চৌধুরী, নওয়াব আলী


চৌধুরী, নওয়াব আলী (১৮৬৩-১৯২৯)  জমিদার, সমাজ সেবক ও রাজনৈতিক নেতা। তিনি ১৮৬৩ সালে তাঁর মাতামহ ও নাটোরের জমিদার মুহম্মদ আলী খান চৌধুরীর বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জনাব আলী চৌধুরী ছিলেন টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ীর জমিদার। তাঁর মাতার নাম রাবেয়া খাতুন চৌধুরী। নওয়াব আলী চৌধুরী নিজেকে হযরত আবু হানিফার (৬৯৯-৭৬৭) বংশধর বলে দাবি করতেন। মুগল আমলে তাঁর পূর্বপুরুষগণ ইসলাম প্রচারের জন্য বাগদাদ হতে দিল্লিতে আসেন। জাহাঙ্গীর-এর রাজত্বকালে (১৬০৫-১৬২৭) দিল্লি থেকে বাংলায় এসে তারা ধনবাড়ীতে জমিদারি লাভ করেন।

তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল ও কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে শিক্ষালাভ করেন। ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, আরবি ও ফারসি ভাষায় বুৎপত্তি লাভ করে তিনি ময়মনসিংহের অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে অচিরেই তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ময়মনসিংহ পৌরসভার কমিশনার ও ময়মনসিংহ জেলা বোর্ডের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন।

নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, ১৯১২ হতে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য এবং ১৯১৬ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ভারতের ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯২১ সালে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯২১-১৯২৩ সালে প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম মন্ত্রী পদে আসীন হন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি কৃষি, শিল্প, গণপূর্ত ও আবগারি বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি পুনরায় ১৯২৩ সালে দ্বিতীয় দফায় কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯২৫ সালের মার্চ মাসে মন্ত্রিপদে নিয়োগ লাভ করেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রিত্ব স্বল্পকাল স্থায়ী হয়েছিল। একই বছরে তিনি গভর্নরের এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন। এ পদে তিনি আমৃত্যু বহাল ছিলেন। এসময় তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদ এর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলর হিসেবে (১৯২৫-১৯২৯) তিনি ইমিগ্রেশন, সীমানা নির্ধারণ, হজ্জ প্রশাসন, বন, কৃষি, শিল্প, আবগারি ও রেজিস্ট্রেশন বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি বহু সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে বিভিন্ন পদমর্যাদায় জড়িত ছিলেন। এগুলি হলো: নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি, সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি, আলীগড় মোহামেডান অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজের ট্রাস্টি, পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং পরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ এর অবৈতনিক সেক্রেটারি, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সদস্য, প্রেসিডেন্সি কলেজ এর গভর্নিং বডির সদস্য ইত্যাদি।

নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় (১৯২১) উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। লর্ড  হার্ডিঞ্জ কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণার সময় থেকে ১৯২০ সালের ৩ মার্চ ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাস হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নওয়াব আলী চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯০৬ সালে ঢাকা কলেজের মুসলমান ছাত্রদের আবাসনের উদ্দেশ্যে একটি মুসলিম হল প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ৩৫ হাজার টাকা দান করেন। তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় ঢাকা, কলকাতা ও ময়মনসিংহ শহরের বিভিন্ন কলেজের ছাত্রদের জন্য কয়েকটি হোস্টেল প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগসহ আরও অন্যান্য বিভাগের ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানের জন্য তিনি ১৯২২ সালে ১৬ হাজার টাকা দান করেন।

তিনি ১৯০৬ সালে সিমলা ডেপুটেশনএ পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠান এবং ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় আইন পরিষদে (১৯০৬-১৯২৯) মুসলিম সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করেন। লক্ষ্ণৌ চুক্তি বাংলার মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী মনে করে এ চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিবাদে তিনি ১৯১৭ সালে বঙ্গীয় প্রেসিডেন্সি মুসলিম লীগের সভাপতির পদে ইস্তফা দেন। তিনি ১৯২১ সালে বেঙ্গল মুসলিম ফেডারেশন গঠন করেন এবং এর সভাপতি হন। তাঁর উদ্যোগে ১৯২৩ সালে কলকাতা কর্পোরেশন-এ ধর্মভিত্তিক পৃথক নির্বাচন বিল পাস করা হয় যা ছিল নওয়াব আলী চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের এক বিরাট সাফল্য। তিনি ভারতের বিশেষ করে বাংলার প্রায় সকল সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাকর্ম হলো: ভার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল (১৯০০), ঈদুল-আজহা (১৯০০) ও মৌলুদ শরীফ (১৯০৩)। বিভিন্ন ইংরেজি ও বাংলা পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সাপ্তাহিক মিহির ও সুধাকর পত্রিকার (১৮৯৫) সম্পাদক ও মালিক ছিলেন। তিনি ইসলাম প্রচারক (১৮৯১) ও প্রচারক (১৮৯৯) নামক দুটি পত্রিকাকে আর্থিক সহায়তা দান করেন। তাছাড়া তিনি কতিপয় দরিদ্র গ্রন্থাকারকে তাদের গ্রন্থ মুদ্রণ ও প্রকাশনার জন্য আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯০৬ হতে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২৩ বছর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক আইন পরিষদ, বঙ্গীয় প্রেসিডেন্সি আইন পরিষদ এবং ভারতের ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি দেশের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের পক্ষ হয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অভিযোগের কথা সরকারের নিকট তুলে ধরেন। তিনি এ ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন যে, তাতে দেশের লোকের অনেক সমস্যা ও অভাব-অভিযোগের প্রতিকার হয়েছে। ওই  সময়ের আইন পরিষদের কার্যবিবরণীতে দেখা যায় যে, তিনি আইন পরিষদের প্রতিটি সেশনে নিয়মিত উপস্থিত থেকে প্রজাদের স্বার্থের কথা বলেছেন। তিনি কৃষির অগ্রগতির জন্য সার্বিক চেষ্টা করেছেন।

ব্রিটিশ সরকার নওয়াব আলী চৌধুরীকে ১৯০৬ সালে ‘খান বাহাদুর’, ১৯১১ সালে ‘নওয়াব’, ১৯১৮ সালে ‘সি.আই.ই’ এবং ১৯২৪ সালে ‘নওয়াব বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে।

সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯২৯ সালের ১৭ এপ্রিল দার্জিলিং শহরে ‘ইডেন ক্যাসল’ নামক তাঁর নিজস্ব বাসভবনে ৬৬ বছর বয়সে মারা যান। দার্জিলিং থেকে তাঁর মরদেহ ধনবাড়ী গ্রামে এনে সমাধিস্থ করা হয়।  [মুহম্মদ আবদুস সালাম]