মহাস্থবির, বিশুদ্ধাচার


মহাস্থবির, বিশুদ্ধাচার (১৮৯৩-১৯৮৯)  বৌদ্ধ ভিক্ষু, পন্ডিত। থেরবাদী বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসারে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। ১৩০০ বঙ্গাব্দের (১৮৯৩) শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার ঢেমশা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাল্যনাম ছিল পূর্ণচন্দ্র, কিন্তু বিশুদ্ধাচার নামেই তিনি সমধিক পরিচিত। গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়; পরে তিনি পালি টোলে ধর্ম, বিনয় ও  পালি ভাষা অধ্যয়ন করেন। এর পাশাপাশি তিনি সাধারণ শিক্ষাও গ্রহণ করেন এবং মধ্যবাংলা বা ছাত্রবৃত্তি পাঠ কৃতিত্বের সঙ্গে সমাপ্ত করেন।।

১৯৩০ সালে বিশুদ্ধাচার  উপসম্পদা লাভ করেন। ভিক্ষুজীবন লাভের পূর্বে তিনি দীর্ঘকাল ব্রহ্মদেশের (বর্তমান মায়ানমার) আকিয়াবে ব্যবসায়িক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে তিনি ব্রহ্মীভাষা শেখেন। ব্রহ্মীভাষায় তাঁর এই জ্ঞান পরবর্তীকালে  ত্রিপিটক অধ্যয়ন, পালি ভাষা ও বৌদ্ধধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। বৌদ্ধ দর্শনশাস্ত্রের ওপর তাঁর সারগর্ভ ভাষণ ও পান্ডিত্যপূর্ণ লেখা সুধীসমাজে সমাদৃত হয়েছিল। পন্ডিত সমাজে তিনি বাগ্মিপ্রবর, পন্ডিত ও দার্শনিক নামে পরিচিত ছিলেন। বিদর্শন সাধনার ক্ষেত্রে তিনি বার্মার লেডী ছেয়াদসহ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বহু পন্ডিতের সান্নিধ্য লাভ করেন।

বিশুদ্ধাচার সাহিত্য-সাধনায়ও উৎসাহী ছিলেন। সীবলীব্রু কথা (গদ্যছন্দে, ১৯৫০), মার বিজয় (পদ্য-ছন্দে), পরমার্থ পরিচয় (প্রশ্নোত্তরে বৌদ্ধ দর্শনতত্ত্ব), অশোক চরিত (কাব্য) প্রভৃতি গ্রন্থ লিখে তিনি পন্ডিত সমাজে সমাদৃত হন। তিনি সিদ্ধার্থের জন্ম ও মহাভিনিষ্ক্রমণ শীর্ষক দুটি নাটকও রচনা করেন। এছাড়া তাঁর কয়েকটি অপ্রকাশিত পান্ডুলিপিও রয়েছে। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শন, সাহিত্য ও  জাতক কাহিনীভিত্তিক অনেক কবিগানও রচনা করেন। এছাড়া বৈদিক ধর্ম-দর্শন, জ্যোতিষ ও বৌদ্ধ সঙ্গীতশাস্ত্রে তাঁর প্রগাঢ় পান্ডিত্য ছিল। বৌদ্ধ দর্শনশাস্ত্রের জটিল তত্ত্বসমূহ তিনি সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। ১৯৫৪ সালে বার্মার রেঙ্গুনে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ বৌদ্ধসঙ্গীতিতে অংশগ্রহণ করে তিনি ত্রিপিটক পরিশোধন কাজে ব্যাপৃত ছিলেন।

বিশুদ্ধাচার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেন। নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে তিনি সাতকানিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তন্মধ্যে ঢেমশা প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি। এ কারণে তিনি ওই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ সকলেরই প্রিয়ভাজন ছিলেন। ধর্ম ও সমাজের উন্নয়নেও তিনি অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টায় সাতকানিয়া বৌদ্ধ সমিতি (১৯৪০), ঢেমশা পল্লীমঙ্গল সমিতি, ঢেমশা মহিলা সমিতি, তরুণ সংঘ, রোয়াংছড়ী ব্যবসায়ী সমিতি এবং ঢেমশা শাক্যমুনি বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাতকানিয়া বৌদ্ধ সমিতির মাধ্যমে বৃহত্তর সাতকানিয়া অঞ্চলের বৌদ্ধদের ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষাসহ সংস্কৃতি বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ‘প্রচার বোর্ড ও শিক্ষা ভান্ডার’ গঠন করেন। এর তহবিল গঠনের লক্ষ্যে তিনি নিজের রচিত গ্রন্থসমূহ থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ এবং গ্রন্থস্বত্ব উক্ত বোর্ডকে দান করেন। স্বল্পালাপী, ত্যাগী, নিরহঙ্কারী ও মানবতাবাদী এই পন্ডিত আজীবন আধ্যাত্মিক সাধনা, ধর্মচর্চা ও দার্শনিক ভাবনায় নিজকে নিয়োজিত রেখেছেন। ১৯৮৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঢেমশা শাক্যমুনি বিহারে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  [সুকোমল বড়ুয়া]