কলকাতা টাউন হল


কলকাতা টাউন হল  যে কোনো দর্শনার্থীর চোখে পড়ার মতো একটি দর্শনীয় ভবন। স্থাপত্যে ডরিক রীতির নমুনা বলা যেতে পারে। উনিশ শতকে এটি ছিল কলকাতার বৃহত্তম ভবন। এখানে সবরকমের সভাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো। যে-কোনো মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষের জন্যই এটি ছিল উন্মুক্ত।

কলকাতা টাউন হল

১৭৯১ সালে Le gallais Tavern-এ অনুষ্ঠিত একটি সভায় ভবনটির সূচনা হয়। সভার আহবায়কবৃন্দ স্থির করেন, ইংরেজ বসতির বিনোদনের জন্য একটি সরকারি ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে চাঁদা তোলা হবে। পরবর্তীকালে ১৮০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় নাগরিকবৃন্দ একটি টাউন হল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সভা অনুষ্ঠান ও অভ্যর্থনা প্রদান, এবং গণ্যমান্য ইংরেজদের দুর্লভ সামগ্রী প্রদর্শন করা ছিল এ টাউন হল নির্মাণের উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ না-করলেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এতদুদ্দেশ্যে অর্থব্যয়ে রাজি ছিলনা। এ-কারণে পাবলিক লটারির মাধ্যমে অর্থ সংগৃহীত হয়।

১৮০৭ সালে ভবনের নকশা অনুমোদিত হয় এবং কর্ণেল জে, গার্স্টিনকে নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভবনের নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৮১৩ সালে। অতঃপর টাউন হল কমিটি নামক একটি পর্ষদের কাছে এটি হস্তান্তরিত হয়। অবশেষে ১৮৬৭ সালে টাউন হলটি পৌরসভার (পরবর্তীকালে করপোরেশনের) সম্পত্তিতে পরিণত হয়।

ইউরোপীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর মতো যথেষ্ট পরিসর টাউন হলটিতে ছিল। দ্বিতল বিশিষ্ট এ ভবনটি ইটের ভিতের উপর দাঁড়ানো। একতলার উচ্চতা ২৩ ফুট। এখানে মার্বেল-নির্মিত একটি হলঘর এবং বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য কিছু অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রাকার ঘর রয়েছে। দ্বিতীয় তলার উচ্চতা ৩০ ফুট। এর মেঝে সেগুনকাঠের তক্তায় মোড়ানো। এখানে দুসারি স্তম্ভ পরিবেষ্টিত একটি কেন্দ্রীয় হলঘর রয়েছে। উত্তর প্রান্তে একটি সঙ্গীত গ্যালারি এবং পূর্বপ্রান্তে রয়েছে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম। এর সঙ্গে কিছু ক্ষুদ্র কক্ষ, যা একসময় তাস খেলা এবং নৈশভোজের জন্য ব্যবহূত হতো। রাস্তা থেকে এক সারি সিঁড়ি এ চতুষ্কোণ ভবনের সম্মুখভাগের সিংহদ্বারে উঠে গেছে। উত্তরদিকে উঁচু আচ্ছাদনের গাড়ি বারান্দা।

শুরুতে এ টাউন হল কলকাতাবাসী ইউরোপীয়দের মধ্যে পরস্পর সাক্ষাত এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করার একটি স্থায়ী জায়গা করে দেয়। বল নাচ এবং নৈশভোজের আয়োজন ছাড়াও এখানে সভা করে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হতো। এ টাউন হলেই একাধিক সভায় ইউরোপীয়রা তাদের অভাব-অভিযোগের কথা তুলে ধরেন। ১৮৩১ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত এরকমই একটি সভায় ডিরোজিও ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে ইউরেশীয়দের প্রতি অবহেলা করার অভিযোগ উত্থাপন করেন। প্রথমদিকে ইংরেজ শাসনের প্রতি বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণির গভীর আস্থা ছিল। এ কারণে ইউরোপীয় এবং ভারতীয়দের যৌথ সভা উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত খুব একটা বিরল ছিল না। দি ক্যালকাটা স্কুল বুক সোসাইটির বেশ কিছু সভা টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই ১৮২১ সালে স্যার হাইড ইস্ট-এর বিলাতে প্রত্যাগমন উপলক্ষে আন্তরিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। ১৮২৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর টাউন হলে আয়োজিত এক সভায় রাজা রামমোহন রায়দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রকাশ্যে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থন জ্ঞাপন করেন। ১৮৩৬ সালের ৯ এপ্রিল প্রায় দু’শ নেতৃস্থানীয় ভারতীয় স্যার চার্লস মেটকাফ-কে তাঁর যাবতীয় সৎকর্মের জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে টাউন হলে সমবেত হন। ১৮৩৮ সালের ১৯ মার্চ এখানে অনুষ্ঠিত এক সাধারণ সভায় ‘দি ল্যান্ড হোলডার্স সোসাইটি’ আত্মপ্রকাশ করে।

কালক্রমে ভারতীয়রা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয়দের সংগে একযোগে কাজ করার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন। প্রকৃতপক্ষে ‘ব্ল্যাক অ্যাকট’ বিতর্ক আন্ত-বর্ণ সহযোগিতার বিষয়টিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দেয়। ফলত যৌথ সভার উদ্যোগ ধীরে ধীরে থেমে যায়। উনিশ শতকের শেষার্ধে রাজনীতি সচেতন ভারতীয় ও জাত্যাভিমানী ইউরোপীয়দের মধ্যেকার সংঘাত তীব্র হতে থাকে। টাউন হলে অনুষ্ঠিত এ সময়কার সভাগুলিতে তার প্রতিফলন দেখা যায়। উনিশ শতকের শুরু থেকে শেষাবধি রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রমানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, শেখ লাল মুহম্মদ, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, আগা মির্জা শিরাজীর মতো স্বনামধন্য ভারতীয়রা কলকাতা টাউন হলে সভা করেন। ১৮৭৮ সালের ১৫ মে টাউন হলে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ’ আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করে। দি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিভিন্ন সময়ে টাউন হলটি ব্যবহার করে। এখানেই ১৮৯০-এর দশকে জগদীশ চন্দ্র বসু বিদ্যুৎ তরঙ্গ বিষয়ে তাঁর প্রথম দিককার গবেষণাগুলি প্রদর্শন করেন। এ টাউন হলেই ১৮৯৮ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত ‘কণ্ঠ রোধ’ বক্তৃতাটি প্রদান করেছিলেন।

কলকাতা টাউন হলের ইতিহাসে বিশ শতকের প্রথম দশক অত্যন্ত ঘটনাবহুল। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট টাউন হলে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে স্বদেশী আন্দোলণের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী বছরগুলিতে সত্যেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, সুবোধ চন্দ্র মল্লিক, আবদুর রসুল, ইউসুফ খান, আব্দুল হালিম গজনবী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সামসুল হুদাসহ অন্যরা বিভিন্ন সময়ে টাউন হলে আসেন এবং সভায় ভাষণ দান করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে কলকাতার রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পরিবর্তন দেখা দেয়। শহরের রাস্তায় নেমে আসে উত্তপ্ত রাজনীতি। ফলে টাউন হল রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তার পূর্বেকার গুরুত্ব হারায়। শ্রদ্ধানন্দ পার্ক, দেশবন্ধু পার্ক, ওয়েলিংটন স্কয়ার, হাজরা পার্ক, অক্টারলোনি মনুমেন্ট রাজনীতির বিকল্প কেন্দ্রস্থল হিসেবে আবির্ভূত হয়। টাউন হল ফিরে যায় আনুষ্ঠানিক সমাবেশস্থল হিসেবে তার প্রারম্ভিক ভূমিকায়। ১৯১৯ সালে দ্বৈত শাসন প্রবর্তনের পর ‘বেঙ্গল লেজিস্লেটিভ কাউন্সিল’-এর কাউন্সিল চেম্বার হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে কলকাতা টাউন হল।

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার সি.ভি রমন, স্যার প্রফুল্ললচন্দ্র রায়, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, স্যার নীলরতন সরকার, রামানন্দ চ্যাটার্জী প্রমুখের মতো প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব টাউন হলে মিলিত হতেন এবং সেখানকার সভা-সমাবেশের শোভাবর্ধন করতেন। তবু এ-কথা সত্য যে, রাজনৈতিক কর্মকান্ডের উত্তাপ থেকে বঞ্চিত হয়ে এবং আপন সমৃদ্ধ ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একদা মহিমান্বিত কলকাতা টাউন হল অবশেষে কলকাতা করপোরেশনের নিষ্প্রভ অঙ্গ হিসেবে আরেকটি অফিস ভবনে পর্যবসিত হয়। [বাসুদেব চট্টোপাধ্যায়]