গজনবী, আবদুল হালীম


আবদুল হালীম গজনবী

গজনবী, আবদুল হালীম (১৮৭৬-১৯৫৩)  আবদুল হালীম আবু হুসাইন খান গজনবী, ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতীয় উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট রাজনীতিক, শিক্ষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, জমিদার ও সফল শিল্পপতি।  প্রাদেশিক পর্যায়ে অবিভক্ত বাংলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভারতের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বহু প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন এবং এসব ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

আবদুল হালীম খান গজনবী ১১ নভেম্বর ১৮৭৬ সালের বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার গ্রামের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আবদুল হাকিম খান গজনবীর দ্বিতীয় পুত্র এবং নওয়াব বাহাদুর স্যার আবদুল করীম আবু আহমদ খান গজনবীর সহোদর। তিনি কোলকাতার সিটি কলেজ-স্কুলে ও সেন্ট জেডিয়ার্স কলেজে শিক্ষা লাভ করেন।

আবদুল হালীম গজনবীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯০০ সালে। কর্মজীবনের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রতিনিধি, তদানীন্তন ময়মনসিংহ মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, লোকাল বোর্ডের সদস্য ও অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট। বঙ্গ বিভাগের শুরুতেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সুত্রপাত হয়। রাজনীতি ক্ষেত্রে তিনি সর্বভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের শীর্ষস্থানীয় জননেতা অশ্বিনী কুমার দত্ত (১৮৫৬-১৯২৩), বিপিন চন্দ্র পাল (১৮৫৮-১৯৩২), সুরেন্দ্রনাথ বানার্জী (১৮৭০-১৯২৫), চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫), অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২-১৯৫০) প্রমুখ থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তাঁর ব্যবসার কেন্দ্র ছিল কোলকাতায় এবং সেখানে ছিল কংগ্রেসী হিন্দুদের প্রাধান্য, সেহেতু বৈষয়িক স্বার্থে তিনি কংগ্রেসীদের সমস্বরে  বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশী আন্দোলন এ কিছু দিন (১৯০৫-০৬) নেতৃত্ব দেন।

১৯০৫ সালের ২৭ আগষ্ট ঢাকার জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রাঙ্গনে আনন্দ চন্দ্র রায়ের (১৮৪৪-১৯৩৫) সভাপতিত্বে বঙ্গবিভাগের বিরুদ্ধে এক জনসভায় আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন এবং তার ভাষণে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে ব্রিটিশ দ্রব্য সামগ্রি বর্জনের আহবান জানান।

১৯০৬ সালে বরিশালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মেলনে (১৪ ও ১৫ এপ্রিল) তিনি অংশ গ্রহণ করেন। ১৯০৭ সালে ২৬-২৭ ডিসেম্বর সুরাটে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর ২৩ তম অধিবেশনে আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন। ওই সময় কংগ্রেসে ভাঙ্গন ধরায় তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগে যোগদান করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের পর ১৯১২ সালের ২ মার্চ তারিখে কোলকাতা ডালহৌসী স্কোয়ারে নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ এর সভাপতিত্বে উভয় বঙ্গের মুসলিম নেতৃবৃন্দেন এক গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আবদুল হালীম গজনবী যোগদান করেন। ১৯২৬ সালের ২৯-৩০ ডিসেম্বর তারিখে দিল্লীতে ‘অলইন্ডিয়া মুসলিম লীগ’-এর আঠারোতম বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ওই অধিবেশনে রয়েল কমিশনের নিকট পরিকল্পনা দাখিল করার জন্য গঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন আবদুল হালীম গজনবী।

আবদুল হালীম গজনবী অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলের  সদস্য ও সেন্ট্রাল লোজিসলেটিভ এসেম্বলীতে মুসলিম লীগ পালামেন্টারি পার্টিরও সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯২৭ সালে ঢাকা বিভাগের মুসলিম গ্রামীন এলাকা থেকে, ১৯৩১ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ (মুসলমান) গ্রামীন এলাকা হতে এবং ১৯৩৫ সালে শেষোক্ত এলাকা থেকে ভারতীয় ব্যবস্থা্পক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একটানা ওই পদে বহাল ছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি কানপুরে নিখিল ভারত মুসলিম কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন। ভারতের শাসন সংস্কারের জন্য ১৯৩০, ১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত তিনটি গোলটেবিল বৈঠকেই আবদুল হালীম গজনবী প্রতিনিধি রূপে যোগদান করেন। তিনি কলকাতা কর্পোরেশন-এর শেরিফ ছিলেন। তিনি সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি এবং ব্রিটিশ ইন্ডয়ান এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। ১৯৩৫ সালে আবদুল হালীম গজনবী নাইট উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৪৩ সালের ২৮শে মার্চ ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পর ২৪শে এপ্রিল গভর্নরের আমন্ত্রণে খাজা নাজিমউদ্দীন নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ওই দিনই কোলকাতার টাউন হলে হালীম গজনবীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় নাজিমউদ্দীন মন্ত্রিসভা গঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ঢাকা-ময়মনসিংহ এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য পদের জন্য মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী মৌলভী তমিজউদ্দীন খান এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের পর তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে।

আবদুল হালীম গজনবী কোলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত মুসলিম চেম্বার অফ কমার্স (১৯৩৯-৪০) ও ইন্ডিয়া চেম্বার অফ কমার্স (১৯৪৫-৪৬)-এই দুটি সংস্থার সভাপতি ছিলেন। তিনি একাধিকবার ইন্ডিয়া স্টিমশিপ কোম্পানীর চেয়ারম্যান থাকাকালে দেশে জলযান নির্মাণ-শিল্পের উন্নতিসাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া কোলকাতার এক্সপোর্ট অ্যাডভাইজারি কমিটি এবং ইন্ডিয়ান সেণ্ট্রাল জুট কমিটিরও তিনি সদস্য ছিলেন। তিনি রেলওয়ে অ্যাডভাজিারি কমিটি (১৯২৭-৩২), রেলওয় স্ট্যান্ডিং ফাইন্যান্স কমিটি (১৯২৭-৩২), বার্মা সেপারেশন কমিটি (১৯৩৪), ফ্র্যাঞ্চাইজ কমিটি (১৯৩০), ফেডারেল ফাইনান্স কমিটি (১৯৩২), কনসালটেটিভ কমিটি (১৯৩৩), মাইনরিটিজ কমিটি (১৯৩০-৩২), পাবলিক একাউন্টস কমিটি (১৯৩৩) প্রভৃতির কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক কনফারেন্সে প্রেরিত ভারতীয় প্রতিনিধিদলের অ্যা্ডভাইজারি বোর্ডেরও তিনি অন্যতম সদস্য ছিলেন। সম্রাট ৫ম জর্জের রাজত্বকালের সিলভার জুবিলী-উৎসব পালনের জন্য গঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আবদুল হালীম কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের সদস্য, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের সদস্য, বেঙ্গল রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য, কোলকাতা সিটি কলেজেন গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় জাগরণে সংবাদপত্রের গুরুত্ব অনুধাবন করে গজনবী  ব্যারিস্টার আবদুল রসুল এর সঙ্গে একযোগে দি মুসলমান (১৮৮৫) এবং খাজা নাজিমুদ্দীনের সহযোগে The Star of India নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশের কাজের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এ দুটি পত্রিকা বাংলার মুসলিম জাগরণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৪৭ সালের পর হালিম গজনবী পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। এরপর তিনি আমৃত্যু দেলদুয়ারের গ্রামের বাড়িতেই কাটান। ১৯৪৮ সালে আবদুল হালীম গজনবী তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্য যে ট্রাস্ট ডীড করেছিলেন, তাতে তিনি সিটি কলেজে-স্কুলের জন্য বার্ষিক দু’টি রৌপ্য পদকের ব্যবস্থা রেখেছিলেন। আবদুল হালীম গজনবী ১৯৫৩ সালের ১৮ই জুন তারিখে দেলদুয়ার গ্রামের বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।  [মুহম্মদ আবদুস সালাম]