খ্রিস্টধর্ম


খ্রিস্টধর্ম  বাংলায় খ্রিস্টধর্ম প্রথম প্রচারিত হয় সম্ভবত ষোলো শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে। পরবর্তী দুশ বছর প্রধানত দুটি রোমান ক্যাথলিক সম্প্রদায় জেশিট (Jesuits) ও অগাস্টিনিয়ানদের (Augustinian) মাধ্যমে এর প্রচার কাজ চলে। পর্তুগিজরা সম্রাট আকবরের নিকট থেকে হুগলিতে বসতি স্থাপনের অনুমতি পেলে জেশিটরা ১৫৯৮-৯৯ খ্রিস্টাব্দে সেখানে একটি স্কুল ও একটি হাসপাতাল স্থাপন করে। আঠারো শতকের শেষদিকে পোপ কর্তৃক তাদের প্রচার বন্ধের পূর্ব পর্যন্ত তারা বাংলায় ধর্ম প্রচার করে।

বাংলায় খ্রিস্টধর্মীয় কর্মকান্ডে প্রধান ভূমিকা পালন করে অগাস্টিনিয়ানরা। তারা ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে একটি গির্জা স্থাপন করে, সেখান থেকে ঢাকাসহ বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা হয়। ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ হুগলিতে খ্রিস্টানদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০০, যাদের মধ্যে ছিল পর্তুগিজ, তাদের ইউরেশিয়ান বংশধর এবং ক্রীতদাসসহ অন্যান্য ধর্মান্তরিতরা। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে  শাহজাহান হুগলি আক্রমণ করলে গির্জাটি ধ্বংস হয়; তবে পরবর্তীকালে অগাস্টিনিয়ানরা ব্যান্ডেলে বসতি স্থাপনের অনুমতি পায় এবং সেখানে একটি গির্জা নির্মাণ করে, যা এখনও বর্তমান।

পর্তুগিজরা আরাকানরাজের সহায়তায় ষোলো শতকেই চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। অগাস্টিনিয়ানরা সেখানে ১৬২১ খ্রিস্টাব্দে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে এবং কয়েক হাজার লোককে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেয়, যাদের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে দস্যুতাকালে ধরা হয়েছিল। পরে সতেরো শতকে নগরী তাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। এর আগে ভূষণার (যশোর) রাজপুত্র খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়ে অ্যান্টোনিও ডি রোজারিও নাম গ্রহণ করেন এবং প্রধানত নিম্নবর্ণের ২০,০০০ হিন্দুকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। সতেরো শতকের নববইয়ের দশকে বাংলায় ১৩টি অগাস্টিনিয়ান গির্জা ছিল।

দীক্ষিত খ্রিস্টানদের অধিকাংশকেই প্রাথমিক কিছু নিয়ম-কানুন ও উপদেশ দেওয়া হতো এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ নতুন কেন্দ্রগুলিতে অভিবাসী হতে চাইত; এমন একটি কেন্দ্র ছিল  কলকাতা, যেখানে ইংরেজরা ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে বসতি স্থাপন করে। অগাস্টিনিয়ানরা সেখানে একটি ক্ষুদ্র উপাসনালয় স্থাপন করেছিল। ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে ফরাসিরা খ্রিস্টানদের সেবার জন্য চন্দননগরে একজন জেশিউটকে নিয়োগ করে। আর্মেনিয়ানরা ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ায় একটি গির্জা স্থাপন করে এবং তার পরপর কলকাতা ও ঢাকায়ও দুটি গির্জা স্থাপিত হয়।

ব্রিটিশ  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার প্রতিনিধি ও কর্মচারীদের জন্য যাজক নিযুক্ত করে এবং ১৮১৩-১৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ব্রিটিশ সরকার অনুমোদিত গির্জায় বিশপের পদ সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে জনগণের বিরোধিতার ভয়ে কোম্পানি প্রচার কাজ বন্ধ রাখে; পরে অবশ্য ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে তা চালু করা হয়। তবে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির  উইলিয়ম কেরী এ দেশে আসার পর ১৭৯৩ থেকেই প্রটেস্টানদের কর্মকান্ড চলতে থাকে। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কেরী শ্রীরামপুরের ডেনিশ বসতিতে জশুয়া মার্শম্যান ও উইলিয়ম ওয়ার্ডর যোগদান করেন। শ্রীরামপুরের এ পাদ্রী ত্রয়ী খ্রিস্টধর্ম প্রচারে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তাঁরা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যার পাঠ্যসূচিতে আধুনিক বিজ্ঞান, ভূগোল ও ইতিহাসের প্রাথমিক পাঠ অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁরা এসব স্কুলের জন্য বাংলায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত প্রেস থেকে সেসব প্রকাশ করেন। ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে  কলিকাতা স্কুল-বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় তাঁরা উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করেন। এ সোসাইটি প্রাথমিক স্কুলগুলিতে ব্যবহারের জন্য উপর্যুক্ত গ্রন্থসমূহের হাজার হাজার কপি মুদ্রণ করে। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন  শ্রীরামপুর কলেজ, যেখানে খ্রিস্টান-অখ্রিস্টান ছাত্ররা কলা, বিজ্ঞান ও ঈশ্বরতত্ত্ব সম্বন্ধে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেড্রিক ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের এক সনদে এ কলেজটি অনুমোদন করেন। এটি তখন একটি অসাধারণ তথ্যভান্ডারে পরিণত হয়। কিন্তু উনিশ শতকের শেষদিকে এর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে রবার্ট হলওয়েল কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত হলে এটি ভারতে ধর্মশিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

পাঠ্যপুস্তক ছাড়া শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্টরা বাংলা ভাষার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিদেশিদের বাংলা শেখা ও দেশিদের খ্রিস্ট সাহিত্য পড়ার সুবিধার্থে তাঁরা একটি  অভিধান ও একটি  ব্যাকরণ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং বাইবেলেরও অনুবাদ করেন। তাঁরা  দিগ্দর্শন ও  সমাচার দর্পণ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সংবাদপত্রের সূচনা করেন; দি  স্টেটসম্যান পত্রিকার পূর্বপুরুষ দি ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া প্রকাশও তাঁদের এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

কেরী শ্রীরামপুরে উদ্ভিদবিদ্যা ও কৃষিবিদ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি সেখানে বাগান তৈরি করেন এবং বিদেশ থেকে বীজ এনে নতুন জলবায়ু গ্রহণে সক্ষম বৃক্ষ উৎপাদন করেন। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি এগ্রি-হর্টিকালচার সোসাইটি অব ইন্ডিয়া স্থাপনেও নেতৃত্ব দেন। শ্রীরামপুরের যাজকরা সমকালীন হিন্দুসমাজে প্রচলিত অমানবিক আচরণ, যেমন সাগরদ্বীপে শিশুহত্যা, সতীদাহ ইত্যাদির বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও সরকারকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন; এসবের ওপর তাঁরা একটি গবেষণাও চালিয়েছিলেন।

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের পরে বাংলায় ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির অনুসরণে যে প্রটেস্টান্ট মিশনারি সোসাইটিগুলি কাজ করে সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: লন্ডন মিশনারি সোসাইটি, চার্চ মিশনারি সোসাইটি এবং চার্চ অব স্কটল্যান্ড। চার্চ মিশনারি সোসাইটি ছিল ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। এটি ভারতে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালনকারী মেরী অ্যান কুককে ১৮২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রাথমিক সমর্থন জানিয়ে আসছিল। এরপর ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে স্কটিশ পাদ্রী  আলেকজান্ডার ডাফ কলকাতা আসেন এবং খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য নতুন পর্যায়ের কাজ শুরু করেন। তিনি একটি স্কুল স্থাপন করেন যা দ্রুত ও দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত স্কটিশচার্চ কলেজ নামে সুপরিচিত হয়। ডাফ আবৃত্তিমূলক শিক্ষা অনুমোদন করেন এবং ছাত্রদের মধ্যে আগ্রহ ও বোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের গুরু দায়িত্বের ওপর জোর দেন। তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ মানব তৈরি এবং শরীরচর্চা ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরির প্রতিও উৎসাহী ছিলেন। ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন যুক্তিবাদী ও অনমনীয়। অন্যান্য মিশনারিরাও এ কাজ শুরু করেছিলেন এবং তাঁর এ উদ্যোগের কারণেই সরকার ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়।

আধুনিক বাংলার উন্নয়নে খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের ভাষাভিত্তিক ও শিক্ষামূলক কর্মকান্ড এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তবে তাঁরা প্রধানত ধর্মযাজকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসব করতেন। তাঁরা মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে, তাদের মুক্তি একমাত্র খ্রিস্টধর্মেই নিহিত, যদিও এ ক্ষেত্রে তাঁদের সফলতা ছিল খুবই কম। ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ব্যাপ্টিস্টরা ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা বাংলায় মিশন স্থাপন করা সত্ত্বেও তিন হাজারের বেশি লোককে ধর্মান্তরিত করতে পারেননি; তাও তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ছিল অন্য খ্রিস্টান চার্চের লোক। ধর্মান্তর প্রক্রিয়া পরিবার ও সমাজ থেকে বহিষ্কার এবং গ্রাম এলাকায় জমিদারদের বিরোধিতার দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। আলেকজান্ডার ডাফ এ ব্যাপারে কলকাতার  বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, যাঁরা ইতোমধ্যেই পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন; কেউ কেউ আবার ইতোমধ্যে ধর্মান্তরিতও হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজন, বিশেষত  কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় সর্বক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। তখন গণধর্মান্তর ছিল একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার; তবে এরূপ একটি ঘটনা ঘটেছিল উনিশ শতকের তিরিশের দশকের শেষদিকে কৃষ্ণনগর অঞ্চলে  কর্তাভজা সম্প্রদায়ের মধ্যে। এ সম্প্রদায়ের অনেক মতবাদ খ্রিস্টধর্মেরই অনুরূপ; উপরন্তু এ সম্প্রদায়ের লোকেরা ছিল অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যায় আক্রান্ত; সুতরাং তারা সহজেই পাদ্রীদের প্রচারিত খ্রিস্টধর্মে আকৃষ্ট হয়। ব্যাপ্টিস্টরা  বরিশাল এলাকায় বেশ সাফল্য অর্জন করে। সেখানে প্রধানত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের লোকেরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২৭৮-এ। কিন্তু এ খ্রিস্টান সম্প্রদায় ছিল দরিদ্র এবং দীর্ঘকাল মিশনারি সোসাইটির সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

উনিশ শতকের অধিকাংশ সময় জুড়েই  হিন্দুধর্ম ও  ইসলাম ধর্মের প্রতি পাদ্রিদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমালোচনামূলক ও বিরোধমূলক, যা স্বাভাবিকভাবেই বাঙালিদের ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটা বিরুদ্ধ মতবাদের সৃষ্টি হয়। পাদ্রীদের এ কর্মকান্ড হিন্দুধর্মের সংস্কার আন্দোলনকে উৎসাহিত করে, যার ফলে  ব্রাহ্মসমাজ,  তত্ত্ববোধিনী সভা ইত্যাদির সৃষ্টি হয়। পাদ্রীরা তখন মুসলমানদের সঙ্গে অধিক ধর্মীয় সাদৃশ্য দেখতে পান, যদিও ধর্মান্তরীকরণে তাদের নিকট থেকে বাধাও পেয়েছেন অনুরূপ। তবে পাদ্রীরা পল্লীর দরিদ্র জনগণের দুরবস্থা দেখে যথার্থই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই চার্চ মিশনারি সোসাইটির  রেভারেন্ড জেমস লং ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করানোর ব্যবস্থা করেন। এতে নীলচাষের অত্যাচার উৎপীড়ন চিত্রিত হয়েছে এবং এ কারণে নীলকরদের দ্বারা অভিযুক্ত হয়ে তিনি কিছুকাল কারাবাস করেছিলেন।

ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধার কারণে লং ছিলেন উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ভারতীয় ব্রিটিশদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তবে এ শতকের শেষদিকে পাদ্রীরা হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্মের প্রতি অধিকতর সহানুভূতি দেখাতে শুরু করেন। জে.এন ফারকুহরের দৃষ্টান্তে একথা প্রমাণিত হয়। তিনি ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার YMCA-এর সেক্রেটারি হয়েছিলেন। হিন্দুধর্মের প্রতি ফারকুহরের এ উৎসাহ ইসলাম ধর্মের প্রতি ব্যাপ্টিস্ট বেভান জোনসকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। তিনি ১৯০৯ থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় কাজ করেছেন।

১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে রোমান ক্যাথলিক চার্চ শক্ত ভিতের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় পর্তুগিজ শাসনের বাইরে পোপ কর্তৃক তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে একজন যাজক নিযুক্ত হন। বেলজিয়াম যাজকরা এ ধরনের কাজ শুরু করেন ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। তাঁরা কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে আর্চবিশপের অধীনে কলকাতায় একটি ধর্মীয় প্রশাসনিক এলাকা তৈরি হয়; সেসঙ্গে পূর্ববঙ্গে হলিক্রস ফাদারসহ কতিপয় নতুন নিয়ম-কানুনও প্রবর্তিত হয়।

পাদ্রীরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ছাত্রাবাসসহ শিক্ষাখাতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে থাকেন। বাংলায় ইংল্যান্ড সরকার অনুমোদিত মৈত্রী সঙ্ঘ অক্সফোর্ড মিশনও ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার দক্ষিণে বেহালায় একটি কারিগরি বিদ্যালয় গড়ে তোলে। কিছু কিছু চিকিৎসা কর্মকান্ডও হাতে নেওয়া হয়। ১৯০৮ সালে চন্দ্রঘোনায় একটি ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটি হাসপাতাল খোলা হয়। এরপরে একটি কুষ্ঠ নিরাময় কেন্দ্র এবং সবশেষে বল্লভপুরে একটি চার্চ মিশনারি সোসাইটি হাসপাতালও স্থাপন করা হয়।

কেরী, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড বুঝতে পেরেছিলেন যে, ভারতে ভারতীয়দের দ্বারাই খ্রিস্টধর্ম ব্যাপকভাবে প্রচার করা সম্ভব; তবে এর কর্তৃত্ব থাকবে বিদেশি মিশনারিগুলির হাতেই। এ কারণে শতবর্ষ পরেও খ্রিস্টধর্মকে বিদেশাগত বলেই মনে হয়েছে এবং বর্তমানে জাতীয় আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ব্যাপকভাবে ভারতীয়করণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারত বিভাগের পর  ঢাকা রোমান ক্যাথলিক আর্চবিশপ এবং অ্যাংগলিকান বিশপের কর্মকান্ডের কেন্দ্র হয়। পশ্চিমবঙ্গসহ উত্তর ভারত এবং পাকিস্তানে অ্যাংগলিকান ও আরও অনেক প্রটেস্টান গোষ্ঠীর মধ্যে মিলনের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। উভয় দেশে এটা ঘটেছিল ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে। এরপর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন অ্যাংগলিকান ও যাজক সম্প্রদায়ের সম্মিলনে চার্চ অব বাংলাদেশ গঠিত হয়। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে এর দুজন বিশপ এবং প্রায় ১৪,০০০ জন সদস্য ছিল। এর মধ্যে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটি (বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট সংঘ) কর্তৃক সৃষ্ট উপাসকমন্ডলীও রয়েছে। বাংলাদেশে বৃহত্তম খ্রিস্টান সম্প্রদায় হচ্ছে রোমান ক্যাথলিক, যাদের সংখ্যা বাংলাদেশে মোট পাঁচ লক্ষ খ্রিস্টান জনসংখ্যার মধ্যে দু লাখেরও বেশি। [মাইকেল এ. লেয়ার্ড]

গ্রন্থপঞ্জি MM Ali, The Bengali Reaction to Christian Missionary Activities 1833-1857, Chittagong, 1965; MA Laird, Missionaries and Education in Bengal 1793-1837, Oxford, 1972; J Thekkedath, History of Christianity in India: Vol.II - from the middle of the 16th century to the end of the 17th century (1542-1700), Bangalore, 1982; B Stanley, The History of the Baptist Missionary Society 1792-1992, Edinburgh, 1992.