বঙ্গীয় আইন পরিষদ


বঙ্গীয় আইন পরিষদ (Bengal Legislative Council)  একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে প্রধান করে ১৯৬১ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট-এর অধীনে বাংলায় ১৮৬২ সালে গঠিত তিন বছর মেয়াদী আইন পরিষদ। লেফটেন্যান্ট গভর্নর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে বারো জন সদস্যকে মনোনীত করে এ পরিষদ গঠন করেন। এটি ছিল ভারতে বৃটিশদের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে সাংবিধানিক সংস্কার কর্মসূচির সূচনাস্বরূপ, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদাধিকারবলে এ পরিষদের সভাপতি হন।

অ্যাক্ট, ১৮৬১ এর অধীনে বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রথম সদস্য ছিলেন টি. এইচ কাউই, এ. আর ইয়ং, এইচ. ডি. এইচ ফারগাসান, ই. এইচ লুসিংটন, বাবু রামা প্রসাদ রায়, মৌলভী আবদুল লতিফ, জন. এন বুলেন, উইলিয়ম মেটল্যান্ড, এ.টি.টি পিটারসন, রাজা প্রতাব চন্দসিং, বাবু প্রসন্ন কুমার ঠাকুর এবং ডব্লিউ মোরান। পরিষদের বারোজন সদস্যের মধ্যে চার জন ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, চারজন বেসরকারি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং বাকি চারজন ছিলেন বাঙালি ভদ্রলোক। সদস্যগণ প্রতি শনিবার বেলা ১১টায় সভায় মিলিত হতেন। গভর্নর জেনারেল ও ভাইসরয়ের অনুমতি সাপেক্ষে লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। তিনি সর্বোচ্চ ১২ জন সদস্য মনোনয়নের ক্ষমতা রাখতেন। তবে ১২ এর কম সদস্যও মনোনীত করার ক্ষমতা তাঁর ছিল। ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৯৩ সালের মধ্যে মোট ১১২ জন্য সদস্যকে আইন পরিষদের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। এঁদের মধ্যে ৪৯ জন ছিলেন ভারতীয় সদস্য, ৩৫ জন ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশনের সদস্য এবং ২৬ জন ছিলেন খেতাবধারী সদস্য।

অ্যাক্ট, ১৮৯২  এর অধীনে পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে বিশজন করা হয়। এঁদের মধ্যে সাত জন সদস্য মনোনীত হন লেফটেন্যান্ট গভর্নর কর্তৃক ও কলকাতা কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা বোর্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের সুপারিশক্রমে। পরিষদ সরকারের দেয়া বাজেটের ওপর ভোট প্রদানের অধিকার না পেলেও তার ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করার সুবিধা লাভ করে। অবশ্য  বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্যগণ নির্বাহীর নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারতেন। কারণ সরকারের প্রতি প্রশ্নাতীতভাবে অনুগত্য প্রদর্শনের উপর ভিত্তি করেই সদস্যগণকে মনোনয়ন প্রদান করা হত। ফলে নির্বাহীকে কখনোই বিপরীত পক্ষ ও মতের সম্মুখীন হতে হয়নি। তবে সদস্যগণ সভায় কিছু রসাত্মক প্রশ্নের উদ্রেক করতেন। যেমন ১৮৯৫ সালে স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী একটি বাস্তবতার দিকে নির্বাহীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন যে, ইংল্যান্ডের চারকোটি জনগণের জন্য যেখানে সংসদে ৬৭০ জন প্রতিনিধি, সেখানে বাংলার সাত কোটি জনগণের জন্য মাত্র দশজন প্রতিনিধি! এ প্রশ্নের জবাবে তিনি উপবিষ্টদের মাঝ থেকে সামান্য হাসি ছাড়া কোনো প্রতিউত্তর পাননি। ১৮৯৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি রমেশচন্দ্র দত্ত দাবি তোলেন যে, বাংলার প্রতি জেলা থেকে কমপক্ষে একজন করে আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হওয়া উচিত। তাতে অন্তত কাউন্সিলকে প্রতিনিধিত্বসুলভ মনে করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। সদস্যগণের এরূপ মন্তব্যে এই প্রতীয়মান হয় যে, দেশের শিক্ষিত শ্রেণি একটি মনোনীত আইন পরিষদের চাইতে একটি প্রতিনিধিত্বশী আইন পরিষদ পেতেই অধিক আগ্রহী ছিলেন।

মর্লি-মিন্টো সংস্কার, ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্টের অধীনে পরবর্তী সাংবিধানিক সংস্কারটি সাধিত হয়। গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো ও সেক্রেটারি অব স্টেট জন মর্লির নামানুসারে এ আইন মর্লি মিন্টো সংস্কার নামে পরিচিত। রাজনৈতিকভাবে মধ্যপন্থী এবং ব্রিটিশ সমর্থক অভিজাতদের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে নির্বাচিতদের নিয়ে আইন পরিষদ পরিসরে বৃদ্ধি করা হয় এবং ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্টের অধীনে তার ক্ষমতাও বৃদ্ধি করা হয়। তাছাড়াও পশ্চাদপদ মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে হিন্দুদের সমকক্ষ করতে এবং তাদের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেও মুসলমানদের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা এ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণ তারা ইতোমধ্যে দেশে একটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল। জনপ্রিয় বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের দাবির বিরুদ্ধে ১৯০৯ সালের কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯১২ সালে সংশোধিত হয়। এতে কাউন্সিল সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ৫৩ তে উন্নীত করা হয়। আসন সংখ্যা বণ্টন করা হয় সম্প্রদায়, পেশাজীবী, পৌরসভা, জেলা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, ভূস্বামী, মুসলমান, বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্স এবং ক্যালকাটা ট্রেডার্স এসোসিয়েশন এর আনুপাতিক হারে। কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন প্রদেশের গভর্নর।

নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ এর কাউন্সিলের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৬০ জন করা হয়। ১৮৬১, ১৮৯২ ও ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্টের শর্তাধীন পূর্ববঙ্গ ও আসামের আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার লক্ষ্যে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাউন্সিল গঠিত হয়। কাউন্সিল ১৮ ডিসেম্বর ১৯০৬ সালে ঢাকার গভর্নরের বাসভবনে প্রথমবারের মতো সভায় মিলিত হন এবং শেষবার মিলিত হন ১৮ মার্চ ১৯১২, যখন বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে বাংলা পুনরায় একত্রিত হয়।

১৯২০ সাল পর্যন্ত আইন পরিষদ একটি পরামর্শক পর্ষদের ভূমিকা পালন করে। তবে বাজেট প্রসঙ্গে কোন আলোচনা অথবা এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা সদস্যদের ছিল না। ১৯১৯ সালের মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইন দ্বারা পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ তাতে বেসরকারি প্রতিনিধির সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়। এ সময় থেকে আইন করা হয় যে, নির্বাচিত সদস্য সহকারে গঠিত কাউন্সিলে ভূস্বামী শ্রেণি ভোট প্রদানের অধিকার লাভ করবেন। আইনে পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা বিলোপ সাধন করা হয়। নতুন আইনে সদস্যগণের মধ্যে ৭০ ভাগ হবেন নির্বাচিত ও বাকিরা হবেন মনোনীত। ভূস্বামী শ্রে্রণি, পুঁজিবাদী কৃষক ও বিশ্ববিদ্যালয় আইন পরিষদের বিশেষ প্রতিনিধিত্বের অধিকার পায়। শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, জনস্বাস্থ্য, জনস্বার্থে নিয়োজিত কর্মকান্ড, কৃষি ও সমবায়-সমিতি সমূহের প্রশাসনিক দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উপর অর্পণ করা হয়। তবে সংরক্ষিত বিষয়সমূহের প্রশাসনের ভার নির্বাহী কাউন্সিলের উপর ন্যাস্ত থাকে। সংরক্ষিত বিষয়সমূহ ছিল অর্থব্যবস্থা, পুলিশ, ভূমি রাজস্ব, আইন, বিচার এবং শ্রম। নবগঠিত চার সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী পরিষদের অর্ধেক সদস্য হন ভারতীয়। গভর্নর ব্যতীত প্রেসিডেন্ট ও ডেপুটি প্রেসিডেন্টও হবেন নির্বাচিত সদস্য।

মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার, ১৯১৯ ১৯১৯ সালের আইনের অধীনে ‘Governor of the Presidency of the Fort William in Bengal’ এর  পদমর্যাদা পরিবর্তন করে তাকে সরলীকরণ করা হয় ও পরিবর্তিত পদ হয় ‘Governor of Bengal’ বা বাংলার গভর্ণর। এর পর থেকে কাউন্সিলের সভাপতিত্ব করবেন একজন গভর্নরের পরিবর্তে কাউন্সিল দ্বারা নির্বাচিত একজন প্রেসিডেন্ট। কাউন্সিলের মোট সদস্য সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ এ। কিন্তু কংগ্রেস ও স্বরাজ্য পার্টি সংখ্যাগুরু দল হওয়া সত্ত্বেও (কাউন্সিলের) তারা সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনরূপ সহযোগিতা প্রদর্শনে অস্বীকৃতি জানায় এবং তারা নিজেরা পৃথক মন্ত্রিসভা গঠন করে। দ্বৈতশাসন ও পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পক্ষে তাদের দাবির প্রেক্ষিতে এ অ্যাক্ট সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তারা কাউন্সিল বয়কট করেন। কিন্তু অন্যান্য অনেক কাউন্সিল সদস্যবৃন্দ এ সংবিধান সমর্থন করেন ও মন্ত্রিসভা গঠন করেন। প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ মন্ত্রি হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতা লাভ করেন। প্রথম নির্বাচিত মন্ত্রিরা ছিলেন, স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি - স্থানীয় সরকার ও জনস্বাস্থ্য;  প্রবাস চন্দ্র মিত্র- শিক্ষা ও নিবন্ধন; নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী - কৃষি ও জনকল্যান।

কংগ্রেস ও তার সমর্থিত মিত্র সংঘের অসহযোগিতা ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে দ্বৈত কাউন্সিলের প্রায়োগিক কর্মকান্ড তমশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সাংবিধানিক এ অচলাবস্থা ১৯৩০ সালের সাইমন কমিশন, ১৯২৮ সালের নেহেরু রিপোর্ট এবং ১৯৩০-৩২ সালের গোলটেবিল বৈঠকের বিবেচনাধীনে আনা হয়। একটি দায়িত্বশীল সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দেয়া পরবর্তী দিক নির্দেশনা প্রদানের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক এ অচলাবস্থার অবসান হয়। ‘সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ-১৯৩২’ (Communal Awards-1932) শিরোনামে নতুন ঘোষণাটি আসে। এ এওয়ার্ড বা রোয়েদাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে কংগ্রেস ও অন্যান্য দলসমূহ বেশ কয়েকটি আপত্তি তোলে। কিন্তু তবুও প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রদানসহ একটি দায়িত্বশীল সরকার ব্যবস্থার সুযোগ রেখে পার্লামেন্ট ১৯৩৫ সালের আইনটি পাস করে। ১৯৩৫ সালের আইনের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে ব্রিটিশ ভারতের এগারোটি প্রদেশের মধ্যে ছয়টি প্রদেশে দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট আইন সভা ছিল; উচ্চ কক্ষ বা আইন পারষদ (Legislative Council) এবং নিম্নকক্ষ বা আইন সভা (Legislative Assembly) সর্বোচ্চ ৬৫ জন ও সর্বনিম্ন ৬৩ জন সদস্য সহযোগে গঠিত উচ্চ কক্ষের আইন পরিষদ ছিল একটি স্থায়ী সাংবিধানিক বডি। নিম্নকক্ষের সদস্যে সংখ্যা ছিল ২৫০ জন। আইন পরিষদের আসন বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:

সাধারণ আসন-                         ১০

মুসলিম আসন-                         ১৭

ইউরোপীয় আসন-                       ৩

আইন সভা কর্তৃক মনোনীত আসন-২৭ এবং গভর্নর কর্তৃক মনোনীত আসন সংখ্যা ৬ এর কম এবং ৮ এর বেশি হবে না। উচ্চ কক্ষের আইন পরিষদ স্থায়ী হলেও এর এক তৃতীয়াংশ সদস্য প্রতিবছর অবসরে যাবেন।

বঙ্গীয় আইন সভা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে বঙ্গীয় আইন সভার আসন বণ্টন ছিল নিম্নরূপ:

মোট আসন-                                              ২৫০

সাধারণ আসন-                                              ৭৮

[শহরে- ১২, গ্রামে-৬৩ এবং সংরক্ষিত তফশিলী সম্প্রদায়- ৩০]

মুসলমান-                                                  ১১৭

[শহর-৬ এবং গ্রামে- ১১১]

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান-                                         ০৩

ইউরোপীয় -                                                 ১১

ভারতীয়-খ্রিস্টান-                                             ২

পুঁজিবাদী কৃষক-                                             ১৯

জমিদার-                                                       ৫

শ্রমিক প্রতিনিধি-                                              ৮

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি-২ (ঢাকা-১ এবং কলকাতা-১) মহিলা সিট-৫ (সাধারণ-২, মুসলমান-২ এবং অ্যাংলো-ইন্ডিয়া-১)

যুদ্ধাবস্থা ও হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার কারণে সরকার ১৯৪০ ও ১৯৪৩ সালের আইন সভা  নির্বাচন অনুষ্ঠান কার্যকরী করাকে রাজনৈতিকভাবে সঠিক হবে বলে মনে করেনি। তাই ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পূর্বে ১৯৪৬ সালের ১৯-২২ মার্চ বঙ্গীয় আইন সভার প্রথম ও শেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের ফলাফল নিম্নরূপ:

মুসলিম লীগ-১১৩, কংগ্রেস-৮৬, স্বতন্ত্র হিন্দু-১৩, স্বতন্ত্র মুসলমান-৯ এবং অন্যান্য-২৯। [সিরাজুল ইসলাম]

আরও দেখুন বঙ্গীয় আইন সভা