ঔষধ


ঔষধ (Drug)  রোগ নির্ণয়, প্রতিরোধ, ও চিকিৎসা নিমিত্তে ব্যবহূত দ্রব্য।

অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ  রোগের চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য বিবেচিত ঔষধ। ঔষধ কৃত্রিম উপায়ে তৈরি অথবা প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত নির্দিষ্ট রাসায়নিক গুণসম্পন্ন দ্রব্য। এগুলির রাসায়নিক গঠন জটিল এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে ব্যবহার্য। চিকিৎসার দুটি দিক নিরাময় ও যন্ত্রণামুক্তি। প্রথমটির দৃষ্টান্ত অ্যান্টিবায়োটিক যা রোগজীবাণু ধ্বংস করে এবং দ্বিতীয়টি নির্দিষ্ট কিছু রোগের উপসর্গ উপশম করে, যেমন দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা ও বেদনায় ব্যবহূত অ্যাসপিরিন। প্রতিরোধ বলতে সাধারণত শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগনিবারক ব্যবস্থা গড়ে তোলা বোঝায় যা টিকা বা ভ্যাকসিনের (vaccine) মাধ্যমে অর্জিত হয়। আবিষ্কৃত অসংখ্য ঔষধই প্রয়োজনীয় এবং প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশই নির্দিষ্ট কিছু রোগের চিকিৎসায় অপরিহার্য। কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের ধারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার এবং নির্দিষ্ট দেশের রোগের ঘটনা ও বিস্তৃতির নিরিখে বিকশিত হয়েছে। জীবন রক্ষাকারী সকল ঔষধই অবশ্য অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ঔষধ কোনো দেশের অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকায় স্থান পাবে কি না তা মূলত সেই দেশে ওই জাতীয় রোগ আছে কি না অথবা ওই দেশে এই জাতীয় রোগ একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যসমস্যা কিনা তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ দেশই অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের একটি তালিকা সংরক্ষণ করে এবং এই কার্যক্রমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহায়তা দিয়ে থাকে। অতীতে, বিশেষত বিশ শতকের আশির দশকে বাংলাদেশের অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকায় ২০০টি ঔষধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। নববইয়ের দশকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই তালিকা দীর্ঘতর হয়। একটি হলো নববইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দেশের বাজার অর্থনীতিতে ঔষধ ব্যবসার ব্যাপক সম্পৃক্তি এবং অন্যটি হলো একটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই স্বাস্থ্যনীতির আলোচনা পূর্ববর্তী কয়েক দশক থেকে নববইয়ের দশক পর্যন্ত চলেছিল যা এখনও আইনে পরিণত হয় নি। [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

মাদকাসক্তি  ব্যবহারের নির্দেশিত বিন্যাসের বিচ্যুতি ঘটিয়ে সচরাচর স্ব-প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো ঔষধের ব্যবহার বা অতি ব্যবহার। এমন ঔষধের মধ্যে রয়েছে বেদনানাশক, চিত্তপ্রশমনকারী, প্রশান্তিদায়ক, নিদ্রাকারক পিল, চেতনানাশক ইত্যাদি, যা রোগ চিকিৎসাতে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দূরীভুত করার প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব ঔষধের মধ্যে কয়েক রকমের ঔষধ সুস্থ মানুষ ব্যবহার করলে তাদের দেহে নানা রকমের মানসিক ও আচরণগত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় যা তাদের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে থাকে যেমন স্বপ্নের মতো অনুভূতি বা উদ্ভট রকমের উপলব্ধিজাত অভিজ্ঞতা সৃষ্টি।

ঔষধের অপব্যবহার সারা বিশ্বেই একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা যা শিল্পোন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক উন্নয়নশীল দেশে এসব ঔষধের অনেকগুলি বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে। এগুলির তৈরির ওপর নিয়ন্ত্রণের অভাবে এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এই দ্রব্যগুলি অবৈধ পথে বিক্রয় হয় এবং প্রায় ক্ষেত্রেই উচ্চ মূল্যে, কারণ পাশ্চাত্যের গোপন বাজারগুলিতে এসবের প্রচুর চাহিদা বিদ্যমান। এসব ভীতিকর দ্রব্য এদের প্রস্ত্ততকারী দেশসমূহকে ছাড় দেয় না। উৎপাদনকারী দেশগুলিই দ্রুত ভোক্তা দেশে পরিণত হয়।

মাদকাসক্তি মানুষের সমাজে কোনো নতুন বিষয় নয়। সভ্যতার শুরু থেকেই এর সূচনা যখন মানুষ কৃষিকাজে মনোনিবেশ করে এবং স্বাভাবিকভাবে জন্মলাভ করা গাছগাছড়া আবিষ্কার করে, যেগুলি ব্যবহার করলে মেজাজের পরিবর্তন ঘটে এবং সুখকর অনুভূতি হয়। এই উপমহাদেশের অংশ বিশেষে গাঁজা ও আফিমের অপব্যবহার প্রাচীন কাল থেকেই ছিল। মদজাতীয় পানীয়ের ব্যবহারও খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল যদিও মদের নেশাকে সমাজে সব সময়ই অগ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করা হতো।

যেসব মাদকদ্রব্য সচরাচর ব্যবহার হয়ে থাকে এগুলিকে ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। আফিমজাত মাদক, অবসাদকারী-নিদ্রা আনয়নকারী মাদক, উত্তেজক, দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টিকারী মাদক, গাঁজা জাতীয় এবং শ্বাসের সঙ্গে টেনে নেওয়া দ্রব্যসমূহ। আফিমজাত মাদকের মধ্যে আছে আফিম, মরফিন এবং হেরোইন। এগুলি তৈরি হয় পপি ফুলের শুটি থেকে। অবসাদকারী ও নিদ্রা-আনয়নকারী মাদকদ্রব্য হচ্ছে বারবিচুরেট, যেগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উদ্বেগ প্রশমন এবং নিদ্রা আনয়নের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কোকেন দক্ষিণ আমেরিকার কোকেন গাছের একটি উৎপন্ন দ্রব্য। এটি চেতনাহরণের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে এবং এটি খুবই আসক্তিকারক। কোনো কোন ক্যাকটাস বা ফণীমনসা জাতীয় গাছ এল.এস.ডি (লিসারজিক এসিড ডাইইথাইলএমাইড)-এর মতো দৃষ্টিবিভ্রম সৃষ্টিকারী দ্রব্য উৎপন্ন করে থাকে যেমন, মেসকালাইন। ফেনসাইক্লিডিন (যেটি বাংলাদেশের কালোবাজারে ফেনসিডিল নামে পাওয়া যায়) একটি শক্তিশালী দৃষ্টি বিভ্রমকারী।

বাংলাদেশে মাদকাসক্তি একটি ক্রমবর্ধমান প্রধান সামাজিক সমস্যারূপে চিহ্নিত। অতীতে আসক্তি আনয়নকারী দ্রব্যসমূহ স্থানীয়ভাবে সহজে পাওয়া যেত না এবং পেলে সীমিত পরিমাণে পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পণ্য দ্রব্যের চলাচল দ্রুত হয়েছে এবং একই সঙ্গে ঔষধ ও মাদকদ্রব্যের ব্যবসারও সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশের প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ ফেনসিডিল মাদকের নিয়মিত ব্যবহারকারী, এছাড়াও আছে গাঁজা, হেরোইন এবং পেথিডিন ইনজেকশন, ঘুমের বটিকা, প্রশান্তিদায়ক, অবসাদকারক বা অনুরূপ কোনও ঔষধ।

দেশে মাদকাসক্ত লোকের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির বিপরীতে অনেক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র দেশের বড় বড় শহরগুলিতে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সমস্যার গুরুত্বের অনুপাতে এগুলির সংখ্যা অপ্রতুল। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন প্রচেষ্টা যথেষ্ট ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ। মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি পরিকল্পনার আওতায় ১৯৮৯ সালে ঢাকার তেজগাঁও-এ একটি মাদকাসক্তি নিরাময় প্রতিষ্ঠান (কমিউনিটি ড্রাগ এডিকশন ইনস্টিটিউট) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মাদকাসক্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি সত্ত্বেও এটির সুযোগসুবিধা প্রথম দিক থেকেই অপ্রতুল ছিল। অধুনা এর সুযোগ সুবিধার আরও অবনতি হয়েছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানটি বস্ত্তত অকার্যকর।

১৯৯০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বেসরকারি খাতে যদিও অনেক পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এগুলিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, লোকবল এবং চিকিৎসা সুবিধা অপর্যাপ্ত। প্রকৃতপক্ষে এই কেন্দ্রগুলি সংশোধনমূলক অবরুদ্ধ থাকার স্থান হিসেবেই ব্যবহূত হয়, যেখানে মাদকাসক্তরা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে কিছুকাল কাটান এবং মাদক নির্ভরতার কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।  [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

ঔষধের সদ্ব্যবহার (rational use of drug)  এমন এক চিকিৎসা ব্যবস্থা যা সাধারণ মৌলিক নীতির ওপরে ভিত্তি করে প্রদত্ত; অথবা যুক্তিসিদ্ধ প্রক্রিয়া, বিচক্ষণতা কিংবা সুস্থ চেতনার মাধ্যমে কোনো ঔষধের প্রয়োগ বা ব্যবহার। ঔষধ একটি সাধারণ শব্দ যা কোনো রাসায়নিক দ্রব্যকে বোঝায় এবং তা কোনো জীবন্ত প্রাণী গ্রহণ করলে তার এক বা একাধিক শারীরিক কার্যক্রমের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। সচরাচর রোগের চিকিৎসাতেই ঔষধের ব্যবহার হয়ে থাকে। দুটি সাধারণ শ্রেণির ঔষধের একটি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যটি যেসব ঔষধে নেশা হয়ে থাকে। প্রথমটি একটি অপরিহার্য শ্রেণির ঔষধ যা সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচিয়ে থাকে। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও যথেচ্ছ ব্যবহার প্রায় সুনিশ্চিতভাবেই জীবাণুদের মধ্যে এমন বংশগতি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রজন্মের বিকাশ ঘটায় যা এই ঔষধের কার্যকারিতার বিরূদ্ধে প্রতিরোধ প্রদর্শন করে থাকে। এটি ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বহুল পরিচিত সমস্যা। দ্বিতীয় শ্রেণির ঔষধ যেগুলিকে অভ্যাস বা নেশা সৃষ্টিকারীরূপে গণ্য করা হয় সেগুলির ক্ষেত্রে এমন পরিণতি হয় না। তবে নেশাগ্রস্ত লোকেরা সহজেই কয়েক রকমের রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধহীন থাকে এবং অনেক নেশাগ্রস্ত লোকই সমাজবিরোধী ও দুষ্কৃতিমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতোই বাংলাদেশেও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বিধিবদ্ধ করা একটি সমস্যা। এখানে ভাইরাস, জীবাণু বা পরজীবীঘটিত সংক্রামক রোগের পরিমাণ খুবই বেশি। মানুষের জীবন বাঁচাতে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা অনস্বীকার্য। এখানে প্রতি ১০,০০০ লোকের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২.৬ জন, যা পৃথিবীতে সর্বনিম্ন বলা যায়। এ কারণে যথাযথ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার মাত্র জনগণের একটি অংশের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। এছাড়া ব্যবস্থাপত্র পদ্ধতিও মোটেই আদর্শ নয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হচ্ছে নানারকমের সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত বিভিন্ন স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচির কারণে এবং ঔষধের দোকানসমূহের ব্যাপক সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অ্যান্টিবায়োটিক এর সহজলভ্যতা। ফলে চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়াই দেশে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় হয়। অনেক হাতুড়ে ডাক্তার এমনকি সাধারণ গ্রামবাসীরাও যাদের কিছুটা শিক্ষা আছে, তারা অ্যান্টিবায়োটিকসহ অনেক রকমের ঔষধের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানিক নামের ব্রান্ডের সঙ্গে পরিচিত। এসবের ব্যবহার সম্বন্ধে এদের কিছু ভাসা ভাসা ধারণা আছে। ফলে প্রায় ক্ষেত্রেই এরা নিজেদের জন্য অথবা মাঝে মাঝে অন্যদেরও ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকে। কম দামি অ্যান্টিবায়োটিকসমূহ যা সাধারণ মানুষের জন্য প্রথম সারির অস্ত্র বলে গণ্য, প্রতিরোধ বিকাশের কারণে এগুলির কার্যকারিতা  দ্রুত হারিয়ে যায়। উদার ও খোলা বাজার নীতির কারণে এখন অধিক মূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক সহজেই পাওয়া যায়। তবে এটি শুধু তাদের জন্য যাদের সামর্থ্য আছে।

নেশায় পরিণত হয় এ ধরনের ঔষধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্রটা খুব উৎসাহব্যঞ্জক নয়। ব্যবস্থাপত্র ব্যতিরেকে নানা ঔষধ ব্যবহার হচ্ছে যেমন জ্বর ও প্রদাহ উপশমকারী, প্রশান্তিদায়ক, বেদনানাশক, ঘুমের বড়ি এসব। ফেনসিডিল নামক একপ্রকার চেতনা হরণকারী ঔষধ যা মন, আচার-আচরণ বা মেজাজের ওপর ক্রিয়াশীল এবং স্বপ্নের বা উদ্ভট উপলব্ধির অনুভূতি সৃষ্টি করে তা অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অপব্যবহূত একটি জোরালো ঔষধ।  [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

ঔষধ আইন, ১৯৪০ দেশে ঔষধের আমদানি, রপ্তানি, তৈরি, পরিবেশন ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রক সরকারি বিধি। এ আইন সর্বপ্রথম ভারত সরকার কর্তৃক ১৯৪০ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত হয় এবং পরবর্তীকালে পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষাক্রমে সংশোধিত ও ১৯৫৭ সালের ২১ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়। এটি বাংলাদেশে গৃহীত হয় ১৯৭৪ সালে [Bangladesh Laws (Revision and Declarations) (Amendment) Act No. LIII of 1974]।

এই আইন একদিকে দেশে নিম্নমানের ও ক্ষতিকর ঔষধের অনুপ্রবেশ রোধের জন্য ঔষধের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে এটি দেশে নিম্নমানের বা ভেজাল ঔষধ তৈরি বন্ধের জন্য ঔষধ তৈরির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ঔষধ ক্রয়-বিক্রয়, মিশ্রণ, বিতরণ ও পরিবেশন বস্ত্তত বিশেষজ্ঞের কাজ বিধায় আইনে এমন বিধি আছে যাতে শুধু সুযোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

এ আইনে সরকার প্রদত্ত যথাযোগ্য অনুমোদিত লাইসেন্স বা পারমিটের মাধ্যমেই কেবল কোনো কোন শ্রেণির ঔষধ আমদানি চলতে পারে। দেশে আমদানিকৃত সকল শ্রেণির ঔষধের ক্ষেত্রেই নির্ধারিত মান এবং তফসিল নির্ধারিত লেবেল ও প্যাকিং অনুযায়ী মোড়কবদ্ধ হওয়া বাধ্যতামূলক। সব শ্রেণির ঔষধ তৈরির এবং বিতরণ বা বিক্রয়ের জন্যও লাইসেন্স গ্রহণের বিধান আছে। এ আইনে বিশেষভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ঔষধ পরিদর্শক দ্বারা লাইসেন্সকৃত স্থানসমূহে নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে ঔষধ তৈরি বা বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া তৈরি বা বিক্রেয় ঔষধসমূহের নমুনা সংগ্রহ, সেগুলিকে কেন্দ্রীয় ঔষধ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঔষধের মানের ওপর নজরদারি রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।

এ আইনের আওতায় প্রণীত কতিপয় ঔষধবিধি মোতাবেক বিভিন্ন শ্রেণির ঔষধের প্যাকিং ও লেবেলিংয়ের নির্দিষ্ট ধরন বর্ণিত আছে। আইনটির অন্তর্ভুক্ত ২০টি তফসিলে বিভিন্ন ঔষধ, মাদক, বিষ ইত্যাদির তালিকা, ঔষধ বিশ্লেষণের জন্য প্রদেয় ফি-র হার, ঔষধের মেয়াদ ইত্যাদি বিষয় বর্ণিত রয়েছে।

আইনের আওতায় গঠিত ঔষধ সংক্রান্ত একটি উপদেষ্টা বোর্ড (Drugs Technical Advisory Board) এই আইনের প্রয়োগ ও পরিচালনার কারিগরি দিকগুলির ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। সরকার ও বোর্ডকে দেশব্যাপী সমভাবে এই আইনের প্রয়োগ ও প্রশাসনের ব্যাপারে পরামর্শ দানের জন্য ঔষধ পরামর্শদাতা কমিটি (Drugs Consultative Committee) গঠিত হয়েছে।  [আবদুল গনি]

ঔষধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২ বাংলাদেশে সব ধরনের ঔষধ তৈরি, আমদানি, পরিবেশন, বিপনন ও বিক্রয় নিয়ন্ত্রক অধ্যাদেশ। ১৯৮২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক কর্তৃক জারিকৃত এ অধ্যাদেশটি ১৯৮২ সালের ৮নং অর্ডিন্যান্স নামে পরিচিত। এই অধ্যাদেশের বিধানসমূহ ১৯৪০ সালের ঔষধ আইনের ধারাগুলির অতিরিক্ত সংযোজন।

এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার ১. একটি ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরিষদ (Drug Control Committee) গঠন করে, যাতে একজন চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন সদস্য থাকেন; এবং ২. একটি জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদও (National Drug Advisory Council) গঠন করে, যেখানে একজন চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন সদস্য থাকেন।

এই অধ্যাদেশ বলে ১. লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নথিভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ঔষধ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রস্ত্ততকরণ, আমদানি, বিতরণ বা বিক্রয় নিষিদ্ধ; ২. লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদন ব্যতীত কোনো ঔষধ বা ঔষধের কাঁচামাল দেশে আমদানি নিষিদ্ধ; ৩. ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরিষদ কর্তৃক অননুমোদিত কোনো ঔষধ লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ নথিভুক্ত করতে পারে না; ৪. ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরিষদ কোনো ঔষধের নিরাপত্তা ও ব্যবহারযোগ্যতা সম্বন্ধে সন্তুষ্ট না হলে এরূপ ঔষধ বাতিলের সুপারিশ করতে পারে; ৫. সরকার কোনো ঔষধের ক্রীত কাঁচামালের মূল্যের নিরিখে ঔষধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণক্রমে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন জারি করতে পারে; ৬. বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের ‘এ’ গ্রেডভুক্ত কোনো রেজিস্ট্রিকৃত ঔষধ প্রস্ত্ততকারীর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধান ব্যতীত কোনো ঔষধ তৈরি নিষিদ্ধ; ৭. বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের নথিভুক্ত কোনো ঔষধ প্রস্ত্ততকারীর ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধান ব্যতীত কোনো খুচরা বিক্রেতা কর্তৃক কোনো ঔষধ বিক্রি নিষিদ্ধ; এবং ৮. সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনে ঔষধ আদালত গঠন করতে পারবে।

এই অধ্যাদেশের অধীনে উপরে উল্লেখিত বিধিসমূহ লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তি বিধানের (জরিমানা, কারাদন্ড, রেজিস্ট্রেশন প্রত্যাহার, লাইসেন্স বাতিল ইত্যাদি) ব্যবস্থাও রয়েছে।

জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ সরকারকে যেসব বিষয়ে পরামর্শ দান করতে পারবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় ঔষধনীতি বাস্তবায়নে করণীয়; স্থানীয় ঔষধশিল্পের বিকাশ এবং দেশের চাহিদা মিটাবার মতো প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র ও কাঁচামালের আমদানি; এবং ঔষধ তৈরি, আমদানি, বিতরণ ও বিক্রয় বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধনের পদ্ধতি।  [আবদুল গনি]

ঔষধনীতি রোগ বা অভাবজনিত ব্যাধি আরোগ্য, উপশম বা প্রতিরোধের জন্য বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহূত ঔষধের উপাদানগুলির যৌক্তিক ব্যবহারের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক গৃহীত ও অনুসৃত কর্মনীতি। বিশ্বে বাংলাদেশই প্রথম দেশ যে ‘আলমা-আতা’র (Alma-ata) নীতিমালা প্রবর্তন এবং ১৯৮২ সালে গৃহীত ঔষধনীতি গ্রহণের মাধ্যমে মৌলিক ঔষধনীতি বাস্তবায়ন করেছিল। জাতীয় ঔষধনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল: (ক) একশ পঞ্চাশটি প্রয়োজনীয় ঔষধের একটি তালিকা এবং ১০০টি বিশেষ শ্রেণির ঔষধের পরিপূরক একটি তালিকা প্রস্ত্তত। প্রধান তালিকাটি আবার তিনটি ব্যবহারিক স্তরে বিভক্ত ছিল; ১২টি ঔষধ গ্রামীণ কর্মীদের জন্য, ৪৫টি ঔষধ প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিচর্যার জন্য এবং মোট ১৫০টি ঔষধই তৃতীয় পর্যায়ের পরিচর্যার জন্য; (খ) পয়তাল্লিশটি প্রাথমিক পরিচর্যার ঔষধ তৈরি ও বিক্রয়ের জন্য জেনেরিক নাম ব্যবহার; (গ) ১৯৮৩ সালের মধ্যে একটি জাতীয় ঔষধবিধি পুস্তিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ; (ঘ) উৎপাদের পেটেন্ট পরিহার এবং প্রসেস পেটেন্ট ব্যবহার সীমিতকরণ; (ঙ) ১৯৪০ সালের ঔষধ আইন সংশোধন, যাতে থাকবে আয়ুর্বেদিক, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথিক ঔষধের জন্য একটি রেজিস্ট্রেশন প্রথা; উপযুক্ত মাননিয়ন্ত্রণসহ উত্তম উৎপাদন অনুশীলনে বাধ্যকরণ (জিএমপি); লেবেল ও বিজ্ঞাপণ নিয়ন্ত্রণ; দাম নিয়ন্ত্রণ; টক্সিক/বিষাক্ত ও খারাপ অভ্যাস গঠনকারী ঔষধের ব্যবস্থাপত্র নিয়ন্ত্রণ; বিশেষ ড্রাগ কোর্ট স্থাপন ও জরিমানা; বিদেশি সহযোগীদের সঙ্গে চুক্তি, লাইসেন্সিং ও প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ন্ত্রণ; ১৯৮৫ সালের মধ্যে একটি জাতীয় ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার স্থাপন; ব্যথানাশক, ভিটামিন, অ্যান্টাসিডের মতো সাধারণ ঔষধ প্রস্ত্তত থেকে বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলিকে বিরতকরণ; প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে শিক্ষিত ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধানে খুচরা রেজিস্টার্ড ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা এবং সকল থানা স্বাস্থ্য প্রশাসককে ঔষধ পরিদর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে ঔষধ প্রশাসন শক্তিশালীকরণ।

১৯৪০ সালের ঔষধ আইন কাঁচামাল এবং ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদনের মূল্য নিয়ন্ত্রণে অপ্রতুল ছিল। বাজারে নকল ঔষধ ও নিকৃষ্ট মানের ঔষধ উৎপাদন, অনৈতিক বিপণন এবং অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ঔষধের সংখ্যাবৃদ্ধি প্রতিরোধেও আইনটি ব্যর্থ হয়েছিল। দেশের বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ঔষধ বাজারের অবস্থা পর্যালোচনা এবং একটি জাতীয় ঔষধনীতি প্রণয়ন সুপারিশের জন্য সরকার ১৯৮২ সালের ২৭ এপ্রিল ৮ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি নিযুক্ত করে। ১৯৮২ সালে ১২ জুন ঔষধনীতি গ্রহণের পূর্বে চার হাজারেরও বেশি ঔষধ বাজারে ছিল, যেগুলির অধিকাংশই ছিল অকার্যকর, এমনকি ক্ষতিকরও।  পরবর্তীতে ২০০৫ সালে ১৮ এপ্রিল ‘জাতীয় ঔধধনীতি ২০০৫’ প্রণীত হয়।  [মুনীর উদ্দিন আহমেদ]

ক্ষতিকর ঔষধ আইন, ১৯৫১ (dangerous drug act, 1951)  বার বার ব্যবহারে অভ্যাসে পরিণত হয় এবং অবাঞ্ছিত, কখনও কখনও বিপদজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এমন সব ঔষধ তৈরি, বিক্রয়, ব্যবসা, পরিবেশন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রক আইন। কোকেন, আফিম ও গাঁজা, এগুলির রাসায়নিক উপাদান এবং তা থেকে উৎপন্ন সামগ্রী ক্ষতিকর ঔষধের আওতাভুক্ত। চিকিৎসায় এগুলি মূলত বেদনানাশক হিসেবে ব্যবহূত হয়। কিন্তু এসব ঔষধ অনেক সময় কিছু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া– সুখোচ্ছ্বাস, মেজাজের পরিবর্তন, মানসিক আচ্ছন্নতা, শ্বাসকার্যের শ্লথতা, রক্তচাপ হ্রাস, বমনেচ্ছা ও বমি, কোষ্ঠবদ্ধতা, মূত্র হ্রাস এবং অন্তঃস্রাবী গ্রন্থি ও স্নায়ুতন্ত্রের বৈকল্য ঘটায়। অভ্যাস সৃষ্টিকারী ও নেশাকর বিধায় এসবের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সামাজিক দিক থেকে ক্ষতিকর। ব্যক্তি চরিত্রের ওপর এসব ঔষুধের নেতিবাচক প্রভাবের নিরিখে কেবল নির্ভেজাল চিকিৎসা ব্যতীত এগুলির অন্যান্য প্রয়োগ সীমিত হওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেয়।

১৯৩০ সালে ভারতীয় আইনসভা ক্ষতিকর ঔষধ আইন, ১৯৩০ (Dangerous Drugs Act, 1930) গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালের পর ১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই আইনটি ক্ষতিকর ঔষধ আইন ১৯৫১ হিসেবে উপযুক্ত সংশোধনসহ গ্রহণ করে। ক্ষতিকর ঔষধ আইন ১৯৫১, এখন ক্ষতিকর ঔষধ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশেও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সংশোধনীসহ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এই আইনের আওতায় কোকা গাছ, গাঁজা ও আফিম-পপির চাষ, সংগ্রহ, মজুদ, আমদানি, রপ্তানি এবং প্রস্ত্ততকৃত আফিম এবং আফিমজাত দ্রব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আফিম উৎপাদনসহ ক্ষতিকর ঔষধ তৈরি বা তৈরি দ্রব্যসামগ্রী এবং ক্ষতিকর ঔষধ আমদানি-রপ্তানি সরকার কর্তৃক কেবল অনুমোদিত লাইসেন্সপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ করতে পারবে। নিম্নবর্ণিত দ্রব্যসমূহ ক্ষতিকর ঔষধ নামে সংজ্ঞায়িত: কোকা পাতা Erythroxylon গণের কোনো প্রজাতির পাতা ও কচি কুঁড়ি কিংবা সেগুলির মিশ্রণ যাতে ০.১০ শতাংশের বেশি   কোকেন থাকে। আফিম এটি Papaver somniferum প্রজাতির বীজকোষ থেকে নিষ্কাশিত কষ বা গুঁড়ো যাতে থাকে ০.২০ শতাংশের বেশি মরফিন। গাঁজা Cannabis sativa প্রজাতির স্ত্রী উদ্ভিদের পাতা, বোঁটা, মঞ্জরি বা কচিফলগুচ্ছ এবং এগুলি থেকে প্রস্ত্ততকৃত গাঁজা, সিদ্ধি, ভাং, চরস, হাশিশ বা এগুলির সঙ্গে মিশ্রিত নিষ্ক্রিয় বস্ত্তসহ প্রস্ত্তত পানীয়। তৈরি ঔষধ যাতে থাকে কোকা জাত দ্রব্য, ভেষজ গাঁজা এবং বিভিন্ন রকমের আফিমজাত সামগ্রী।

ক্ষতিকর মাদকদ্রব্য নিয়ে অননুমোদিত কাজকর্ম যেমন এগুলি তৈরি, বিক্রয় বা মজুত দন্ডনীয় অপরাধ। এতে প্রথম অপরাধের জন্য দুই বছর কারাদন্ড বা জমিরানা বা উভয়ই এবং পরবর্তী অপরাধের ক্ষেত্রে ৪ বছর কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয়ই হতে পারে। অপরাধের ধরন অনুসারে শাস্তির ধরন ও মাত্রা এই আইনের আওতায় নির্ধারিত বিধি মোতাবেক রদবদল হতে পারে। ক্ষতিকর মাদকবিষয়ক যাবতীয় ব্যবস্থাগ্রহণের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন প্রকার আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে গ্রহণীয় বৈধ ব্যবস্থাদি আইনে বর্ণিত আছে।  [আবদুল গনি]

ঔষধ প্রশাসন  দেশে ঔষধ তৈরি, আমদানি এবং মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে দায়িত্ব পালনকারী কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশে এই সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক নাম ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি অঙ্গ। অধিদপ্তরের অফিস ঢাকা মহানগরের তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নির্বাচিত একটি তালিকা থেকে ঔষধের কাঁচামাল এবং প্যাকেটবদ্ধ ঔষধ আমদানি করার জন্য বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানি এবং আমদানিকারকদের লাইসেন্স প্রদান করে থাকে। এই অধিদপ্তর ঔষধ পরীক্ষা গবেষণাগার এজেন্সি দ্বারা বাজারজাত ঔষধের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করে। উন্নতমানের পরীক্ষণ সুবিধাযুক্ত এই গবেষণাগারটি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, মহাখালীতে অবস্থিত।

দেশিয় আয়ুর্বেদিক এবং ইউনানি পদ্ধতির ঔষধ এই অধিদপ্তরের প্রশাসনিক আওতায় পড়ে। হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতির ঔষধ অবশ্য এই অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। প্রকৃতপক্ষে দেশে হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতির ঔষধ নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো সংস্থা নেই। কারণ এই পদ্ধতির ঔষধ সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞানের অপ্রতুলতার জন্য পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি এখনও নির্ণীত হয় নি, তবে বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশে যেখানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতি চালু আছে সেসব জায়গায় এই পদ্ধতি সুবিধাজনক এক গৃহচিকিৎসার মর্যাদা অর্জন করেছে। [জিয়া উদ্দিন আহমেদ]

ঔষধ উৎপাদন  গত দুই দশকে ঔষধশিল্পের উল্লেখযোগ্য প্রসার ঘটেছে। কাচের বোতল, প্লাস্টিকের পাত্র, অ্যালুমিনিয়ামের কলাপসিবল টিউবস, অ্যালুমিনিয়াম পিপি ক্যাপ, ইনফিউশন সেট এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ, ভাঁজযোগ্য হার্ডবোর্ডের কার্টুন ইত্যাদি সম্পূরক শিল্প সংগঠনে ঔষধশিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ সহযোগিতা করেছে। এসব সামগ্রীর কিছু কিছু বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে।  মুদ্রণ এবং প্যাকেজিং শিল্প এমনকি বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলিও ঔষধশিল্পকে তাদের প্রধান ক্লায়েন্ট বা খদ্দের এবং তাদের বিকাশের ক্ষেত্রে চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে।

এই খাত উচ্চশিক্ষিতদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তাই ঔষধশিল্প স্থাপনের মাধ্যমে তাদের যাত্রা শুরু করেছিলেন। দেশের ঔষধশিল্পগুলি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গকে উৎপাদিত নতুন ঔষধ এবং এ সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে সরাসরি অথবা পক্ষোভাবে বিরাট অবদান রেখে যাচ্ছে।

১৯৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ পাস হওয়ার পর অনেক স্থানীয় ঔষধ কোম্পানি তাদের ঔষধের সংখ্যা এবং গুণগত মানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। বাংলাদেশের ঔষধ ব্যবসার শতকরা ৬৫ ভাগ বর্তমানে দেশিয় কোম্পানিগুলির নিয়ন্ত্রণে। অবশ্য দেশের কুড়িটি প্রধান ঔষধ কোম্পানির মধ্যে ৬টি হচ্ছে বহুজাতিক। এই কোম্পানিগুলির মাধ্যমেই প্রায় সকল আমদানিকৃত জীবন রক্ষাকারী ঔষধ এবং ঔষধ তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাত করা হয়। বহুজাতিক এবং বড় বড় দেশিয় কোম্পানিগুলি সাধারণত ঔষধসামগ্রী প্রস্ত্ততের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণে এবং উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকে। দেশের ঔষধ প্রশাসন-সংক্রান্ত আইনের মূলভিত্তি হচ্ছে ১৯৪০ সালের ড্রাগ অ্যাক্ট এবং এই আইনের আওতায় তৈরি বিধি-বিধান। ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক এবং বায়োকেমিক ঔষধকে এই আইনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়। ওই সময় ঔষধশিল্প বিদেশি কোম্পানিগুলির নিয়ন্ত্রণে ছিল। সে সময় অ্যালোপ্যাথিক ঔষধের ক্ষেত্রে ফার্মেসিগুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে ঔষধ তৈরির ব্যবস্থা ছিল।

স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশে অন্যান্য খাতের মতো ঔষধশিল্পও অবহেলার শিকার হয়। অধিকাংশ বহুজাতিক কোম্পানির ঔষধ তৈরির কারখানা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় দেশে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ঔষধশিল্পের ভিত্তি ছিল খুবই দুর্বল। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর পর্যন্ত সরকার স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়বরাদ্দ বাড়াতে পারে নি। ফলে জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় ঔষধ লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ১৯৮২ সালে ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় বহু ঔষধ বাজারজাতকরণ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। বাজারে প্রতিযোগিতা থাকার কারণে বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনীয় ঔষধের দাম তুলনামূলকভাবে কম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রাখা সম্ভব হয়। ১৯৮১ সালে দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ঔষধ কারখানার সংখ্যা ছিল ১৬৬টি, তবে ঔষধ উৎপাদনে ৮টি বহুজাতিক কোম্পানি তাদের আধিপত্য বজায় রাখে এবং তারাই শতকরা ৭৫ ভাগ ঔষধ প্রস্ত্তত করে। ২৫টি মাঝারি আকারের ঔষধ কোম্পানি শতকরা ১৫ ভাগ এবং ১৩৩টি ছোট ছোট কোম্পানি বাকি ১০ ভাগ ঔষধ তৈরি করত। এই সকল কোম্পানি বার্ষিক ৬০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত কাঁচামাল থেকে স্থানীয়ভাবে ঔষধ তৈরি করত। দেশে ১৬৬টি স্থানীয় ঔষধ কোম্পানি থাকা সত্ত্বেও প্রতিবছর ৩০ কোটি টাকা মূল্যের তৈরি ঔষধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। ১৯৮২ সালের ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অর্ডিন্যান্স-এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে যে, এর ফলে সীমিত পরিমাণ যে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া যেত তা শুধু ঔষধ তৈরির কাঁচামাল এবং দেশে উৎপাদিত হয়না এমন তৈরি ঔষধ আমদানিতেই ব্যয় করা সম্ভব হতো। এতে স্থানীয়ভাবে তৈরি ঔষধের মূল্য ১৯৮১ সালের হিসাবে ১১০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯৯ সালে ১,৬৯০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বর্তমানে ঔষধের মোট চাহিদার শতকরা ৯৫ ভাগ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধ দ্বারা মেটানো হচ্ছে। ১৯৮১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দেশিয় কোম্পানিগুলি ঔষধ বাজারে তাদের শেয়ার শতকরা ২৫ ভাগ থেকে ৭০ ভাগে উন্নীত করেছে।

২০০০ সালে দেশে মোট ২১০টি লাইসেন্সধারী ঔষধ কোম্পানির মধ্যে ১৭৩টি কোম্পানি ঔষধ উৎপাদন অব্যাহত রাখে, আর বাকি কোম্পানিগুলি হয়তো বা আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায় অথবা ঔষধ-সংক্রান্ত আইনভঙ্গের কারণে কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। তারা বিভিন্ন মাত্রায় ৫,৬০০ ব্র্যান্ডের ঔষধ তৈরি করত। দেশে লাইসেন্সধারী পাইকারি ঔষধ বিক্রেতার সংখ্যা ছিল ১,৪৯৫টি এবং লাইসেন্সধারী খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা ছিল ৩৭,৭০০টি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধের মধ্যে রোগসংক্রমণ প্রতিরোধক ঔষধের স্থান এক নম্বরে এবং এর পরপরই রয়েছে অ্যান্টাসিড জাতীয় ও আলসার নিরামক ঔষধের স্থান। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঔষধের মধ্যে রয়েছে প্রদাহ উপশমকারী ঔষধ, ভিটামিন, স্নায়বিক রোগ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট রোগের ঔষধ। সম্প্রতি স্থানীয় কারখানাগুলি মৌলিক কেমিক্যাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। বর্তমানে এমন ১৩টি ঔষধ প্রস্ত্ততকারী কোম্পানি রয়েছে যারা কোনো না কোনো মৌলিক উপাদান তৈরি করছে। এসবের মধ্যে রয়েছে প্যারাসিটামল, অ্যাম্পিসিলিন ট্রাই-হাইড্রেট, এমোক্সিসিলিন ট্রাই-হাইড্রেট, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রোক্সাইড ড্রাইড জেল, ডেক্সট্রোজ মনো-হাইড্রেট, হার্ড জিলাটিন ক্যাপসুল সেল, ক্লোরোকুইন ফসপেট, প্রোপানল হাইড্রোক্লোরাইড, বেনজল মেট্রোনিডাজল, সোডিয়াম স্টিবা-গ্লোকোনেট-(স্টিবাটিন) ইত্যাদি। অবশ্য ঔষধ উৎপাদন ব্যবস্থায় এগুলির সংশ্লেষণের শেষ পর্যায়টি এখনও সীমিত রয়েছে। দেশে সরকারি খাতে ৩টি ঔষধ প্রস্ত্ততকারী কোম্পানি রয়েছে, এর মধ্যে দুটি হচ্ছে ঢাকা ও বগুড়া শহরে অবস্থিত মেসার্স এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-এর শাখা। সংস্থাটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়-এর আওতায় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে চালু রয়েছে। ইডিসিএল ২০০০ সালে ৯৬ কোটি টাকা মূল্যের ঔষধ তৈরি করেছে। এছাড়া ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ (আইপিএইচ)-এর অধীনে ভ্যাকসিন এবং স্যালাইন তৈরির বড় কারখানা রয়েছে। ইডিসিএল এবং আইপিএইচ-এর উৎপাদিত ঔষধসামগ্রী মূলত সরকারি হাসপাতাল ও সংস্থায় ব্যবহূত হয়। ২০০০ সালে দেশে ২৬১টি ইউনানি, ১৬১টি আয়ুর্বেদিক, ৭৬টি হোমিওপ্যাথিক ও বায়োকেমিক লাইসেন্সধারী ঔষধ কোম্পানি ছিল। এরা ১২০ কোটি টাকা মূল্যের ঔষধ তৈরি করেছে।

ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিকটি হচ্ছে এর ফলে দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় সকল মাত্রার ট্যাবলেট, ক্যাপসুল, সেবনযোগ্য ও বাহ্যিক ব্যবহারের তরল ঔষধ, ক্রিম, ইনজেকশন, অ্যারোসল ইনহেল ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে। কিছু মৌলিক ঔষধ তৈরিতে দেশ স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে এবং কিছু ঔষধ বিদেশে রপ্তানি করছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন-ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে বিদেশ থেকে উৎপাদিত ঔষধ আমদানির পরিমাণ ১৯৮২ সালের পূর্ববর্তী পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। ঔষধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকার ১১৭টি জীবনরক্ষাকারী ঔষধ ও ভেষজ রাসায়নিক দ্রব্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ তালিকার বাইরে অন্যান্য ঔষধের মূল্য নির্ধারণ করা হয় বর্তমান বাজার দরের নিরিখে। এই নিয়ম কেবল স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ঔষধের বেলায় প্রযোজ্য। আমদানিকৃত ঔষধ, তালিকাভুক্ত এই ১১৭টি ঔষধের মধ্যে পড়ুক বা না পড়ুক, তার মূল্য নির্ধারণ করা হয় বাজারে মূল্য বৃদ্ধির একটা শতকরা গড় হিসাবের ভিত্তিতে। লক্ষণীয় যে, অনেক ঔষধের ওপর থেকেই মূল্যনিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার পরও ঔষধের বাজারদর বেড়ে যায় নি। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা থাকার কারণে ঔষধের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। ঔষধসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি অনন্য ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ঔষধ বিতরণ ব্যবস্থা অনেকটা খুচরা বিতরণমুখী এবং এই বিতরণ কাজটির বেশির ভাগ ঔষধ কোম্পানিগুলি নিজেরাই সম্পন্ন করে থাকে। এটা অন্যান্য দেশে বিরাজমান ব্যবস্থার বিপরীত। দেশে কোনো পেশাদার বিতরণ ব্যবসা গড়ে না ওঠার কারণে ঔষধ কোম্পানিগুলি দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত তাদের নিজস্ব গুদাম থেকে ঔষধ সরবরাহ করে। কোম্পানিগুলির পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিকট ঔষধ সরবরাহের কারণে পাইকারি বিক্রেতাদের ভূমিকা খুবই সীমিত থাকে। বেসরকারি খাতে গড়ে ওঠা কতিপয় ঔষধ কোম্পানি কিছু কিছু তৈরি ঔষধ এবং ঔষধ তৈরির কাঁচামাল রপ্তানি শুরু করলেও ঔষধের রপ্তানি বাণিজ্য এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। রপ্তানিকারী কোম্পানিগুলি তাদের সামগ্রী ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, মায়ানমার, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ওমান ও থাইল্যান্ডে এবং মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার কতিপয় দেশে রপ্তানি করছে।

ঔষধের গুণগতমান রক্ষা করার প্রাথমিক দায়িত্ব হচ্ছে ঔষধ প্রস্ত্ততকারী কোম্পানিগুলির। তথাপি সরকারের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নিরীক্ষা ও তদারকির দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের দুটি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। ঢাকার ল্যাবরেটরিটি ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ-এর এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ল্যাবরেটরিটি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক আওতাভুক্ত। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্ব হচ্ছে বাংলাদেশে ঔষধ বাজারজাতকরণের রেজিস্ট্রেশন প্রদান, ঔষধ কোম্পানিগুলি পরিদর্শন এবং লাইসেন্স প্রদান করা। বর্তমান কাঠামো এবং জনবল নিয়ে অর্পিত এই বিরাট দায়িত্ব পালনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে। ঔষধ শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশে জাতীয় ঔষধনীতি এবং ঔষধ নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত নীতি এখনও পুরোপুরি সফল হয়ে উঠে নি। সরকারের ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি তার সীমিত শক্তি দিয়ে দেশে উৎপাদিত সকল ঔষধের একই গুণগত মানের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারছে না। ‘প্যাটেন্ট রাইটস’-এর ব্যাপারে বিধি-নিষেধ আরোপের ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। পেটেন্ট প্রটেকশন সংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং শ্লথ রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতির কারণে নতুন গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় মূল্যনির্ধারণ পদ্ধতি বাজারে ঔষধের মূল্য কম রাখতে সফল হলেও এই পদ্ধতি বিপণন ও বিতরণ ব্যবস্থার খরচ পোষাতে অসুবিধার সৃষ্টি করছে। তাছাড়া মূল্যনির্ধারণের এই পদ্ধতি কোনো কোন কোম্পানি কর্তৃক ঔষধ উৎপাদনে অধিক বিনিয়োগ এবং ঔষধের গুণগত মানের নিশ্চয়তা বিধানের বিষয়টি বিবেচনায় রাখে নি। ড্রাগ অর্ডিন্যান্স জারির বিশ বছর পরেও চিকিৎসায় ব্যবহূত অ্যান্টাসিড, ভিটামিন ইত্যাদি কতিপয় জরুরি ঔষধের বাজার এখনও কেবল স্থানীয় কোম্পানিগুলির জন্য উন্মুক্ত। এই নীতি বৈষম্যমূলক এবং সরকারের বিঘোষিত বিনিয়োগনীতির পরিপন্থী।

ঔষধ খাতে বাংলাদেশে মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলির মধ্যে একটি। এতদসত্ত্বেও স্বাধীনতার পর থেকেই জাতীয় অর্থনীতিতে ঔষধশিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অবকাঠামোর উন্নয়ন, স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে এই শিল্পের আরও বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। এই খাতের সুষ্ঠু বিকাশ হলে একদিকে ঔষধ কোম্পানিগুলি নতুন ঔষধ চালু এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন ঔষধ আবিষ্কারে ব্রতী হবে, অন্যদিকে বাজারে অতি জরুরি ঔষধগুলির ব্যাপারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। [এ.কে.এম শামসুদ্দিন ও কে.এম.এ হুমায়ুন হাই]

আরও দেখুন অ্যান্টিবায়োটিক; আয়ুর্বেদিক ঔষধ; সামাজিক চিকিৎসা; লোকচিকিৎসা; হোমিওপ্যাথি; সনাতন চিকিৎসা