রায়, কিরণ শংকর


কিরণ শংকর রায়

রায়, কিরণ শংকর (১৮৯১-১৯৪৯)  তেওতার রাজপরিবারের তরুণ সদস্য এবং হরিসচন্দ্র রায় চৌধুরীর পুত্র। কিরণ শংকরের প্রাথমিক শিক্ষা তেওতা একাডেমী থেকে শুরু হলেও তিনি কলকাতার হিন্দু স্কুল থেকে মাধ্যমিক এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার কলেজে ভর্তি হন কিন্তু পরবর্তীকালে বঙ্গবাণী কলেজ থেকে আইএ (কলা বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করেন। এ সময়ের মধ্যেই কিশোর কিরণ রায় বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার জন্য তিনি ১৯০৯ সালের শেষভাগে ইংল্যান্ডে যান এবং ১৯১০ সালে অক্সফোর্ডের নিউ কলেজে ভর্তি হন। কিরণ রায় অক্সফোর্ডে ভারতীয় মজলিশের সদস্য হিসেবে সক্রিয় হন এবং এক বছর এ মজলিশের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৩ সালে উক্ত কলেজ থেকে ইতিহাস বিভাগে তিনি সম্মানসহ বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন।

ভারতের প্রত্যাবর্তনের পর কিরণ রায় বেশ কিছুদিন কলকাতার প্রেসিডেন্সি ও সংস্কৃত কলেজে শিক্ষাদান করেন। বেঙ্গল এডুকেশন সার্ভিসে কর্মরত অবস্থায় তিনি  রাওলাট অ্যাক্ট এর বিরুদ্ধে টাউন হলের এক সভায় জোরালো ও প্রতিবাদী বক্তব্য রাখেন। কর্তৃপক্ষ তাঁর এহেন আচরণের জন্য কারণ দর্শাও নোটিশ জারি করে। নোটিশের উত্তরে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দেন এবং লিংকনস ইন-এ অসমাপ্ত আইনী ট্রেনিং সম্পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে পুনরায় ইংল্যান্ডে গমন করেন। ১৯২১ সালে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে বার-এ যোগ দিলেও কখনো আইন চর্চা করেননি।

ইংল্যান্ড থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে রায় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং একই সময়ে ‘ন্যাশনাল কলেজ’ (কলিকা বিদ্যাপিঠ)-এর উপাধ্যক্ষ ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সুবাস বসু ছিলেন একই কলেজের অধ্যক্ষ। পরবর্তীকালে কিরণ শংকর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (সমসাময়িক গৌরীয় সর্ব বিদ্যায়তন নামে পরিচিত) নির্বাচিত হন। ১৯২১ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের ডাকে সুবাস বসুর সঙ্গে কিরণ শংকর অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। এ সময়ে সরকার বিরোধী নিবন্ধ লেখার দায়ে কিরণ চন্দ্রকে কারারুদ্ধ করা হয়।

চিত্তরঞ্জন দাসের অনুসারী হিসেবে কিরণ রায় ১৯২২ সালে গয়া কংগ্রেস গঠিত হলে তাঁর ও মোতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বাধীনে স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে তিনি স্বরাজ্য পার্টির সম্পাদক হন এবং পরপর দুইবার বেঙ্গল কাউন্সিলে নির্বাচিত হন।

১৯৩০-এর দশকে ভারতে আইন অমান্য আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে কলকাতায় একটি মিছিলে নেতৃত্বদান কালে সুবাস বসুর সঙ্গে কিরণ রায় দ্বিতীয়বারের মতো গ্রেফতার হন। প্রায় ত্রিশ বছরে বেঙ্গল কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সক্রিয় কিরণ শংকর ১৯২২ সাল থেকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি ও নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন এবং সংসদীয় ও অসংসদীয় কমিটির বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৫ সালের আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে কিরণ রায় বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের শেষপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস পার্টি ও বঙ্গীয় সভার বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে কাজ করেছেন।

দেশ বিভাগের পর (১৯৪৭) কিরণ রায় অল্পকালের জন্য পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের কংগ্রেস দলীয় নেতা এবং পাকিস্তান কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলী-এর বিপক্ষ দলের নেতার ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীকালে তিনি উভয় পরিষদ থেকে তাঁর সদস্যপদ প্রত্যাহার করেন এবং ৪ মার্চ ১৯৪৮ সালে ড. বি সি রায়-এর পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রীসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। এর অল্প পরেই ১৯৪৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৫৭ বছর বয়সে কিরণ রায়ের মৃত্যু হয়।

বিশ-এর দশকের মধ্যভাগের পর সি আর দাসের মৃত্যুর পর কিরণ শংকর রায় বাংলার জটিলতায় পূর্ণ, দলাদলিতে বিভক্ত কলকাতা কেন্দ্রিক কংগ্রেসের রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হন। চল্লিশের দশকের যুগসন্ধিক্ষণের অশান্ত সময়েও তাঁর ভূমিকা ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেসের যে কয়জন মুষ্টিমেয় নেতৃবৃন্দ শরৎচন্দ্র বোসের সঙ্গে বাংলা বিভাগের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। কংগ্রেসের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কিরণ রায় এবং বোস এর প্রকাশ্য সংলাপের শেষ পর্যায়ে একটি ‘সার্বভৌম ও যুক্ত বাংলা’ এবং একটি স্বাধীন, সমাজতান্ত্রিক বাংলা রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে হোসেন শহীদ সোহ্রওয়ার্দী ও আবুল হাসিমের সঙ্গে তাঁরা উভয়ে একমত হন। যদিও তাঁদের এই পরিকল্পনা কৃতকার্য হয়নি।

রাজনীতি ছাড়াও কিরণ রায় বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রমথ চৌধুরী পরিচালিত ‘সবুজপত্র’ এবং সুকুমার রায়ের ‘সোমবারের ক্লাব’-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তাঁর রচিত প্রবন্ধ ও ছোটগল্পসমূহ সবুজপত্র, প্রবাসী, আত্মশক্তি প্রভৃতিতে প্রকাশিত হলে পাঠকদের প্রসংশা অর্জনে ও একই সঙ্গে সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ‘সপ্তপর্ণা’ শিরোনামে তিনি তাঁর ছোটগল্প সমূহের সংকলন প্রকাশ করেন। [আর রায়]