ্টিয়া এবং চুয়াডাঙ্গা এলাকায় এ রোগ বেশি চোখে পড়ে। বিভিন্ন রোগ আক্রমণ থেকে তুলাগাছ সংরক্ষণের জন্য বীজ শোষণ এবং ছত্রাকনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়।  [এম ইব্রাহীম আলী]

আরও দেখুন তন্তু-ফসল; তুলা উন্নয়ন বোর্ড।