সনাতন চিকিৎসা


সনাতন চিকিৎসা (Traditional Medicine)  এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি, যার ভিত্তি উদ্ভিদ, প্রাণী, উদ্ভিদজাত ও প্রাণিজাত দ্রব্য, অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান (কিছু অজৈব রসায়নসহ), ধর্মীয় শে­াক, সাংস্কৃতিক অনুশীলন এবং দৈহিক অত্যাচারসহ ভৌতিক কৌশল প্রদর্শন। যেহেতু এই পদ্ধতি প্রায় অপরিবর্তিতভাবে বহু যুগ ব্যাপী বিভিন্ন ধরনের রোগ ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়ে আসছে সে কারণে এই পদ্ধতিকে সনাতন চিকিৎসা বলা হয়। লৌকিক রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক অভ্যাস, সামাজিক আচরণ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র প্রদানকারী বা চিকিৎসা গ্রহণকারীর অন্ধবিশ্বাস, সনাতন ঔষধের ধরন, তৈরি পদ্ধতি ও ব্যবহারকে বেশির ভাগ সময় ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।

শুধু প্রাকৃতিক উৎসজাত চিকিৎসা উপাদানসমূহ নয়, জাদু, কৌতুক, মন্ত্রপাঠ, ধর্মীয় পদ্য, মন্ত্রপূত কবচ, লৌকিক রীতিনীতি এবং এমনকি ভৌতিক ও মানসিক অত্যাচারও সনাতন চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত। এসব কারণে বর্তমানে প্রয়োগকৃত সনাতন চিকিৎসার ধরনের সঙ্গে উঁচুমানের সংগঠিত ও দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত চীনা, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতি থেকে বিভিন্ন রকমের লোকচিকিৎসা ব্যবস্থা যেমন, ভৈষজ্যবাদ, অধ্যাত্মবাদ ও ধর্মীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা ভিন্ন হতে দেখা যায়। কারণ, এই চিকিৎসার উদ্ভব হয়েছিল সুদূর অতীতে এবং বর্তমানে অধিকাংশ চিকিৎসা পুরনোকালের সেই ঐতিহ্য বজায় রেখে প্রায় একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সনাতন চিকিৎসার মূল নীতি হলো, এখানে ব্যক্তির স্বতন্ত্র অঙ্গসমূহের চিকিৎসার চেয়ে তার সামগ্রিক চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ব্যক্তির আবেগের জগৎ ও ভৌতিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে তার রোগের বিষয় বিবেচনা করা হয়।

উপরে উলে­খ করা হয়েছে যে, সনাতন চিকিৎসায় ও ঔষধ তৈরিতে পার্থিব ও অপার্থিব উভয় প্রকার উপাদানই ব্যবহূত হয়। পার্থিব উপাদানের মধ্যে উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ ও সেসব থেকে উৎপাদিত দ্রব্য অবশ্যই থাকে। সেসঙ্গে প্রাণীর অঙ্গ, খনিজ পদার্থ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানও থাকে। অর্পাথিব উপাদানের মধ্যে উলে­খযোগ্য ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঔষধ, শারীরিক নির্যাতন, কৌতুক, জাদু, মন্ত্রপাঠ, ধর্মীয় শে­াক, কবচ, বিদেহী মন্দ আত্মার জন্য শান্তি স্বস্ত্যয়নমূলক অনুষ্ঠান পালন ইত্যাদি।

সনাতন চিকিৎসায় প্রধানত ভৌতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিতে রোগ শনাক্ত করা হয়, যেমন রোগীকে সরাসরি প্রশ্ন করার মাধ্যমে; রোগ সম্পর্কে রোগীর বর্ণনা থেকে; রোগীর অঙ্গভঙ্গি, শ্বসন বা দেহের তাপমাত্রা বা খাওয়ার অভ্যাসের কোন পরিবর্তন বা সামাজিক আচরণে সার্বিকভাবে কোন অস্বাভাবিকতা পর্যবেক্ষণ করে; রোগীর অতীত জীবন ও তার পরিবারের রোগের ইতিহাস অনুসন্ধান করে; রোগীর চোখ, ত্বক, মূত্র, মল ও বমির ধরন পরীক্ষার মাধ্যমে; আত্মা বা অতিপ্রাকৃতিক প্রাণীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে; জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক চিহ্ন ও মন পরিবর্তক ভেষজ ব্যবহার করে; এবং রোগীর পুনঃপুন দেখা স্বপ্ন বিশে­ষণ করে। আভ্যন্তরিক ও বাহ্যিক ওষুধ প্রয়োগ, দেহের বিভিন্ন অঙ্গের কৌশল প্রদর্শন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন, এমনকি ছোটখাট শল্যচিকিৎসা দ্বারাও সনাতন রোগ চিকিৎসা পরিচালিত হয়।

সনাতন ওষুধ তৈরিতে সচরাচর বহু উপাদান ব্যবহূত হয়, যা নানা মাত্রায় ও আকারে থাকে, যেমন- তরল (ক্বাথ, নির্যাস ও আরক), অর্ধ-তরল (ক্রিম ও মলম), কঠিন (পুরো উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের চূর্ণীকৃত গুঁড়া, বড়ি ও টেবলেট) ও গ্যাস (ধুনা, ধূমক ও শ্বসক)। উৎপাদিত বেশির ভাগ ওষুধ মুখে খাওয়ানো হয় অথবা দেহের বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে লাগানো হয়। বিশেষ উদ্দেশ্যে কতকগুলি ঔষধকে অভ্যন্তরীণভাবে পায়ুপথে বা যোনিপথে অথবা দেহের কোন অংশ কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে এর ভিতরে, বা নাক ও মুখ দিয়ে ধোঁয়া আকারেও প্রয়োগ করা হয়। সনাতন চিকিৎসায় অবশ্য শরীরে ধমনির মাধ্যমে ইনজেকশন করে ওষুধ ঢোকানো হয় না। এই চিকিৎসায় শুধু ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যম ছাড়াও চিকিৎসার লক্ষ্যে উপবাস থাকা, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করা, পানি চিকিৎসা (গোসল, শরীর মর্দন, ঠান্ডা ও গরম পানিতে গা মোছা), পোড়ানো, রক্ত মোক্ষণ, মেরুদন্ড পেষণ, শরীর মর্দন, মনশ্চিকিৎসাদান ও আধ্যাত্মিকভাবে বা বিশ্বাস আরোপ করে রোগ নিরাময় করাসহ তাপ-চিকিৎসা ইত্যাদি মাধ্যমও ব্যবহূত হতে দেখা যায়।

বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু উন্নয়নশীল দেশে এখনও সনাতন চিকিৎসার সাবেক পদ্ধতি, বিশেষ করে ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও লৌকিক পদ্ধতি ব্যবহূত হচ্ছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক ঔষধ বা বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে এসবের সরকারি স্বীকৃতি নেই। তবে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি বর্তমানে আধুনিক ধরনের সনাতন ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে এবং কয়েক বছরের মধ্যে এসবের ব্যাপক আধুনিকীকরণ সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতির পাশাপাশি বিকল্প ও সম্পূরক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসা পদ্ধতিতে চিকিৎসা চলছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ঔষধের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশীয় ও আধুনিক ভেষজবিদ্যাগত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক উভয় চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য ঔষধ তৈরি হচ্ছে। উৎপাদিত ঔষধ মোটা ও মিহি গুঁড়া, বিভিন্ন আকারের বড়ি, টেবলেট, তরল, অর্ধ-তরল এবং ক্রিম ও মলমের অনুরূপ উপযুক্ত প্যাকেট, এ্যালুমিনিয়াম অয়েল, প­াস্টিকের পাত্র বা ধাতব পাত্র ও কাচের বোতলে ভর্তি করে পরিপাটিভাবে মোড়কজাত করে বিপণন করা হয়। ঔষধের পাত্রের গায়ের লেবেলে ঔষধ ব্যবহার ও সংরক্ষণের নির্দেশাবলি এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ঔষধ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তার নির্দেশনা মুদ্রিত থাকে।

আয়ুর্বেদিক গুঁড়া, অর্ধ-তরল, ক্বাথ, নির্যাস ও শোধক তরল আকারে প্রধানত উদ্ভিজ্জ উপাদানসমূহ দিয়েই আয়ুর্বেদীয় ঔষধ তৈরি করা হয়। এগুলির মধ্যে অনেক ঔষধ অজৈব রাসায়নিক উপাদান, খনিজ পদার্থ ও প্রাণিজাত উপাদান থাকে। অ্যালকোহলে সংরক্ষিত ভেষজ উপাদানের নির্যাস, দ্রবণ, আরক ইত্যাদিও কখনও কখনও আয়ুর্বেদীয় ঔষধে ব্যবহূত হয়।

ইউনানি উদ্ভিদ বা উদ্ভিদের গুঁড়া, পেস্ট বা উদ্ভিদের উৎপাদিত দ্রব্য ও সেসবের নির্যাস, ক্বাথ ইত্যাদি ইউনানি ঔষধের প্রধান উপাদান। খনিজ পদার্থ, অজৈব রাসায়নিক উপাদান ও প্রাণিজাত দ্রব্যও ইউনানি ওষুধ তৈরিতে অনেক সময় ব্যবহূত হয়। অবশ্য ইউনানি ঔষধে অ্যালকোহল দ্বারা তৈরি কোন উপাদান ব্যবহার করা হয় না।

বাংলাদেশে প্রায় দু’ডজন নিবন্ধিত ভেষজ ফার্মাসিউটিকালস বা ভেষজ ঔষধ তৈরির প্রতিষ্ঠান আছে। সেগুলির মধ্যে চারটি বড় প্রতিষ্ঠান (সাধনা, শক্তি, কুন্ডেশ্বরী, হামদর্দ) বর্তমানে সনাতন পদ্ধতি চিকিৎসার জন্য শতকরা ৮০ ভাগের বেশি ভেষজ ঔষধ উৎপাদন করে। দেশের প্রায় সব বাজারেই কম পক্ষে একটি সনাতন চিকিৎসার ঔষধের দোকান রয়েছে। বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক বোর্ড সনাতন ঔষধ তৈরি ও বিপণন নিয়ন্ত্রণ করে।

বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি উভয় ধরনের সনাতন চিকিৎসা পরিষেবার দৃঢ় ভিত্তি রয়েছে। এ চিকিৎসা পদ্ধতি চিকিৎসা সেবায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা স্তরে। আনুমানিক শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ এখনও তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সনাতন চিকিৎসার সাহায্য নিচ্ছে।  [আবদুল গনি এবং মোস্তফা কামাল পাশা]

আরও দেখুন আয়ুর্বেদিক ঔষধ; স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা; হামদর্দ