ত্রিপিটক


ত্রিপিটক বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এতে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের ধর্ম, দর্শন, বাণী ও উপদেশ লিপিবদ্ধ হয়েছে। ‘ত্রিপিটক’ শব্দের অর্থ তিনটি পেটিকা বা খন্ড। তিনটি খন্ডে বিভক্ত বলে এর নাম হয়েছে ত্রিপিটক। খন্ড তিনটি হচ্ছে: বিনয়পিটক, সুত্তপিটক ও অভিধম্মপিটক।

বিনয়পিটক ত্রিপিটকের প্রথম খন্ড। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিহারভিত্তিক নিয়ম-শৃঙ্খলার যে বিধিসমূহ বুদ্ধ প্রবর্তন করেছিলেন, সেগুলি বিনয়পিটকে সংগৃহীত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ভিক্ষুদের নৈতিক জীবনের উৎকর্ষ সাধন করা। বিনয়পিটকে পাঁচটি গ্রন্থ আছে: পারাজিকা, পাচিত্তিয়া, মহাবগ্গ, চুল্লবগ্গ ও পরিবার। পারাজিকায় আছে আট প্রকার বিনয়বিধি লঙ্ঘনের বিস্তারিত বর্ণনা। পাচিত্তিয়ায় আছে বিধিসমূহের প্রচলন ও প্রয়োগের ইতিবৃত্ত; এতে ভিক্ষুনীদের স্বতন্ত্র নিয়মাবলি সংক্রান্ত উপদেশও রয়েছে। পারাজিকাপ্রাপ্ত ভিক্ষু সংঘ থেকে বহিষ্কৃত হন, কিন্তু পাচিত্তিয় অপরাধের জন্য ভিক্ষুকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়। পারাজিকা ও পাচিত্তিয়ের সামগ্রিক নাম সুত্তবিভঙ্গ।

মহাবগ্গকে বৌদ্ধসংঘের উৎপত্তি ও বিকাশের গ্রন্থ বলা হয়। এতে  প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদার দীক্ষা, উপোসথবিধি, প্রবারণা অনুষ্ঠান,  বর্ষাবাস, খাদ্য, বাসস্থান, ঔষধপত্র, চীবর প্রভৃতির অনুষ্ঠান ও ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা আছে। চুল্লবগ্গে বৌদ্ধসংঘের অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের বিনয়বিধি লঙ্ঘনের শাস্তি ও ভিক্ষুনীদের জন্য স্বতন্ত্র বিনয়বিধি প্রয়োগের কথা আছে। মহাবগ্গ ও চুল্লবগ্গকে একত্রে বলা হয় খন্ধক। পরিবার হলো ভিক্ষুদের নৈতিক জীবনগঠনের নিয়মাবলির একটি সারগ্রন্থ। এর উদ্দেশ্য ভিক্ষুদের নিয়মাবলি সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া; নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে চলার পথ নির্দেশ করা এবং ঘটনা ও অবস্থানের প্রেক্ষাপটে তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া। এতে স্মৃতি ও মেধা বিকাশের একটি তালিকাও রয়েছে। বিনয়পিটক ত্রিপিটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; কারণ নৈতিক জীবন গঠন ছাড়া আধ্যাত্মিক জীবন সফল হয় না।

সুত্তপিটক  ত্রিপিটকের  দ্বিতীয় খন্ড। বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের যেসব ধর্মোপদেশ দিয়েছেন সেব উপদেশ সুত্ত (সূত্র) নামে অভিহিত। এসব সুত্তে ধর্মের মূলতত্ত্ব ও সেই তত্ত্বসমূহের বিশদ বিশ্লেষণ এবং নৈতিক উপদেশ বিধৃত হয়েছে। বৌদ্ধ-সাধনার তিন পর্যায়  শীলসমাধি ও প্রজ্ঞা সুত্তপিটকে ব্যাখ্যাত হয়েছে। চতুরার্যসত্য, প্রতীত্যসমুৎপাদ, কর্মবাদ, নির্বাণ প্রভৃতি বৌদ্ধদর্শনের মূলতত্ত্বের বিশদ আলোচনা ছাড়াও বুদ্ধকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর সুত্তপিটক আলোকপাত করে।

সুত্তপিটক পাঁচটি নিকায়ে বিভক্ত: দীঘনিকায়, মজ্ঝিমনিকায়, সংসুত্তনিকায়, অঙ্গুঁত্তরনিকায় ও খুদ্দকনিকায়। দীঘনিকায়ে ব্রহ্মজাল, সামঞ্ঞ ফল, মহাপরিনিববান প্রভৃতি চৌত্রিশটি সুত্ত আছে। সেগুলি তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য মূল্যবান। যেমন, ব্রহ্মজালসুত্তে বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তাধারার ও মহাপরিনিববানসুত্তে গৌতম বুদ্ধের শেষজীবনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। মজ্ঝিমনিকায় সুত্তের মাধ্যমে বৌদ্ধদার্শনিক তত্ত্বের বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংসুত্তনিকায়ে ২৮৮৯টি ছোট সুত্ত ৫৬টি সংসুত্তে বিভক্ত এবং বৌদ্ধধর্মের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক আলোচনায় পূর্ণ। অঙ্গুঁত্তরনিকায়ে বৌদ্ধনীতি ও দার্শনিক তথ্য সম্পর্কে ১৩০৮টি ছোট ছোট সুত্ত আছে। খুদ্দকনিকায় খুদ্দকপাঠ,  ধম্মপদ, উদান, ইতিবুত্তক, সুত্তনিপাত, বিমানবত্থু, পেতবত্থ, থের-থেরীগাথাজাতক, নিদ্দেস, পটিসম্ভিভদামগ্ন, অপদান, বুদ্ধবংস, চরিয়াপিটক প্রভৃতি গ্রন্থের সংকলন মাত্র।

অভিধম্মপিটক  ত্রিপিটকের  তৃতীয় খন্ড। অভিধম্ম (অভিধর্ম) নামকরণের তাৎপর্য এবং সুত্তপিটকে বুদ্ধের যে ধর্মতত্ত্বকে সাধারণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা এতে বিশেষভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। সুত্তপিটকে আলোচিত ধর্মের উচ্চতর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপই অভিধম্ম। অভিধম্মপিটকের অন্তর্ভুক্ত সাতটি গ্রন্থের মধ্যে প্রথম ধম্মসঙ্গণিতে মানসিক ও বাহ্য বিষয়সমূহ সংগৃহীত হয়েছে। ধম্মসঙ্গণির আলোচ্য বিষয় তিনভাগে বিভক্ত: চিত্ত বা চৈতসিক, রূপ ও সংক্ষিপ্তসার। দ্বিতীয় গ্রন্থ বিভঙ্গের স্কন্ধ, আয়তন, ইন্দ্রিয় ইত্যাদি বিষয় সংশ্লেষণ পদ্ধতিতে আলোচিত হয়েছে। তৃতীয় গ্রন্থ ধাতুকথায় ধম্মসঙ্গণি ও বিভঙ্গের স্কন্ধ, আয়তন ও ধাতু বিষয়ক আলোচনা রয়েছে। চতুর্থ গ্রন্থ পুগ্গলপুঞ্ঞত্তিকে ব্যক্তিবিশেষের স্বরূপ বোঝাবার জন্য স্রোতাপন্ন, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রন্থ কথাবস্ত্ততে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মিথ্যাদৃষ্টি ও বিরুদ্ধবাদ খন্ডন ও থেরবাদের প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ষষ্ঠ গ্রন্থ যমকে খন্ধযমক, ধাতুযমক ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সপ্তম গ্রন্থ পট্ঠানে চবিবশ প্রকার প্রত্যয়ের কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়েছে। [বিনয়েন্দ্র চৌধুরী এবং সুমঙ্গল বড়ুয়া]