তন্তু-ফসল


তন্তু-ফসল (Fibre crop)  শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার্য তন্তুবস্ত্ত উৎপাদক ফসল। তন্তু-ফসলের মধ্যে আছে নানা ধরনের অাঁশ-উৎপাদক উদ্ভিদ যেগুলি একটি দেশের বিশেষ আবহাওয়া ও জলবায়ুগত অবস্থায় বর্ষজীবী ও মৌসুমি ফসল হিসেবে জন্মায়। এসব ফসল গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হিসেবে বিবেচিত। এক সময়ে কাঁচাপাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। অর্থকরী অাঁশ-উৎপাদক ফসলগুলি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বার্ষিক উৎপাদন, গুণাগুণ ও উৎপন্ন দ্রব্যের নিরিখে তন্তু-ফসলকে নরম ও শক্ত, লিগনিনযুক্ত ও লিগনিনবিহীন, এবং মুখ্য ও গৌণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। মিহি পোশাক, পরিধেয় বস্ত্র, শিল্পে ব্যবহূত মোড়ক হিসেবে চট, বস্তা, থলে, গালিচার তলা, পাকানো সুতা, সজ্জাবস্ত্র, মাদুর, ওয়াল-কভার, হস্তশিল্প, জুটন ও পাটমিশ্রিত পণ্য, শোভাবর্ধক ও নান্দনিক সামগ্রী, সেলুলোজ-জাত বস্ত্ত, মিশ্র-সামগ্রী, আকরিকজাত ও কৃষিজ বস্ত্র, চিকিৎসায় ব্যবহার্য কাপড়, কাঠের বিকল্প, মন্ড ও কাগজ প্রভৃতি তৈরিতে প্রাকৃতিক অাঁশ ব্যাপক ভাবে ব্যবহূত হয়।

বাংলাদেশের প্রধান তন্তু-ফসল: ১. পাট, ২. মেস্তা, ৩. তুলা ও ৪. শণপাট। নারিকেল ছোবড়ার অাঁশ, আনারস পাতার অাঁশ, কলাগাছের কান্ডের অাঁশ এবং শিমুল তুলার অাঁশও বিভিন্ন কাজে লাগে।

সারণি  পাট ও অন্যান্য তন্তু-ফসলের চাষের মোট জমি ও উৎপাদনের পরিমাণ (২০০৭-০৮)।

অাঁশের নাম চাষাধীন জমি (হে.) উৎপাদন (বেল)
পাট ৪,৪০,৭০২.৬৬ ৪৬,২২,০০০
তুলা (গ্রীষ্মকালীন) ৩৮,৩১,৯৬৮.৩৫ ২৬,৯২,০০০
তুলা (শীতকালীন) ৪৯,৯১,৩৯২.৭১ ১,২৩,৫৭,০০০
শণপাট ৬৭,৫৮২.৫০ ১,৭৯,০০০

বাংলাদেশের প্রধান তন্তু-ফসল পাট ও মেস্তার মধ্যে উৎপাদন, শিল্পজাতকরণ, রপ্তানি, চাষাধীন এলাকা, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও শিল্প ইত্যাদি দিক বিবেচনায় সার্বিকভাবে পাট সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাদা ও তোষা পাট হিসেবে পরিচিত যথাক্রমে Corchorus capsularisC. olitorious প্রজাতি দুটির কান্ড থেকে প্রাপ্ত লিগনিনযুক্ত বাস্ট-অাঁশই পাট। Hibiscus cannabinus প্রজাতির অাঁশ কেনাফ নামে পরিচিত।

বীজ বপণ ও ফসল তোলার সময়ের কিছুটা পার্থক্য সত্ত্বেও পাট ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তন্তু-ফসল অল্পবিস্তর প্রায় একইভাবে ফলানো হয়। পাটের অাঁশের শারীরবৃত্তীয় ও ভৌত ধর্মাবলি মেস্তার অাঁশ অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। এসব ফসল লবণাক্ত ও পাহাড়ি অঞ্চল ব্যতীত প্রায় সারা দেশে চাষ করা যায়। পাটের তুলনায় মেস্তা অধিকতর প্রতিকূল পরিবেশে জন্মাতে পারে। পাট ও অন্যান্য তন্তু-ফসলের চাষাধীন মোট জমি এবং উৎপাদনের পরিমাণ যথাক্রমে ৯৬৪৯৬৭ একর ও ৪০৩৪৫৮৯ বেল। অবশ্য, মোট চাষাধীন জমি ও উৎপাদনের বার্ষিক পরিমাণে তারতম্য ঘটে যা স্থানীয় বাজার ও বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের অভ্যন্তরে পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার সাধারণত ১০ শতাংশের অধিক নয়।

Malvaceae গোত্রের তন্তু-ফসল মেস্তার (Hibiscus sabdariffa) দুটি জাত বাংলাদেশে রয়েছে। এর একটি শাখাপ্রশাখাযুক্ত, প্রায় ২ মিটার উঁচু, বৃতি মাংসল ও বর্ধিত। এর ফল থেকে খাবার উপযোগী জ্যাম, জেলি ইত্যাদি তৈরি করা যায়। দ্বিতীয় জাতটি লম্বা, খাড়া, শাখাপ্রশাখাবিহীন ও বৃতিধর। লাল ও সবুজ রঙের কান্ড থেকে দু’টি জাত পৃথক করা যায়। মেস্তা-অাঁশের গঠন, অঙ্গসংস্থান, ভৌত ও রাসায়নিক উপাদান পাট ও কেনাফের মতোই। এগুলির পার্থক্য প্রধানত আনুপাতিক। মেস্তা-বীজে ১৬-২০% তেল থাকে।

তুলা Gossypium গণভুক্ত একাধিক প্রজাতির বীজলগ্ন অাঁশ দিয়ে গঠিত নরম, সাদা ও তুলতুলে পদার্থ যা সুতা, কাপড় প্রভৃতি তৈরিতে ব্যবহূত হয়। তুলাগাছ সাধারণত ১-২ মিটার উঁচু, ফুল সাদাটে এবং শুঁটি বা বোল তুলতুলে অাঁশে ভরে উঠলে ফেটে যায়। বোল সংগ্রহের পর তুলা থেকে বীজ ছড়ানো ও পরিষ্করণের মাধ্যমে অাঁশ পৃথক করা হয়। তুলায় প্রায় ৯৫% সেলুলোজ এবং সামান্য পরিমাণ প্রোটিন, পেক্টিন ও মোম থাকে। অাঁশের দৈর্ঘ্য, পুরুত্ব ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অাঁশকে বাণিজ্যিকভাবে শ্রেণিবিভক্ত করা হয়।

তুলার অাঁশ হালকা, টেকসই ও চকচকে, নানা ধরনের পোশাক, সজ্জা ও অন্যান্য সামগ্রী প্রস্ত্ততে ব্যবহার্য। তুলাবীজচূর্ণ থেকে প্রাপ্ত তেল, মারজারিন, ভোজ্যতেল, সাবান প্রভৃতি তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়। বর্তমানে স্থানীয় বস্ত্রশিল্পে ব্যবহূত বেশিরভাগ তুলা আমদানি করা হলেও দেশে প্রায় ২৯,০৫৫ একর জমি থেকে প্রায় ২১,২৯৫ বেল তুলা উৎপন্ন হয়। বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, কুষ্টিয়া ও রাজশাহী বাংলাদেশের প্রধান তুলা উৎপাদনকারী অঞ্চল। এখানে উৎপন্ন তুলার অাঁশের দৈর্ঘ্য মধ্যম থেকে খাটো-মধ্যম ধরনের। একটি বিশেষ ধরনের খাটো অাঁশের তুলা কুমিল্লায় ফলানো হয়।

শিমুল তুলা (Bombax species) নামে পরিচিত আরেক ধরনের স্থানীয় তন্তুসামগ্রী (কাপক) সারাদেশে, বিশেষত বৃহত্তর ময়মনসিংহে বেশি পাওয়া যায়। এটি সাধারণত বালিশ ও তোশক তৈরিতে ব্যবহূত হয়। শিমুলকাঠে দিশলাইয়ের কাঠি তৈরি হয়। নারিকেলের (Cocos nucifera) ছোবড়ার অাঁশ মাদুর, রশি প্রভৃতি তৈরিতে লাগে। এ ধরনের উন্নতমানের তন্তু দিয়ে ব্রাশ বানানো হয়। অতিসম্প্রতি ছাঁকনি, মালচিং ম্যাট ইতাদি ছোবড়ার অাঁশভিত্তিক সামগ্রী কৃষিকাজে ব্যবহূত হচ্ছে। নারিকেল গাছ প্রধানত দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বরিশাল, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে জন্মে। মাদুর ও রশি তৈরির জন্য দেশে কয়েকটি ছোবড়া-শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। ছোবড়া থেকে অাঁশ পৃথকীকরণে ছোবড়া লবণাক্ত পানিতে রাখলে পচনক্রিয়া তরান্বিত হয়। ছোবড়া নরম হওয়ার পর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে, ধুয়ে ও শুকিয়ে অাঁশ আলাদা করা হয়।

শণপাট Leguminosae গোত্রের Crotalaria juncea  প্রজাতির বাকলযুক্ত তন্তু-ফসল। শণগাছের পাতা সবুজ সার হিসেবে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। শণের অাঁশ নরম ও অপেক্ষাকৃত কম লিগনিনযুক্ত হওয়ায় এর ব্যবহার প্রধানত পাকানো সুতা, রশি, কাগজ ও মাছের জাল তৈরিতেই সীমাবদ্ধ। এর চাষাবাদ পদ্ধতি পাটের মতোই। সাধারণত রাজশাহী, রংপুর, যশোর ও বগুড়ায় শণচাষ হয়। দুই মৌসুমেই এটি ফলে এবং তদনুযায়ী এ ফসল ভাদই-শণ ও রবি-শণ নামে পরিচিত। [এ.বি.এম আবদুল্লাহ]

আরও দেখুন তুলা; পাট