কলকাতা কর্পোরেশন


কলকাতা কর্পোরেশন  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বসতি কলকাতা শহরের ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করা হয় ১৭২৭ সালে।  একজন মেয়র এবং নয় জন উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত হয় কলকাতা কর্পোরেশন। কর্পোরেশনের প্রধান কাজ ছিল জমির খাজনা ও নগর শুল্ক  আরোপ ও সংগ্রহ করা এবং শহরের রাস্তা ও নালানর্দমার প্রয়োজনীয় রক্ষাণাবেক্ষণ ও সংস্কার সাধন করা। এর পাশাপাশি মেয়রের দায়িত্ব ছিল, যে সকল ইউরোপীয় ও স্থানীয় অধিবাসী স্থায়ীভাবে কলকাতায় বাস করতেন তাঁদের বিচার সংক্রান্ত কাজ মেয়র কোর্টে সম্পন্ন করা। ১৭৯৪ সালে   নিয়মতান্ত্রিকভাবে মূল্যধার্য ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বিচার সম্পন্ন করার লক্ষ্যে  ‘নগর ব্যবস্থাপক’ বা ‘Justice of the Peace’ নামে একটি আদালত স্থাপন করা হয়।

কলকাতা কর্পোরেশন ভবন

কলকাতা কর্পোরেশনের পরবর্তী ধাপ ছিল বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নগর ব্যবস্থাপনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে একটি তহবিল গঠন করা। তহবিল গঠনের একটি উৎস ছিল লটারী। লটারীকে আইনসিদ্ধ করার জন্য ১৭৯৪ সালে একটি বিধান পাশ করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম পর্বে লটারীর মাধ্যমে সংগৃহীত পুঁজি যথাযথভাবে পরিচালনা ও ব্যবহার করার লক্ষে একটি ‘লটারি কমিটি’ গঠন করা হয়। উক্ত সময়ের মধ্যে নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ, পুরনো রাস্তার সংস্কার, পুকুর খনন, পুরনো পুকুর ভরাট প্রভৃতির কাজ হাতে নেয়া হয়। একটি টাউন হল নির্মাণ ছিল কর্পোরেশনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ১৮১৯ সালে বসতবাড়ি-কর বাবদ আদায় হয় প্রায় ২.৫ লাখ এবং ১৮৩৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখে। নানা বিবেচনায় ১৮৩৬ সালে লটারী কমিটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

১৮৪৭ সালে শহর ব্যবস্থাপনার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এ ব্যবস্থায় একজন নগর ব্যবস্থাপকের স্থলে সাতজন বেতনভূক্ত নিয়মিত সদস্যকে নিয়োগ দেয়া হয়। উক্ত সাতজনের মধ্যে চার জন ছিলেন কর দাতাদের দ্বারা নির্বাচিত সদস্য। ১৮৫২ সালে মোট চারজন সদস্য সমন্বয়ে পুর্ববর্তী বোর্ডকে পুনঃসংস্থাপিত করা হয়। নতুন বোর্ডের দু’জন সদস্য সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত ও অপর দু’জন কর দাতাদের দ্বারা নির্বাচিত সদস্য। বোর্ডের সদস্যাদের সর্বোচ্চ মাসিক বেতন ধার্য হয় ২৫০ রূপি। ১৮৪৭ সালের আইনের অধীনে ঘোড়া, যানবাহন ও ঘোড়ার গাড়িকে করের আওতায় আনা হয়। বসত বাড়ির জন্য নির্ধারিত কর শতকরা ৬.২৫ ভাগ থেকে শতকরা ৭.৫ ভাগে বৃদ্ধি করা হয় ও শহরে নতুন আলোর ব্যবস্থার জন্য করের হার শতকরা ২ ভাগ নির্ধারন করা হয়। ১৮৫৬ সালে বোর্ডের সদস্য সংখ্যা পুননির্ধারন করে সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত ৩ (তিন) সদস্য বিশিষ্ট করা হয়।

১৮৬৩ সাল নাগাদ কর্পোরেশনের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়। এ সময়ে কলকাতায় অবস্থানরত বিচারকমন্ডলীর সঙ্গে প্রদেশ সমূহের বিচারক মন্ডলীর সমন্বয়ে গঠিত নতুন পৌরসভা কমিটিকে সর্বাধিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। উক্ত কমিটি একজন ভাইস চেয়ারম্যন নির্বাচিন কওে। কমিটির তত্ত্বাবধানে কর্পোরেশনের জন্য নির্ধারন করা হয় একজন নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, সার্ভেয়ার, কর সংগ্রাহক ও মূল্য নির্ধারক। একই সময়ে পানি-কর ধার্য হয় ও বসত বাড়ির কর শতকরা দশভাগ বৃদ্ধি পায়। এ সময়েই শহরের নর্দমা ব্যবস্থা ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থার আরেক ধাপ উন্নয়ন সাধন করা হয়। পৌরসভার জন্য নির্ধারিত কসাইখানা, পরিশ্রুত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা (এশিয়ার প্রথম শহরে) এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম কলকাতায় সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে একটি সুশৃঙ্খলিত ও সুনিয়ন্ত্রিত ‘নিউমার্কেট’ যথাক্রমে ১৮৬৬, ১৮৬৮ ও ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত লাভ করে। প্রধান প্রধান সড়কের সঙ্গে ফুটপাথও সংযোগ করা হয়।

১৮৭৬ সালে কলকাতা কর্পোরেশন পুনগর্ঠনের সময় এর নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরো বিশিষ্টতা প্রদান করা হয়। পুনর্গঠিত কর্পোরেশন একজন চেয়ারম্যান ও একজন ভাইস চেয়ারম্যান সহকারে মোট ৭২ জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হয়। কমিটির সদস্যদেও মধ্যে ৪৮ জন সদস্য কর দাতাদের দ্বারা নির্বাচিত এবং ২৪ জন সদস্য সরকার কর্তৃক নির্বাচিত। এই কমিটি কর্তৃক ১৮৭৮ সালে কলকাতায় ভূগর্ভস্থ নর্দমা ব্যবস্থার কাজ সম্পন্ন হয় এবং এর মাধ্যমেই ভূগর্ভস্থ নর্দমা ব্যবস্থার জন্য কলকাতা পৃথিবীর তৃতীয় শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তা ছাড়া কলকাতার দু’টি রেইল যোগাযোগ টার্মিনালকে সংযুক্ত করে শিয়ালদহ ও হাওড়ার সঙ্গে হ্যারিসন রোডকে খুলে দেয়া হয়।

১৮৮৮ সালে সার্কুলার রোডের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ সংযুক্ত করে পৌরসভার সীমানা বৃদ্ধি করা ছাড়াও কর্পোরেশনের কমিশনারদের সংখ্যা ৭৫ এ বৃদ্ধি করা হয়। ৭৫ জন কমিশনারের মধ্যে ৫০ জন নির্বাচিত, ১৫ জন সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত এবং অবশিষ্ট ১০ জন বিভিন্ন চেম্বার অব কমার্স ও ব্যবসায়ী এসোসিয়েশন কর্তৃক মনোনীত সদস্য। ১৮৯৯ সালের একটি আইনের দ্বারা পূর্ববর্তী ৭৫ জন কমিশনার এর স্থলে তাদের সংখ্যা ৫০ নির্ধারন করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জন নির্বাচিত ও অবশিষ্ট ২৫ জন সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত কমিশনার। এ কমিটিতে সরকার কর্তৃক নির্বাচিত একজন চেয়ারম্যান এর উপর প্রভূত ক্ষমতা প্রদান করা হয়। এ ব্যাবস্থায় নির্বাচিত কমিশনারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তাদের মধ্যে ২৮ জন কমিশনার প্রতিবাদ স্বরূপ পদত্যাগ করে।

১৯২৩ সালের কর্পোরেশন আইনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়। এ সময়ে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ‘স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত সরকার’-এর মন্ত্রী নির্বাচিত হন। পূর্ববর্তী আইনে কর্পোরেশনের সভা পরিচালনার জন্য প্রত্যেক বছর একজন মেয়র নির্বাচিত হতেন। ১৯২৩ সালের আইন মোতাবেক একজন মেয়র, একজন ডেপুটি মেয়র, পাঁচ জন পৌর পরিষদের ঊর্ধ্বতন সদস্য এবং ৯০ জন কাউন্সিলরের সমন্বয়ে কর্পোরেশনের কমিটি গঠন করা হয়। মেয়র নির্বাচনের পূর্বেই কাউন্সিলরদের দ্বারা পৌর পরিষদের ঊর্ধ্বতন সদস্যদের নির্বাচিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়। একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার উপর সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান এবং দু’জন ডেপুটি সহকারী নির্বাহী কর্মকর্তা কর্তৃক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারকে সহযোগিতা করার বিধান রাখা হয়। কলকাতার সন্নিহিত অঞ্চল সমূহের একটা বড় অংশ কর্পোরেশনের আওতায় আনা হয়। এ আইনের দ্বারা মহিলাদের   ভোটাধিকার দেয়া হয়। ১৯২৩ সালের আইনের অধীনে কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও প্রধান নির্বাহী অফিসার নির্বাচিত হন যথাক্রমে, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু এবং  হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে দুঃশাসনের দায়ে অভিযুক্ত করে কলকাতা কর্পোরেশনের কার্যভার পশ্চিমবঙ্গ সরকার গ্রহন করে। এ সময় থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সরকার কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করে।

১৯৫১ সালের ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যাল এ্যাক্ট’ (পশ্চিমবঙ্গ অ্যাক্ট নং-৩৩, ১৯৫১) প্রণয়নের মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ১ মে থেকে কলকাতা কর্পোরেশনের নতুন পর্বের সূচনা হয়। নতুন আইন দ্বারা কলকাতা কর্পোরেশন একটি পরিকল্পনা প্রণয়নকারী, নির্দেশক এবং বিধি বিধান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৫১ সালের আইন কর্পোরেশনের জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট ও স্বাধীন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দেয়, যেমন (১) কর্পোরেশন, (২) সাতটি স্থায়ী কমিটি এবং (৩) একজন কমিশনার। কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কমিশনার কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে মেয়রকে আপিল বিষয়ক সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করা হয় এবং মেয়রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়।

১৯৫৩ সালের কলকাতা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট-এর অধীনে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে টালীগঞ্জ পৌরসভাকে কলকাতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এ সময়ে কর্পোরেশনের কাউন্সেলরের সংখ্যা ৭৫ থেকে ৮০তে উত্তীর্ণ করা ছাড়াও কলকাতা শহরকে ৮০টি নতুন ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয়। উক্ত আইনের আরেকটি অধ্যাদেশ দ্বারা ১৯৬৪ সালে ওয়ার্ড এর সংখ্যা ৮০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৮ সালে আইনের অপর একটি অধ্যাদেশ দ্বারা ভোটদানে সক্ষম ভোটারের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৮ বছর নির্ধারন করা হয়। সে সঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের ৭৪তম অধ্যাদেশ বলে কর্পোরেশনের মোট আসনের তিনভাগের এক ভাগ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। তাছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠ তফসিলী সম্প্রদায় ও তফসিলী নৃগোষ্ঠীর জন্য আসন সংরক্ষণ করা হয়।

১৯৫১ সালের কলকাতা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট-এর ৪৭ নং সেকশনের অনুসরণে আদেশ নং- ৫৬১/এল এস জি, তাং ২২ মার্চ ১৯৭২ ধারায় এক বছরের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাৎক্ষণিক ভাবে কলকাতা কর্পোরেশনের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং এবং ৩০ জুন ১৯৮৫ সালে ‘কলকাতা কর্পোরেশন’ সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত একই প্রকারে প্রতি বছর তার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট, ১৯৫১-এর স্থলাভিষিক্ত হয় ‘দি কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট ১৯৮০’ এবং কলকাতা কর্পোরেশনের জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অবতারণা করা হয়। কাউন্সিলের মেয়রের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ করে তাকে বহুবিধ ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে ‘কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট ১৯৮০’ কার্যকরী হয়। কলকাতার সঙ্গে দক্ষিণ উপনগর, গার্ডেন রিচ (Garden Reach) ও যাদবপুরকে একত্র করে এর পরিধি আরো বৃদ্ধি করার লক্ষে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল (অধ্যাদেশ) অ্যাক্ট ১৯৮৪ পাস করা হয়। সে সঙ্গে কর্পোরেশনের ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়িয়ে ১৪১ এ উন্নীত করা হয়। কর্পোরেশন আইনের অধীনে ১৯৮৫ সালের ৩০ জুন প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং এ ব্যবস্থা বর্তমান পর্যন্ত চালু রয়েছে।  [দিলীপ ব্যানার্জী]