শীল


শীল  বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের পালনীয় আচরণ। এর অর্থ অনুশীলন বা সমাধান। সাধারণভাবে শীল শব্দের অর্থ চরিত্র। যেসব নিয়ম পালন করলে চরিত্র শুদ্ধ ও দৃঢ় হয় তাকেই বলে শীল। বৌদ্ধমতানুসারে যে অষ্টাঙ্গিক মার্গ মানুষকে নির্বাণের দিকে নিয়ে যায়, সেগুলির মধ্যে সম্যক্ বাক্, কর্ম ও জীবিকা এই তিনটিকেও শীল বলে। প্রকৃতপক্ষে প্রাণিহত্যা, মিথ্যাভাষণ ও হিংসা থেকে বিরতি এবং ব্রহ্মচর্য পালন, সত্যভাষণ, পবিত্র জীবনযাপন ইত্যাদি সদাচার হলো শীল। কায়িক, মানসিক ও বাচিক কর্মে সংযম ও শৃঙ্খলা আনয়ন এবং মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধনই এর মূল লক্ষ্য। শীল সকল কুশলকর্মের আধারস্বরূপ এবং এর ফলে মুক্তিলাভের পথ প্রশস্ত হয়। শুধু বৌদ্ধধর্মে নয়, প্রত্যেক ধর্মেই শীল বা সুনীতির প্রশংসা করা হয়েছে।

শীলসমূহকে সাধারণভাবে দুভাগে ভাগ করা হয় পঞ্চশীল ও অষ্টশীল। পঞ্চশীল হচ্ছে বৌদ্ধশাস্ত্রের পঞ্চ নৈতিক বিধান। বুদ্ধদেব নৈতিক চরিত্র গঠনের উদ্দেশ্যে সাধারণ গৃহস্থ বা উপাসক-উপাসিকাদের নিত্য প্রতিপাল্য পাঁচটি শীল বা শিষ্টাচারের বিধান প্রবর্তন করেন। এগুলিই পঞ্চশীল নামে অভিহিত। এতে পাঁচ প্রকার কর্মের নিষেধ করা হয়েছে। সেগুলি হলো: প্রাণিহত্যা, চৌর্যবৃত্তি, ব্যভিচার, মিথ্যাভাষণ ও নেশাদ্রব্যসেবন থেকে বিরতি। এ পঞ্চকর্ম নিজে করা কিংবা অন্যকে দিয়ে করানো যা-ই হোক দূষণীয়। এগুলি থেকে বিরত থাকার মধ্যেই পঞ্চশীলের মর্মার্থ নিহিত। পঞ্চশীল পরস্পর ভিন্ন। প্রতিপালনের ক্ষেত্রে কোন শীলের ভঙ্গ হলেও অপরগুলি নিষ্ফল হয় না এবং একটি অপরটির প্রতিপালনে সদিচ্ছা জাগায়। বিধানানুযায়ী পঞ্চশীলের কোনটি ভঙ্গ হলে শীলপালনকারীর পাপফল এবং পুণ্যফল কর্মানুসারে গুরু-লঘু হয়।

কুমার যশের পিতা বারাণসীর শ্রেষ্ঠীকে বুদ্ধ সর্বপ্রথম পঞ্চশীল দান করেন। তাই উক্ত শ্রেষ্ঠী ছিলেন বুদ্ধমুখনিঃসৃত পঞ্চশীলের প্রথম গ্রহীতা। বৌদ্ধমাত্রই পঞ্চশীল গ্রহণ এবং দৈনন্দিন জীবনে শ্রদ্ধা সহকারে তা পালন করা বিধেয়। এগুলি বৌদ্ধ জীবনের মূলমন্ত্র। বুদ্ধদেব পঞ্চশীল প্রজ্ঞাপ্ত করলেও তিনি তা পালনে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেননি; পালন না করলে ধর্ম লুপ্ত হবে এমনও বলেন নি। তবে তিনি পালনে সুফল লাভ এবং পালনে অক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রতিফল ভোগের উল্লেখ করেছেন। বৌদ্ধ বিশ্বাস অনুসারে পঞ্চশীল অনুশীলনে নৈতিক চরিত্র গঠন ছাড়াও ভবিষ্যৎ কুশল-সম্ভাবনা বর্ধিত হয়।

অষ্টশীল হলো বৌদ্ধ গৃহিভক্ত এবং উপাসক-উপাসিকাদের পূর্ণিমা, অমাবস্যা ইত্যাদি পর্বদিনে পালনীয় আটটি শীল। সেগুলি হলো  প্রাণিহত্যা, চৌর্য, ব্যভিচার, মিথ্যাভাষণ, সুরা ও মাদকদ্রব্য সেবন, বৈকালিক ভোজন, নৃত্যগীত উৎসবাদি দর্শন ও মাল্য সুগন্ধ দ্রব্যাদি দ্বারা অঙ্গলেপন এবং উচ্চ শয্যা বা মহাশয্যায় শয়ন থেকে বিরত থাকা।  [বিনয়েন্দ্র চৌধুরী]