তেওতা জমিদার পরিবার


তেওতা জমিদার পরিবার  মানিকগঞ্জ জেলার ভূমির সর্ববৃহৎ অংশের স্বত্ত্বাধিকারী জমিদার। পশ্চিম মানিকগঞ্জের তেওতার ষাট-ঘরের অন্যতম দেশগুপ্ত পরিবারের পঞ্চানন চৌধুরী (জন্ম ১৭৪০) এই জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। শংকরগণ ছিলেন (পরিবারের মধ্যবর্তী নাম) প্রগতিশীল, সংস্কারমুক্ত এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী জমিদার। এই পরিবারের সদস্যগণ জনসাধারণের কল্যানে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।

তেওতা জমিদারির আওতাভুক্ত ছিল ঢাকা, ফরিদপুর, পাবনা এবং দিনাজপুরসহ রংপুর ও বর্ধমানের কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। ১৯১৪ সালে এই পরিবারের শুধুমাত্র দিনাজপুরের সম্পত্তির মূল্য ১১ লাখ টাকারও অধিক ছিল। এই এস্টেট এর ব্যবস্থাপনা দক্ষ ও শিক্ষিত কর্মচারী কর্তৃক পরিচালিত হতো এবং সরকারের রাজস্ব খাতে ৬০ হাজারেরও বেশি টাকার কর প্রদান করত। কার্যত, এস্টেট-এর কর্মচারীদের প্রতি মালিকপক্ষ যথেষ্ট উদার ছিলেন এবং তাদেরকে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ ও চিকিৎসাভাতা ছাড়াও মহার্ঘ্য ভাতা প্রদান করা হতো। এস্টেট-এর প্রধান দফতর বা ম্যানেজার-এর দফতর ছিল তেওতায় এবং সম্পূর্ণ এস্টেট কয়েকটি সার্কেল-এ বিভক্ত করে প্রত্যেক সার্কেল-এর সঙ্গে কয়েকটি করে ‘কাচারী’ (স্থানীয় অফিস) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তেওতার জমিদারি প্রায় দের’শ বছর অবিভক্তই ছিল। কিন্তু ১৯২০ সালের মধ্যে এই জমিদারি আট আনা ‘তেওতা জয়শংকর এস্টেট’-এ এবং অন্যান্য কয়েকটি ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন-১৯৫০ এর অধীনে জমিদারি ব্যবস্থা বাজেয়াপ্ত হওয়ায় তেওতার সকল এস্টেট সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করে নেয়ার মাধ্যমে এই জমিদারির অবসান হয়।

পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা পঞ্চানন চৌধুরী দিনাজপুরে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি তামাক ব্যবসায় প্রথম অর্থলগ্নি করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করেন। ব্যবসায়ের মুনাফা অর্জনের এই সাফল্যে এবং  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর পরে তিনি জমি ক্রয়ে অর্থলগ্নি করতে উৎসাহিত হন। তিনি দিনাজপুর অঞ্চলে তাঁর পূর্বের সম্পত্তি যা ছিল তার সব অধিগ্রহণ করে নেন এবং কিছুদিন পরে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের গ্রাম তেওতায় ফিরে আসেন এবং নিজেকে তেওতার প্রথম জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পঞ্চানন চৌধুরী নিজে ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী এবং তাঁর সময়ে তাঁদের পারিবারিক গুরু হিসেবে ‘শ্রীধর’-এর আগমন ঘটলে তিনিই প্রথম তাঁর ‘সেবায়াৎ’ হয়েছিলেন। তিনি তিরানববই বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় নিজের জমিদারিকে অন্যতম বৃহত্তম জমিদারি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছিলেন।

পঞ্চানন চৌধুরীর একমাত্র ছেলে কালি শংকর সম্পর্কে খুব সামান্যই জানা যায়। ঔরসজাত দুই ছেলে জয় শংকর ও তারিনী শংকরকে (জন্ম, ১৮০০-১৮১০-এর দশকে) রেখে তিনি মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে মারা যান। তবে তাঁর উভয় ছেলেই ঐতিহ্যবাহী অভিজাত (বাংলার নওয়াবী ঐতিহ্যে) পারিবারিক ব্যবস্থাপনায় লালিত হন। ছোট ছেলে তারিনী শংকরকে পড়াশুনার জন্য মুর্শিদাবাদে পাঠানো হয়েছিল। তারিনী শংকরেরও মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তিনি, শ্যামা শংকর (পরবর্তীতে তিনি তেওতার ‘রাজা শ্যামাশংকর রায় বাহাদুর’ হিসেবে প্রসিদ্ধ হন) এবং প্রাণ শংকর নামে দুই ছেলে রেখে যান।

জয় শংকর ছিলেন একজন প্রাজ্ঞ জমিদার এবং তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পৈত্রিক সম্পত্তির সম্প্রসারণ করেন। পিতামহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘অতিথিশালা’র রক্ষণাবেক্ষণসহ তিনি নিজে তেওতায় পুকুর খনন, রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতির মত  জনসেবামূলক কর্মকান্ডে জড়িত হন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তাঁর দুই নাবালক শিশু পুত্রদের (পার্বতী শংকর এবং হারা শংকর) তাদের মা ও ঠাকুরমার তত্ত্বাবধানে রেখে নিজ পরিবার এবং পৃথিবীর যাবতীয় কর্মকান্ড ত্যাগ করে বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবীয় রীতি পালনের সর্বোৎকৃষ্ট স্থান পুরীতে চলে যেতে মনস্থির করেন। অল্প কিছুদিন পরে ১৮৬০ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে বাবার স্মরণে বিহারের গয়াতে একটি ধর্মশালা নির্মাণ করেন এবং পুরীতে বাবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের স্থানে একটি  মঠ নির্মাণের জন্য তার প্রাথমিক আয়োজন সম্পন্ন করেন।

তেওতার জমিদার পরিবারের পরবর্তী বংশধরদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে বসবাসের উদ্দেশ্যে শহরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হন। উনিশ শতকের বিশ-এর দশকে কলকাতার পাথুরীয়া এলাকার ৫০, ধর্মহাট্টা স্ট্রিটে (বর্তমান নাম মহর্ষি দেবেন্দ্র রোড) পরিবারের সদস্যদে প্রথম নতুন ঠিকানা হলেও, ষাট এর দশক পর্যন্ত কেবলমাত্র পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই শহরে বাস করতেন। উনিশ শতকের নববই-এর দশকের দিকে ৪৪, ইউরোপীয় এসাইলাম লেনে নতুন সুরম্য ও বিশাল বাড়ি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত  পরিবারের নারী সদস্যরা গ্রামেই অবস্থান করছিলেন। এই ঠিকানাটি ছাড়া এই পরিবারের অন্যান্য স্থানেও বসতবাড়ি ছিল। বেনারসের তেওতা রাজবাড়িটি (মূলত বাড়ি ছিল দু’টি) বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস এবং সত্যজিৎ রায়ের তৈরি চলচ্চিত্র ‘অপরাজিতা’ এর মাধ্যমে অমর হয়ে আছে।

জমিদার পরিবারেরর চার ভাইয়ের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শ্যামাশংকর রায় ছিলেন প্রখ্যাত জনহিতৈষী, ঈশ্বরবাদী দার্শনিক ও একজন উদ্যোগী জমিদার, যিনি কৃষির উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি উনিশ শতকের সত্তর-এর দশকে নিজের নামের সঙ্গে ‘রাজা’ উপাধিটি সংযুক্ত করেছিলেন। রায় পার্বতীশংকর ও ছিলেন একজন কল্পণাশ্রয়ী জমিদার। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়াও তিনি তাঁর জমিদারি আওতার মধ্যে ‘সমবায় ভিত্তিক শস্য ব্যাংক’ (ধর্মগোলা) ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন এবং ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল এসোসিয়েশন-এর অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন। প্রেসিডেন্সি কলেজের স্নাতক এবং আইন বিষয়ে ডিগ্রিধারী হারা শংকর রায় ছিলেন তেওতা এস্টেট এর অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট। পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে অনেককেই প্রাথমিক ডিগ্রি নিতে এবং ব্যবহারজীবী পেশা গ্রহনের ট্রেনিং নিতে ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে যান। এঁদের মধ্যে একমাত্র ডা. কুমার শংকর রায় পরবর্তী জীবনে একজন পেশাজীবীর ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। ১৯৩০ এবং ৪০ এর দশকে ব্যারিস্টার (ব্যারিস্টারি অনুশীলন করতেন না) এবং জনসেবক কে এস রায় কংগ্রেসের নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছিলেন এবং নয়াদিল্লির কাউন্সিল অব স্টেট এ অন্যান্যদের সঙ্গে বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। রাজনীতিক কিরণ শংকর রায় এবং কুমুদ শংকর রায় (ডা. কে.এস. রায়), তেওতা জমিদার পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। দুজনের মধ্যে একজন স্বরাজ্য দাবির উত্থানকারী কংগ্রেস নেতা এবং আরেকজন চিকিৎসাশাস্ত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

পরিবারটির মূল অবস্থান ছিল যমুনার তীরবর্তী বিস্তৃত এলাকা তেওতায়। বিশাল উঠান সংলগ্ন সর্বপ্রাচীন দালানটির নির্মাণকাল উনিশ শতকের প্রথম ভাগ এবং সাম্প্রতিকতম দালানটি নির্মিত হয় বিশ শতকের সূচনাতেই। রাজবাড়ি সংলগ্ন দৃষ্টিনন্দন, সুউচ্চ নবরত্নটি পারিবারিক দেবতার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল এবং ‘দোল’ উৎসবের সময়ে এটির ব্যবহার হতো। উনিশ শতকের আশির দশকে প্রতিষ্ঠিত ‘তেওতা একাডেমী’ নামে খ্যাত উচ্চ/এন্ট্রান্স বিদ্যালয়টি বহুদিন যাবত মানিকগঞ্জ সাব ডিভিশনের (বর্তমানে জেলা) একমাত্র বিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল। বিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসন ব্যবস্থা এবং মেট্রিক এবং অন্যান্য পরীক্ষার সময়ে শংকরদের পরিবারের কলকাতাবাসী ছাত্রদের অবস্থানের জন্য ‘বাহির বাড়ি’ নামের একটি বোর্ডিংও বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ছিল। এ ছাড়াও এস্টেট কর্তৃক পরিচালিত এখানে একটি ‘পথশালা’ এবং একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও ছিল। খুব কম সংখ্যক জেলাতেই তেওতার মত একটি অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট এর পদ এবং একটি পৃথক বেঞ্চ এর অস্তিত্ব ছিল।

১৯৫৭ সাল থেকে এই বিস্তৃত জমিদারি বর্তমানে অযত্নে এবং পরিত্যাক্ত অবস্থায় টিকে আছে। যদিও প্রায় সম্পূর্ণ অংশই দখলদারীদের হাতে চলে গেছে। নির্মাণশৈলীর এবং কৌশলগত দিক থেকে তেওতার জমিদারদের অপূর্ব ভবনটিতে মুগল ও ইউরোপীয় স্থাপত্যের এক চমৎকার মিশ্রণ প্রতিফলিত হয়।  [আর. রায়]