অভিধান


অভিধান  ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে বাংলা ‘অভিধান’ শব্দের অর্থ ‘শব্দার্থ’। তবে ব্যুৎপত্তিগত অর্থ যাই হোক, অভিধান বর্তমানে ইংরেজি ‘ডিকশনারি’ (Dictionary) শব্দের প্রতিশব্দ হিসেবেই গৃহীত। অভিধানে শব্দের বানান, অর্থ, উচ্চারণ, প্রতিশব্দ, পরিভাষা, প্রতিবর্ণ ও ব্যাকরণবিষয়ক নির্দেশ থাকে। একটি শব্দ বাক্যের মধ্যে কত অর্থে প্রযুক্ত হতে পারে, অভিধান থেকে তা জানা যায়। সেখানে শব্দের উৎস ও ব্যুৎপত্তিনির্দেশ পাওয়া যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুষঙ্গে জড়িত শব্দের সংজ্ঞা অভিধানে লিপিবদ্ধ থাকে। কোনো একটি শব্দ কখন থেকে প্রথম ব্যবহূত হয়ে আসছে, কখন থেকে কোন্ অর্থ ধারণ করছে, এসবের ইতিহাস অভিধান ধারণ করে। প্রায় অভিধানেই পরিশিষ্ট থাকে, ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োজনীয় বহু খুঁটিনাটি তথ্য সেখানে সংকলিত হয়। এ ছাড়া রয়েছে বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে অথবা বিশেষ কোনো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে রচিত অভিধান, যেমন, উচ্চারণ অভিধান, ব্যুৎপত্তি অভিধান, অপভাষার অভিধান, বানান অভিধান, ঐতিহাসিক অভিধান, সমাজবিজ্ঞান অভিধান ইত্যাদি। শেষোক্ত অভিধান দুটির মতো অসংখ্য পারিভাষিক অভিধান আজকাল বাংলা ভাষায় দেখা যায়।

বাংলা অভিধানের ঐতিহ্য দীর্ঘকালের নয়। আঠারো শতক থেকেই বাংলা অভিধানের যাত্রা শুরু হলেও এ অঞ্চলের মানুষ অভিধান ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের যেসব পুথি সংরক্ষিত আছে, তার মধ্যে অমরকোষ বা নামলিঙ্গানুশাসন নামের একটি সংস্কৃত অভিধানের অনেক পুথি পাওয়া যায়। অভিধানটি আনুমানিক ছয় শতকে অমর সিংহ কর্তৃক রচিত। বিশেষভাবে লক্ষণীয় এই যে, এ অভিধানের শব্দভান্ডার এবং বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারের সিংহভাগ শব্দ অভিন্ন। এ বিবেচনায় বাংলাদেশের অভিধান চর্চার ইতিহাস অমরকোষ দিয়ে শুরু করা যায়। অভিন্নতার কারণে উনিশ শতকে মুদ্রিত আট খন্ডের সংস্কৃত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম (প্রকাশকাল যথাক্রমে ১৮২১, ১৮২৭, ১৮৩২, ১৮৩৮, ১৮৪৪, ১৮৪৮, ১৮৫১, এবং ১৮৫৭) নামক বিশ্বকোষ জাতীয় অভিধানের নামও স্মরণযোগ্য। বাংলালিপিতে মুদ্রিত এ সংস্কৃত অভিধানেরও সিংহভাগ শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহারযোগ্য।

বাংলা অভিধানের সূচনা আঠারো শতকে। প্রথম দিকে এর প্রকৃতি ছিল প্রধানত দ্বিভাষিক। এ শ্রেণির প্রথম অভিধান ভোকাবুলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা এ পর্তুগিজ (Vocabulario em Idioma Bengalla e Portuguez) নামে পর্তুগিজ পাদ্রি মানোএল দা আসসুম্পসাঁউ (Fr. Manoel da Assumpcam) কর্তৃক সংকলিত হয়। তিনি তখন ঢাকা অঞ্চলে ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। অভিধানটি ১৭৪৩ সালে লিসবন শহর থেকে রোমান হরফে মুদ্রিত হয়। অভিধানটির পৃষ্ঠাসংখ্যা ৬০২।

১৭৮৮ সালে লন্ডন থেকে রোমান হরফে লেখা দুটি বাংলা শব্দকোষের একটির নাম ইন্ডিয়ান গ্লোসারি (Indian Glossary) এবং অন্যটির নাম দি ইন্ডিয়ান ভোকাবুলারি (The Indian Vocabulary)। নামে ‘ইন্ডিয়ান’ হলেও অভিধান দুটোতে রোমান হরফে ইংরেজি প্রতিশব্দ ও অর্থসহ বাংলা শব্দ ভুক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। অভিধান দুটিতে সংকলকের নাম অনুপস্থিত। অজ্ঞাতনামা সংকলকদ্বয়ের এ অভিধান দুটি প্রথম বাংলা-ইংরেজি অভিধান।

বাংলা হরফে মুদ্রিত ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা অভিধানের নাম ইঙ্গরাজি ও বাঙ্গালি বোকেবিলারি। অভিধানটির ইংরেজি শিরোনাম: An Extensive Vocabulary, Bengalese and English (১৭৯৩); পৃষ্ঠাসংখ্যা ৪৪৫। অনুমান করা হয় এ গ্রন্থের সংকলন ও প্রকাশক ছিলেন আরন আপজন (Aaron Upjohn)। বাংলা ভাষায় প্রথম সুবৃহৎ অভিধান রচনার কৃতিত্ব হেনরি পিটস ফরস্টারের (Henry Pitts Forster)। তাঁর অভিধানের নাম এ ভোকাবুলারি ইন টু পার্টস: ইংলিশ অ্যান্ড বেঙ্গলি অ্যান্ড ভাইস ভার্সা (A Vocabulary in Two Parts: English and Bongalee and Vice Versa)। অভিধানটির প্রথম খন্ড ১৭৯৯ সালে এবং দ্বিতীয় খন্ড ১৮০২ সালে প্রকাশিত হয়। দু-খন্ডে প্রায় ২০,০০০ বাংলা শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ সংকলিত হয়।

আঠারো শতকে সংকলিত পান্ডুলিপি আকারে এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অভিধানের কথাও জানা যায়। এর মধ্যে একটি হলো বাংলা-ফারসি অভিধান। নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড-এর পূর্ববঙ্গীয় একজন মুনশি এর সংকলক ছিলেন। একশত পৃষ্ঠার এ অভিধানে প্রায় দু-হাজার শব্দ সংকলিত হয়। অভিধানটির সংকলনকাল ১৭৭৪-৭৫। প্রায় সমকালে ওগুস্তাঁ ওসাঁ (Augustian Aussant) নামে একজন ফরাসি দোভাষী ১৭৭৪ সাল থেকে ১৭৮৫ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মোট সাতটি অভিধান সংকলন করেন। এর সবগুলিই ছিল ফরাসি-বাংলা অভিধান। অধিকাংশ শব্দ রোমান হরফে লিখিত হলেও আত্মীয়তাবাচক শব্দের অভিধানসহ আরও একটি অভিধানে বাংলা লিপি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অভিধানের মধ্যে ১৭৮২ সালে সংকলিত একটি অভিধান ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। সেখানে প্রতিটি ফরাসি শব্দের অন্তত একটি করে ইংরেজি, পর্তুগিজ, ফারসি, হিন্দুস্তানি এবং বাংলা প্রতিশব্দ সংকলিত হয়। অসাধারণ এ অভিধানে প্রায় ৩৮০০ ভুক্তি ছিল এবং পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ১৯৬। ১৮০৭ সালে রবার্ট কিথ ডিকের (Robert Keith Dick) নির্দেশে বাংলা-খাসি, বাংলা-কুকি, বাংলা-ত্রিপুরা, বাংলা-ওড়িয়া প্রভৃতি বেশ কয়েকটি বাংলা শব্দকোষও সংকলিত হয়, যা ব্রিটিশ মিউজিয়মে সংরক্ষিত আছে।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে অভিধানের চাহিদা বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে দ্বিভাষিক (বাংলা-ইংরেজি ও ইংরেজি-বাংলা) অভিধানের প্রকাশনা বিশেষ গুরুত্ব পায়। তখন যেসব দ্বিভাষিক অভিধান বিশেষ জনপ্রিয় হয়, তার মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য অভিধানের সংকলক মোহনপ্রসাদ ঠাকুর। তিনি মোট দুটি দ্বিভাষিক অভিধান সংকলন করেছিলেন: একটি ১৮০৯ সালে সংস্কৃত-বাংলা অভিধান এবং অপরটি ১৮১০ সালে বাংলা-ইংরেজি অভিধান। প্রথমটির নাম রাখা হয় সংস্কৃত শব্দাঃ বংগদেশীয় ভাষা (Vocabulary: Sanskrit and Bengalee) এবং দ্বিতীয়টির নাম রাখা হয়: এ ভোকাবুলারি: বেঙ্গলি অ্যান্ড ইংলিশ (A Vocabulary: Bengali and English)। মোহনপ্রসাদের উভয় অভিধানের ভুক্তিসংখ্যা প্রায় সমান এবং উভয় অভিধানের পৃষ্ঠাসংখ্যা কমবেশি ২০০। বাংলা ভাষার প্রথম দীর্ঘকায় দ্বিভাষিক অভিধানের প্রণেতা উইলিয়ম কেরি (William Carey)। এ ডিকশনারি অব দি বেঙ্গলি লেঙ্গুয়েজ (A Dictionary of the Bengalee Language) নামে দু-খন্ডের (আসলে তিন খন্ডের) অভিধানটির পৃষ্ঠাসংখ্যা (৬১৬+১৫৪৪=) ২১৬০। আয়তনের দিক দিয়ে যেমন এটি পূর্বের যে কোনো অভিধানের তুলনায় বড়, গুণগত মানের দিক দিয়েও এটি একটি আধুনিক অভিধান। এতে প্রতিটি ভুক্তির পদপরিচয়, লিঙ্গপরিচয় এবং শীর্ষশব্দ-উপশীর্ষশব্দের রোমান প্রতিবর্ণ প্রদান করা হয়েছে। সম্পূর্ণ অভিধানকে সাজানো হয়েছে বাংলা বর্ণানুক্রমে। এরপর উল্লেখযোগ্য অভিধানের সংকলক জন মেন্ডিস (John Mendis)। তাঁর অ্যান অ্যাব্রিজমেন্ট অব জনসন’স ডিকশনারি ইন ইংলিশ অ্যান্ড বেঙ্গলি (An Abridgement of Johnson’s Dictionary in English and Bengali) অভিধানটি একটি ইংরেজি-বাংলা অভিধান। এটি ১৯২২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮২৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত তারাচাঁদ চক্রবর্তীর বাংলা-ইংরেজি অভিধানের নাম ডিকশনারি ইন বেঙ্গলি অ্যান্ড ইংলিশ (Dictionary in Bengalee and English)। ১৮২৮ সালে প্রকাশিত উইলিয়ম মর্টনের (William Morton) অভিধানের নাম দ্বিভাষার্থকাভিধান (A Dictionary of the Bengali Language with Bengali Synonyms and an English Interpretation)। ১৮২৯ সালে কলকাতা প্রকাশিত জি ডি পিয়ারসনের (JD Pearson) এ স্কুল ডিকশনারি, ইংলিশ অ্যান্ড বেঙ্গলি (A School Dictionary, English and Bengalee) অভিধানটির সরল ভাষা সমকালে প্রশংসিত হয়। নাম দেখে যাই মনে হোক না কেন, ১৮৩৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত গ্রেভস সি হটনের (Graves C. Haughton) এ ডিকশনারি, বেঙ্গলি অ্যান্ড সংস্কৃত: এক্সপ্লেইন্ড ইন ইংলিশ (A Dictionary, Bengali and Sanskrit: Explained in English) প্রকৃতপক্ষে একটি দ্বিভাষিক বাংলা-ইংরেজি অভিধান। এর বিশেষত্ব হলো, বাংলা লিপির পাশাপাশি শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দেশের ক্ষেত্রে এ অভিধানে হিন্দি ভাষার জন্য নাগরি লিপি, আরবি-ফারসি ভাষার জন্য আরবি লিপি, এবং ইংরেজি ও পর্তুগিজ শব্দের জন্য রোমান লিপি ব্যবহার করা হয়েছে। উনিশ শতকের আর একটি উল্লেখযোগ্য দ্বিভাষিক অভিধানের প্রণেতা রামকমল সেন। ১৮৩৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত তাঁর অভিধানটির নাম ইঙ্গরেজি-বাঙ্গলা অভিধান (A Dictionary of English and Bengalee)। এ ছাড়া নিকটবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি অভিধানের নাম: অ্যাংলো-বেঙ্গলি ডিকশনারি (Anglo-Bengali Dictionary) (রাধানাথ দে, ১৮৫০); অ্যান ইংলিশ অ্যান্ড বেঙ্গলি ভোকাবুলারি (An English and Bengalee Vocabulary) (মধুসূদন মল্লিক, ১৮৫২); এ ডিকশনারি অব দি ইংলিশ লেঙ্গুয়েজ (A Dictionary of the English Language) (উদয়চাঁদ আঢ্ঢি, ১৮৫৪); এ গ্লোসারি অব জুডিশিয়াল অ্যান্ড রেভিনিউ টার্মস (A Glossary of Judicial and Revenue Terms) (এইচ. এইচ উইলসন/ HH Willson, লন্ডন, ১৮৫৫)। শেষোক্ত অভিধানটি নামত বাংলা-ইংরেজি অভিধান নয়, তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিচারিক এবং রাজস্ব কাজে বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি, ফারসি, হিন্দুস্তানি, সংস্কৃত, হিন্দি, উড়িয়া, মারাঠি, গুজরাটি, তেলেগু, কানাড়া, তামিল, মালয়ালম প্রভৃতি ভাষার যেসব শব্দ সমকালে ব্যবহূত হতো, এ অভিধানে সেসব ভাষার শব্দ স্থান পায়। এর পৃষ্ঠাসংখ্যা (২৪+৭২৮=) ৭৫২।

দ্বিভাষিক অভিধান প্রকাশের ক্ষেত্রে একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়, তা হলো, মাঝে মাঝে নতুন অভিধান প্রকাশের ব্যাপারে মন্দা দেখা দেয়। এ অভাব পূরণ করে পূর্বে প্রকাশিত অভিধানগুলির পুনর্মুদ্রণ। তবে বিশ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ নতুন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিধানের আবির্ভাব ঘটে। অভিধানগুলির প্রকাশস্থল হিসেবে লন্ডন এবং কলকাতার পাশাপাশি ঢাকাও জায়গা করে নেয়। এ সময়ের মধ্যে প্রকাশিত অসংখ্য দ্বিভাষিক অভিধানের মধ্যে বিশ শতকে প্রকাশিত নিম্নোক্ত অভিধানগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়: ১৯৫৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত আশুতোষ দেব সম্পাদিত স্টুডেন্টস ফেবারিট ডিকশনারি (Student’s Fvourite Dictionary); ১৯৫৯ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত শৈলেন্দ্র বিশ্বাস সম্পাদিত সংসদ ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি (Samsad English-Bengali Dictionary); ১৯৬৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত শৈলেন্দ্র বিশ্বাস সম্পাদিত সংসদ বেঙ্গলি-ইংলিশ ডিকশনারি (Samsad Bengali-English Dictionary); ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী প্রমুখ সম্পাদিত বাংলা একাডেমী ইংলিশ-বেঙ্গলি ডিকশনারি (Bangla Academy English-Bengali Dictionary); ঢাকার বাংলা একাডেমী থেকে ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত মোহাম্মদ আলী প্রমুখ সম্পাদিত বাংলা একাডেমী বেঙ্গলি-ইংলিশ ডিকশনারি (Bangla Academy Bengali-English Dictionary) এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ইংরেজি ব্যতীত অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার দ্বিভাষিক অভিধানের মধ্যে কেন্দ্রীয় বাঙ্লা উন্নয়ন বোর্ড ও ঢাকা বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ৪ খন্ডের বাংলা-উর্দু অভিধান (এ এম ফয়েজ আহ্মদ চৌধুরী, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৫, ১৯৮০; প্রথম দু-খন্ড কেন্দ্রীয় বাঙ্লা উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রকাশিত এবং শেষ দু-খন্ড বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত), বাংলা একাডেমী ঢাকা থেকে প্রকাশিত চার খন্ডের আরবী-বাংলা অভিধান (আলাউদ্দীন আল আযহারী, ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৫, ১৯৮২), মস্কো থেকে প্রকাশিত রুশ-বাংলা-রুশ অভিধান (ননী ভৌমিক প্রমুখ, ১৯৭৮), পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত বাংলা-সাঁওতালি অভিধান (ক্ষুদিরাম দাস, ১৯৯৮), ঢাকা বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্রকাশিত ২ খন্ডের পালি-বাংলা অভিধান (শান্তরক্ষিত মহাস্থবির, ২০০১, ২০০৮) প্রভৃতি অভিধানের নাম স্মরণযোগ্য।

উনিশ শতকের সূচনা থেকে বাংলা ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একভাষিক বাংলা-বাংলা অভিধানের আবির্ভাব ঘটে। বাংলালিপিতে মুদ্রিত প্রথম বাংলা-বাংলা অভিধানের নাম বঙ্গভাষাভিধান। এর সংকলক রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ। ১৮১৭ সালে কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। পরে উনিশ শতকের মধ্যে প্রকাশিত আরও কয়েকটি একভাষিক বাংলা অভিধানের মধ্যে শব্দার্থ প্রকাশাভিধান (তারাচন্দ্র শর্মা, কলকাতা, ১৮৩৮); বঙ্গভাষাভিধান (রামেশ্বর তর্কালঙ্কার, কলকাতা, ১৮৩৯); বঙ্গাভিধান (হলধর ন্যায়রত্ন, কলকাতা, ১৮৩৯); শব্দকল্পতরঙ্গিণী (জগন্নাথপ্রসাদ মল্লিক, কলকাতা, ১৮৪১); শব্দার্থ প্রকাশাভিধান (দিগম্বর ভট্টাচার্য, কলকাতা, ১৮৫২); শব্দাম্বুধি (মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ, কলকাতা, ১৮৫৪); নূতন অভিধান (জগন্নারায়ণ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৮৫৬); শব্দসার অভিধান (গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন, কলকাতা, ১৮৬১); শব্দসন্দর্ভ সিন্ধু (মথুরানাথ তর্করত্ন, কলকাতা, ১৮৬৩); শব্দার্থ মুক্তাবলী (বেণীমাধব দাস, কলকাতা, ১৮৬৪); শব্দদীধিতি অভিধান (শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৮৬৪); শব্দার্থ রত্নমালা (কানাইলাল শীল, কলকাতা, ১৮৬৫); প্রকৃতিবাদ অভিধান (রামকমল বিদ্যালঙ্কার, কলকাতা, ১৮৬৬); শব্দাবলী (কেশবচন্দ্র রায়, কলকাতা, ১৮৬৭) প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য।

বিশ শতকের সূচনা থেকে আধুনিক পদ্ধতির একভাষিক বাংলা-বাংলা অভিধান প্রকাশ পেতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ১৯০৬ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুবল মিত্রের সরল বাঙ্গালা অভিধান দীর্ঘকাল ব্যাপী জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সমর্থ হয়। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের দু-খন্ডে প্রকাশিত বাঙ্গালা ভাষার অভিধান  (কলকাতা, ১৯১৭, পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৩৭) একভাষিক বাংলা অভিধানে নতুন মাত্রা এনে দেয়। এ অভিধানের পরিবর্ধিত সংস্করণের ভুক্তিসংখ্যা সমকালের অন্য সব বাংলা অভিধানের ভুক্তিসংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল। প্রায় সমান গুরুত্বের দাবিদার প্রথমে পাঁচ খন্ডে প্রকাশিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ (১৯৩২-১৯৫১; দিল্লির সাহিত্য অকাদেমি ১৯৬৬ সালে এটিকে দু-খন্ডে প্রকাশ করে)। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস এবং হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান দুটি একভাষিক বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে মাইলফলক স্বরূপ। অভিধান দুটি প্রণয়নের জন্য তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা করেছেন। যেমন হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৫ সাল থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে অভিধানটির সংকলন-কাজ করেন। দুজনেই প্রাথমিক উপকরণ থেকে শব্দ এবং তার অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

সাধারণ ব্যবহারকারীর সুবিধার কথা ভেবেও বিশ শতকে অনেকগুলি জনপ্রিয় একভাষিক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে রাজশেখর বসুর চলন্তিকা (কলকাতা, ১৯৩০), কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ (কলকাতা, ১৯৫৩), শৈলেন্দ্র বিশ্বাসের সংসদ বাংলা অভিধান (কলকাতা, ১৯৫৫), মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখের বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (ঢাকা, ১৯৮৪; পরিমার্জিত সংস্করণ, ২০০০), এবং বিজিতকুমার দত্ত প্রমুখের আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান (কলকাতা, ১৯৯৯) সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশি প্রচারিত।

১৯৫৫ সালে ঢাকায়বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশে অভিধান চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ প্রতিষ্ঠান একভাষিক, দ্বিভাষিক, বহুভাষিক, বিষয়ভিত্তিক এবং পারিভাষিক নানা ধরনের অভিধান ও শব্দকোষ প্রণয়ন ও প্রকাশ করে আসছে। অভিধান ও শব্দকোষ মিলে ২০০৯ সাল নাগাদ বাংলা একাডেমী প্রায় সত্তরটি অভিধান প্রকাশ করে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাকৃতি পরিভাষাকোষ যেমন রয়েছে, তেমনি বহুখন্ডে প্রকাশিত অভিধানও রয়েছে। এসব অভিধানের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অভিধানের নাম, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ১৯৬৫), চরিতাভিধান (শামসুজ্জামান খান প্রমুখ, ১৯৮৫), উচ্চারণ অভিধান (নরেন বিশ্বাস, ১৯৮৯), সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান (আহমদ শরীফ, ১৯৯২), সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান, দু-খন্ড (আবু ইসহাক, ১৯৯৩ ও ১৯৯৮), বানান অভিধান (জামিল চৌধুরী, ১৯৯৪), লেখক অভিধান (আশফাক-উল-আলম প্রমুখ, ১৯৯৮), মধ্যযুগের বাংলা ভাষার অভিধান (মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, ২০০৮) প্রভৃতি।  [স্বরোচিষ সরকার]

গ্রন্থপঞ্জি  যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, বাঙলা অভিধান গ্রন্থের পরিচয়, কলকাতা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭০; মোহাম্মদ আবদুল কাইউম, অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৭; সরস্বতী মিশ্র, বাংলা অভিধানের ক্রমবিকাশ, কলকাতা: পুস্তক বিপণি, ২০০০; গোলাম মুরশিদ, আঠারো শতকের গদ্য: ইতিহাস ও সংকলন, ঢাকা: অবসর, ২০০৯।