ধাঁধা


ধাঁধা লোকসাহিত্যের একটি ও উল্লেখযোগ্য শাখা। একে হেঁয়ালিও বলা হয়। ধাঁধায় পল্লীর জনগণের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে প্রশ্নের আকারে লিপিবদ্ধ করা হয়। প্রতিটি ধাঁধার মাধ্যমে একটি করে প্রশ্ন করা হয় এবং সেই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার উত্তরটি। এমনিভাবে যে বাক্য দ্বারা একটিমাত্র ভাব রূপকের সাহায্যে জিজ্ঞাসার আকারে প্রকাশ করা হয় তাকেই বলা হয় ধাঁধা। প্রশ্ন এবং উত্তর উভয় মিলেই একটি ধাঁধার পূর্ণাঙ্গ পরিচয়।

ধাঁধার আবেদন মূলত বুদ্ধিগ্রাহ্য। ধাঁধা জ্ঞানেরও বিষয়, আবার রসেরও সামগ্রী। এর মধ্য দিয়ে উত্তরদাতার উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। আবার কাউকে নিছক চমকে দেওয়া বা তাক লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেও ধাঁধা রচিত হয়।

ধাঁধার মধ্যে একটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গি লক্ষ করা যায়। আবার কোনো কোনো ধাঁধায় পুরস্কারের আভাসও থাকে। ধাঁধার মধ্যে অনেক সময় অনাবশ্যক শব্দ ব্যবহূত হয় যা উত্তরদাতার মনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। ধাঁধার প্রধান গুণ সংক্ষিপ্ততা। গদ্য ও পদ্য উভয় ভাষাতেই ধাঁধা রচিত হতে পারে। ধাঁধা জনসাধারণের মনে জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে জানার কৌতূহল সৃষ্টি করে। ধাঁধার মধ্যে প্রখর বুদ্ধিবৃত্তি, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, মননশীলতা, কৌতুক, স্মৃতিচর্চা, রূপক-প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা, নির্মল আনন্দদান, সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।

ধাঁধাকে দুভাগে ভাগ করা যায় সাহিত্যাশ্রয়ী এবং লৌকিক। লৌকিক ধাঁধার মধ্যে যে বিষয়টি সহজ কথায় সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করা হয়, সাহিত্যিক ধাঁধায় তাই বিচিত্র রূপ ও অলঙ্কারের সাহায্যে ব্যক্ত করা হয়। সাহিত্যিক ধাঁধার ব্যবহার বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে। বাংলা সাহিত্যে  চর্যাপদচন্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও শিবমঙ্গল কাব্যে এবং নাথসাহিত্যে  গোপীচন্দ্রের গানগোরক্ষবিজয়বাউল গান ও কবিগানে বহু সাহিত্যিক ধাঁধার সন্ধান পাওয়া যায়।

লৌকিক ধাঁধাকে বিষয়বস্ত্ত অনুসারে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়: ১. নরনারী ও দেবদেবী-বিষয়ক, যথা ক. মানুষ ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংক্রান্ত, খ. ইতিহাস প্রসিদ্ধ নারী-পুরুষ সংক্রান্ত, গ. পৌরাণিক চরিত্র সংক্রান্ত, ঘ. দেবদেবী সংক্রান্ত; ২. প্রকৃতি-বিষয়ক, যথা ক. উদ্ভিদ ও লতাপাতা সংক্রান্ত, খ. আকাশ-গ্রহ-নক্ষত্র ও প্রকৃতি সংক্রান্ত; ৩. গার্হস্থ্য জীবনবিষয়ক, যথা ক. আত্মীয় ও অনাত্মীয় সম্পর্কীয় সংক্রান্ত, খ. খাদ্যবস্ত্ত সংক্রান্ত, গ. দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহূত জিনিসপত্র সংক্রান্ত, ঘ. আচার-আচরণ-অভ্যাস সংক্রান্ত, ঙ. আচার-অনুষ্ঠান-ক্রিয়াকর্ম সংক্রান্ত; ৪. পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ-বিষয়ক; ৫.  বাদ্যযন্ত্র সংক্রান্ত; ৬. আখ্যান বা কাহিনীমূলক; ৭. গাণিতিক বা সংখ্যামূলক এবং ৮. বিবিধ-বিষয়ক।

লোকসাহিত্যে ধাঁধা অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। বাংলার বৃহত্তর সমাজজীবনে ধাঁধার ব্যবহার দেখা যায়। বিবাহবাসরে, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে, গ্রাম্য মজলিশে এবং আমোদ-প্রমোদের উপকরণ হিসেবে ধাঁধার প্রচলন বহু প্রাচীন। ধাঁধা সবার কাছেই সমান কৌতূহলজনক ও আনন্দের বিষয়। শিশুদের জনপ্রিয় দুটি ধাঁধা হলো: ‘একটু খানি গাছে/ রাঙা বউটি নাচে’ লাল মরিচ এবং ‘বন থেকে এলো টিয়ে/ লাল টোপর মাথায় দিয়ে’ আনারস। এ দুটি ধাঁধায় একদিকে যেমন সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধ প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে তেমনি উপস্থিতবুদ্ধি ও স্মৃতিচর্চার পরিচয়ও পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন শিশুপত্রিকা, কিশোর মজলিশ এবং রেডিও-টেলিভিশনের ধাঁধার আসরগুলি ছোটদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। গ্রামের বয়স্ক ব্যক্তিরাও সন্ধ্যার অবসরে ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ধাঁধার চর্চা করেন। তাই ধাঁধার আবেদন বয়সনির্বিশেষ ও চিরন্তন।  [শীলা বসাক]

আরও দেখুন লোকসাহিত্য।