ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশন, ১৮৯১


ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশন, ১৮৯১  বাংলায় স্বদেশী আন্দোলনএর ফল। প্রমথনাথ বসুর উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কারিগরি শিক্ষার প্রসারই জাতীয় শিল্পায়নের ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এ ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি বেশ কয়েকটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিল্প উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত একটি প্রচারপত্রে কারিগরি শিক্ষাকে ‘বিজ্ঞান-শিল্প’ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত বলে মত প্রকাশ করে বিভিন্ন শিল্পের টেক্সটাইল, ডাইং, ট্যানারি, চিনি-বিশোধন, সাবান, কাঁচ, খনিজশিল্প, ধাতব শিল্প ইত্যাদি একটি তালিকাও উল্লেখ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৮৯১ সালে ভারতে প্রথম বারের মতো শিল্পসংক্রান্ত একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে স্বয়ং প্রমথনাথ বসুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। প্রমথনাথ বসু হন সংগঠনের প্রথম অবৈতনিক সচিব।

আই.আই.এ-এর তিনটি মূল লক্ষ্য ছিল: (ক) কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ, (খ) ভারতীয় উৎপাদিত দ্রব্য ও সামগ্রী সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ এবং (গ) নতুন শিল্পোদ্যোগ চিহ্নিত করে সেগুলির প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। আই.আই.এ-এর সদস্যদের মধ্যে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী, জমিদার, সরকারি চাকুরিজীবী এবং কয়েকজন ইউরোপীয়ও ছিলেন। সংগঠনের প্রধান প্রধান সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রমথনাথ বসু, খ্যাতিমান ভূতত্ত্ববিদ এবং রমেশচন্দ্র দত্তের জামাতা, টিওতার (বর্তমান মানিকগঞ্জ) জমিদার পার্বতীশঙ্কর চৌধুরী এবং ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের কর্মকর্তা ও বাংলার দেশজ শিল্পসামগ্রী বিষয়ে কয়েকটি গ্রন্থের রচয়িতা ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৯৭ সালে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার স্যার আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক হন।

প্রচলিত স্বদেশী পণ্যের পাশাপাশি শিল্প ও কৃষি সহায়ক যন্ত্রপাতি সাধারণের কাছে পরিচিত করে তুলতে এবং কুটির শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করে সেগুলির মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো। প্রমথনাথ আলোচনা করতেন জ্বালানি শিল্প বিষয়ে এবং ত্রৈলোক্যনাথ আলোচনা করতেন কিছু নির্দিষ্ট উদ্ভিদ হতে তন্তু তৈরি করার সম্ভাব্যতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আই.আই.এ-এর সদস্যগণ বিভিন্ন কাঁচামাল নিয়ে নানা ধরনের সামগ্রী উৎপাদনের জন্য পরীক্ষা চালাতেন। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, পার্বতীচরণ তার জমিদারিতে ‘পিট’ (জ্বালানি কাজে ব্যবহার্য এক ধরনের বিশেষ উদ্ভিজ্জ পদার্থ) থেকে আলকাতরা এবং কালি তৈরির পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং অন্যান্যরাও এ ধরনের পরীক্ষা চালাতেন। স্বদেশী আন্দোলনের চরম মুহূর্তে ওই সময়ে মৌলিক গবেষণা ও আত্মনির্ভরশীলতার নীতির প্রতিই অধিক মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল।

স্বদেশী আন্দোলনের সময় সংগঠনটি নবোদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯০৯ সালে বসু ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাসোসিয়েশনের ভবিষ্যৎ কার্যাবলি সম্পর্কিত ‘নোট’ প্রকাশ করে তিনি পরামর্শ দেন যে, প্রতিবছর একটি সম্মেলন আহবান করা হবে যেখানে দেশীয় শিল্পের কল্যাণে যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ সকল শহরে শাখা প্রতিষ্ঠাসহ একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় সংস্থা গঠন করার জন্যও তিনি আহবান জানান, যার ফলে দেশীয় সামগ্রীর প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করবে।

১৮৯৩ সালে আই.আই.এ-এর উদ্যোগে প্রথম শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ প্রদর্শনীটি অনুষ্ঠিত হয় ১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে, এতে ৩৮০ জনের মতো প্রদর্শনকারী অংশগ্রহণ করে; তাদের মধ্যে ৭৬ জন স্বর্ণপদক লাভ করেন এবং অনেকেই প্রশংসা পত্র পান। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সংগঠনটির এ কার্যাবলির গুরুত্ব উপলব্ধি করে। ১৯০১ সালে কংগ্রেস কলকাতায় তাদের অধিবেশন উপলক্ষে একটি শিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যেহেতু প্রতিযোগিতামূলক কোনো প্রদর্শনী আয়োজন কাম্য নয়, তাই আই.আই.এ-এর কার্যসূচি থেকে প্রদর্শনীর বিষয়টিকে বাদ দেওয়া হয়। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ প্রদর্শনী ‘স্বদেশী’ আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছিল।

এছাড়াও দেশীয় পণ্য বিক্রয় করত এমন অনেক স্বদেশী দোকান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আই.আই.এ-এর ভূমিকা ছিল। এ ধরনের কিছু দোকান হচ্ছে: ইন্ডিয়ান স্টোরস্ লিমিটেড, লক্ষ্মীর ভান্ডার, দি ইউনাইটেড বেঙ্গল স্টোরস্ এবং দি ইউনাইটেড বেঙ্গল কোম্পানি। ১৯০৪ সালে সরকার বিদেশে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের জন্য বৃত্তি ঘোষণা করে।

আই.আই.এ বাংলার শিল্প আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছিল। সাত আটটি জয়েন্ট স্টক কোম্পানি চালু হয়েছিল। বসু পরবর্তী সময়ে লিখেছিলেন যে, ঐসময়ে এ ধরনের শিল্পোদ্যোগ শুরুর জন্য উপযুক্ত সময় ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ঐ সকল কোম্পানির মধ্যে দু-একটা ১৯০৬ সাল পর্যন্ত টিকেছিল। বিভিন্ন সংবাদপত্রে সংগঠনের বার্ষিক সভাসমূহের উল্লেখ পাওয়া গেলেও, বোঝা যায় যে, ১৯০৫ সালের মধ্যেই সংগঠনটি গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। পরবর্তী সময়ে এর ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কনফারেন্স।  [অমিত ভট্টাচার্য্য]