টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট


টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট  শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে টিচার্স ট্রেনিং-এর প্রথম সূচনা করেন সেন্ট জন ব্যাপটিস্ট ডি.লা স্যাল্লে। পরবর্তীকালে জার্মান প্রোটেস্টান্ট মন্ত্রী অগাস্ট হেরমান ফ্রান্চকের (১৬৬৩-১৭৭০) উদ্যোগে এবং সুইস রিফরমার যোহান পেস্তালজ্জির (১৭৪৬-১৮২৭) সক্রিয়তায় এটি ইউরোপে বিস্তার লাভ করে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ যোসেফ ল্যাঙ্কাস্টার এবং অ্যান্ড্রু বেল কর্তৃক প্রবর্তিত মনিটরিয়াল শিক্ষা পদ্ধতিও টিচার্স ট্রেনিং ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।

১৭১৬ সালে ডেনিশ উপনিবেশ স্থাপনকারীদের দ্বারা দক্ষিণ ভারতের ত্রিবাঙ্কুরে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নর্মাল স্কুল) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ উপমহাদেশে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ইতিহাস সূচিত হয়। পরবর্তী দশকে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে কে উপমহাদেশে শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করবে তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। ১৮৩৫-৩৮ সময়কালে বাংলা ও বিহারের শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উইলিয়াম অ্যাডাম তিনটি রিপোর্ট জমা দেন। তাঁর তৃতীয় রিপোর্টে উইলিয়াম অ্যাডাম শিক্ষকদের ভাল শিক্ষাদানে উৎসাহিত করার জন্য বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের পরামর্শ দেন। তিনি  নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, এ সকল নর্মাল স্কুলে শিক্ষকদের বছরে এক থেকে তিন মাস হিসেবে মোট চার বছর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা আবশ্যক। বিভিন্ন সময়ে প্রতিটি শিক্ষা কমিশন রিপোর্টেই শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং এ লক্ষ্যে অনেকগুলি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৮৫৮ সালে প্রকাশিত উড’স এডুকেশন ডেসপাচ শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয় যার ফলে নর্মাল স্কুল খোলা হয় ঢাকা (১৮৫৭), কুমিল্লা (১৮৬৯), রংপুরে (১৮৮২) এবং আসামের শিলচরে। ১৮৮৫ সালে কুমিল্লা নর্মাল স্কুল চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। ১৮৮২ সালে হান্টার কমিশন মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষকদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণের প্রস্তাব করে। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত স্যাডলার কমিশন রিপোর্ট মত প্রকাশ করে যে পেশাগত শিক্ষা ও গবেষণার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলির নেওয়া উচিত।

কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ.আর জেমস তাঁর রিপোর্টে (১৯০৯) উল্লেখ করেন যে, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের জন্য বাংলায় নর্মাল স্কুল এবং মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে কার্সিয়াঙে প্রারম্ভিক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাংলার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়গুলির শিক্ষক প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। উপমহাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রথম প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ১৯০৬ সালের জানুয়ারি মাসে মুম্বাইয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৯ সালে।

প্রাথমিক প্রশিক্ষণ স্কুল এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ দুই ধরনের প্রাথমিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫১ সালে। উক্ত বছর আরও চারটি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীকালে সেগুলি বিলুপ্ত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি সম্পর্কে সুপারিশ প্রণয়ন করার জন্য একটি কমিটি গঠন করে এবং ওই কমিটি ১৯৭৪ সালে রিপোর্ট পেশ করে। উক্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পর্যাপ্ত নয়। পরবর্তী পর্যায়ে গঠিত বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সময়কাল দশ মাস থেকে বাড়িয়ে দুই বছর নির্ধারণের সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে দেশে ৫৩টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, ১০টি মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কলেজ, একটি শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ কলেজ, একটি কারিগরি শিক্ষণবিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও ঢাকায় ১৫টি বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ রয়েছে। কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য বি.এড কর্মসূচি পরিচালনা করছে। কলেজগুলির মধ্যে ঢাকা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে তিন বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালু রয়েছে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে চার বছর মেয়াদি বি.এড (সম্মান) কোর্স চালু আছে। ২০০১ সালের আগে এ কোর্সের মেয়াদ ছিল তিন বছর।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বাংলাদেশ দূরশিক্ষণ ইনস্টিটিউট উন্মুক্ত ও  দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে ১৯৮৫ সাল থেকে ‘ব্যাচেলর অব এডুকেশন’ (বি.এড) প্রোগ্রাম চালু করেছে।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কর্মসূচির অধীনে বি.এড প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। ১৯৯২ সাল থেকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সি.এড, বি.এড এবং এম.এড প্রোগ্রাম উন্মুক্ত এবং দূরশিক্ষণ মাধ্যমে পরিচালনা করে আসছে।

বাংলাদেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলিকে শিক্ষার পর্যায় বিবেচনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান উন্নত করেছে। প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমীক প্রশাসনের অধীন। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর এবং বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়। এছাড়া বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় অনুরূপ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে। এ সকল ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষণকে প্রত্যক্ষ, উন্মুক্ত, দূরশিক্ষণ এ তিন পদ্ধতিতে ভাগ করা যায়। প্রত্যক্ষ পদ্ধতিতে ইনস্টিটিউটগুলি তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নিজেদেরই নিয়োগকৃত প্রশিক্ষক দিয়ে পরিচালনা করে। অপরদিকে, দূরশিক্ষণ ও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে মূল প্রশিক্ষকগণ বিভিন্ন গ্রুপ যেমন, শিক্ষা কার্যক্রম নির্ধারণকারী গ্রুপ, কোর্স লেখক গ্রুপ, পরীক্ষা কমিটি এবং গণমাধ্যমে (মিডিয়া) শিক্ষা প্রস্ত্ততি কমিটি ইত্যাদির মাধ্যমে কাজ করেন। আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধাসমূহের অভাবে মূল প্রশিক্ষকগণ কম ক্ষেত্রেই তাদের প্রশিক্ষণার্থীদের সামনে উপস্থিত হন। প্রশিক্ষণার্থীদের টিউটোরিয়াল সেশনসমূহে যোগ দিতে মাসে দুইবার নির্ধারিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হয়।

বর্তমানে জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসমূহের সঙ্গে সাধারণত এক অথবা দুটি নির্দিষ্টসংখ্যক স্কুলকে সংযুক্ত রাখা হয়েছে যাতে প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীরা সে সকল স্কুলে চর্চা করতে পারেন। আইইআর-এর মতো ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কয়েকটি প্রদর্শনী স্কুল যুক্ত রয়েছে যেখানে প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকগণ গিয়ে শিক্ষাদান এবং তাদের তত্ত্বাবধায়কগণ প্রশিক্ষণার্থীদের তৎপরতা মূল্যায়ন করতে পারেন।  [মনিরা হোসেন]