চীনা, জাতি


চীনা, জাতি  চীনা ব্যবসায়ী, বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং রাষ্ট্রদূতগণ ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন প্রাচীন কাল থেকেই। ফা-হিয়েন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম অগ্রজ। তবে পশ্চিমা শক্তির আগমন পর্যন্ত ভারতে চীনের কোনো অভিবাসনের সন্ধান পাওয়া যায় না। কালীকটের (Kozhikod) সিল্ক সড়ক, কুইলন-এ চীনাকট্টা (চীনা বাজার) এবং কিছু চীনা শব্দ যেমন, চীনা ভরনী, সোরাহী, চীনাচেট্টি (চীনা রান্নার পাত্র), চীনা বা চীনু (বড় নৌকা) ইত্যাদি ও চীনামাটির বাসন ছিল ভারতে চীনাদের উপস্থিতির নিদর্শন। এমনকি পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলিতে তাদের সাতটি এবং বাংলায় চারটি অভিযাত্রার ফলে চীনাদের কোনো স্থায়ী নিবাস গড়ে ওঠে নি।

তবে সাঙ্, ইয়ুয়ান এবং মিঙ্ বংশগুলির পতনের পর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বিপুল সংখ্যক চীনা বসতি গড়ে ওঠে। এ চীনাদের আশ্রয়ের সন্ধান এবং তাদের বসতি স্থাপন এখনও পরিপূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হয় নি।

বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা কলকাতা এবং উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানে রয়েছে। সংখ্যায় এরা প্রচুর না হলেও এ সকল অঞ্চলের বাস্তব জীবনে তাদের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

A Maritime Record নামক একটি চীনা লেখায় সংক্ষিপ্ত নোটিশ আকারে চীনা অভিবাসীদের কথা প্রথম উল্লেখ করা হয়। আঠারো শতকের শেষ দিকের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুসারে এটি ১৮২০ সালে প্রকাশিত হয়। এতে উল্লেখ আছে যে, চীনারা ফুজিয়ান (ফুকিয়েন) এবং গুয়াংডং (কেন্টন) নামক উপকূলীয় প্রদেশদ্বয় থেকে এসে কলকাতায় বসতি স্থাপন করে। তবে তারা কোন ধরনের ব্যবসার সাথে জড়িত ছিল তার উল্লেখ নেই। এটা অনুমান করা যায় যে, তারা অন্যান্য ব্যবসার পাশাপাশি আফিম তৈরী ও বিক্রয়ের কাজে নিয়োজিত ছিল। ১৭৮৮ সালের একটি পুলিশি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বৌবাজার স্ট্রিটের সন্নিকটে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা বাস করত। তারা সাধারণত ভদ্র ও পরিশ্রমী ছিল। কিন্তু কখনও কখনও তারা উত্তেজিত হয়ে পড়ত এবং একে অপরের সাথে মারপিটে লিপ্ত হতো। তারা মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিল বলে অনুমিত হয়।

১৮৩০ সালের দিকে লি ভ্যান ফুক (Li Van Phuc) নামক চীনা বংশোদ্ভূত এবং বাংলায় আগত একজন ভিয়েতনামি রাষ্ট্রদূত কলকাতায় অবস্থানকালে সেখানে বসবাসকারী চীনাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি চীনা বসবাসকারীর সংখ্যা কয়েকশ’ বলে উল্লেখ করেন। তবে ১৮৩৭ সালের পুলিশ পরিচালিত আদমশুমারিতে ৩৬২ জন চীনার উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্থানীয় চীনারা ছিল খুবই গরিব। তবে একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন যে, তারা গুয়ান য়ু-কে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দিরের অধিকারী ছিল। ২২০ থেকে ২৮০ খ্রি. পর্যন্ত সময়কালে যে তিনটি রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল গুয়ান য়ু সে আমলের একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। গুয়ান য়ু-র উপাসনা ব্যবসায়ীদের মাঝে বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। এটি এ ধারণার জন্ম দেয় যে, ফুজিয়ান এবং গুয়াংডং থেকে আগত চীনারা বৌদ্ধ ছিল না। সাধারণত তারা ‘হাক্কা’ নামে পরিচিত ছিল। হাক্কা সম্ভবত ফুকিয়েন (ফুজিয়ান) শব্দের বিকৃত রূপ। কেন্টনি শব্দ হাক্ কা, যার অর্থ বিদেশি, থেকেও শব্দটির উদ্ভব হয়ে থাকতে পারে।

মন্দিরটি ছিল চীনা ব্যবসায়ীদের মিলনকেন্দ্র। লি প্রায়ই এ মন্দিরে যেতেন এবং ভাষাগত পার্থক্যের কারণে লিখার মাধ্যমে স্থানীয় চীনাদের সাথে ভাব বিনিময় করতেন। গুয়ান য়ু-মন্দিরকে গুয়ানডি মন্দির অর্থাৎ দেবতার মন্দিরও বলা হতো। (‘ডি’ অর্থ দেবতা)। মন্দিরটি ছিল যুদ্ধের দেবতার নামে উৎসর্গীকৃত। সি. আলবস্টারের ১৮৪৯ সালের প্রতিবেদন অনুসারে মন্দিরটি কসাইতলা এবং ধর্মতলার পার্শ্ববর্তী কোনোও একটি গলির চীনা পল্লীতে অবস্থিত ছিল। আলবস্টারের মতে, কেন্টন থেকে আগত কলকাতার কাঠমিস্ত্রিদের আর একটি মন্দির ছিল এবং এটি সাগরের দেবী টিয়ানু-র (Tianhou) নামে উৎসর্গীকৃত ছিল। নাবিকগণ এ দেবীর উপাসনা করত এবং মন্দিরটি বৌবাজারে অবস্থিত ছিল।

ছুতার ও শূকরচর্বি প্রস্ত্ততকারী ছাড়া সেখানে মুচিও ছিল। আলবস্টার জানান যে, এসব চীনাদের অনেকে আফিম ও চরস তৈরীর মতো লোভনীয় পেশায় নিয়োজিত ছিল। ধর্মতলা ও কসাইতোলায় ছোট ছোট কালো বোর্ডে লেখা থাকত যে, তারা আফিম, গাঁজা ইত্যাদি নেশাজাতীয় দ্রব্য বিক্রির জন্য অনুমোদন প্রাপ্ত।

দক্ষিণ ভারত থেকে আগত একজন মালয়ী পর্যটক আহমদ রিজালুদ্দীন (১৮১০) চীনা বাজারের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, বিত্তবান বানিয়ারা সেখানে চীনের তৈরী স্বর্ণালঙ্কার, আয়না, সিল্ক, বাতি, লণ্ঠন, চায়ের পাত্র, থালা-বাসন, কাপ-পিরিচ ইত্যাদি বিক্রি করত।

চীনা অভিবাসন সম্ভবত পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে গড়ে ওঠেছিল। চীনে বিশৃঙ্খল ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবর্তে ভারতে ব্রিটিশ রাজধানী চীনাদের জীবনযাপনের নিরাপত্তা বিধান করেছিল। তদুপরি আফিম ও অন্যান্য মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারে পশ্চিমা শক্তির উৎসাহের ফলে দ্রুত অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র হিসেবে বাংলা তাদেরকে আকৃষ্ট করেছিল। চীনা ছুতারগণ পূর্ব থেকেই নৌকা নির্মাতা হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। তাদের পরে আসে চর্মকারগণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বেশ কয়েকটি চীনা চামড়া শিল্প গড়ে ওঠে। আফিমের যুদ্ধ (১৮৪০-১৮৫৬), তাইপিং তিয়াংগু অভ্যুত্থান (১৮৫০-১৮৬০), চীন-জাপান যুদ্ধ (১৮৯৪-১৮৯৫), বক্সার বিদ্রোহ (১৯০০-১৯০১) এবং চিং বংশের পতন আনয়নকারী ধারাবাহিক আন্দোলন ও বিদ্রোহের ফলে চীনারা দেশের বাইরে তাদের আশ্রয়ের সন্ধান করতে বাধ্য হয়েছিল। এক্ষেত্রে কলকাতা ছিল তাদের নিকটবর্তী নিরাপদ স্থান। ধারাবাহিক অভিবাসনের পরবর্তী একটি অংশে ছিল চীনা দন্ত চিকিৎসকরা। তারা সব বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তারা শ্রেণী হিসেবে ছিল প্রচুর সম্মানের অধিকারী এবং তাদের পেশাগত দক্ষতার জন্য তাদের কদরও ছিল যথেষ্ট।

বিভিন্ন আদমশুমারিতে দেখা যায় যে, ১৮৩০ সালে তাদের সংখ্যা ছিল ৩০০ আর ১৮৫০-এ তা দাঁড়ায় ৫০০-তে। এ সংখ্যা ধীর গতিতে বেড়ে ১৯৬১ সালে হয় ৭০০০। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের ফলে এতে ধস নামে। তবে বেসরকারি সূত্রে কলকাতায় চীনাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। এদের অধিকাংশই বাস করত টাংগ্রার চায়না টাউনে। কিছুসংখ্যক ছাড়া সকলে নিয়োজিত ছিল চামড়ার ব্যবসায়। তাদের ৫০০-র অধিক চামড়ার কারখানা ছিল। এ চামড়ার কারখানাগুলি ছিল নগর দূষণের অন্যতম কারণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদেরকে নতুন এবং উন্নততর জায়গা সোনারপুরের বড়াইডাঙ্গায় স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিয়েছে। এটি কলকাতা থেকে প্রায় ১৬ কিমি দূরে।

অন্যান্য বিদেশি সম্প্রদায়ের মতো চীনারাও সঙ্কীর্ণচিত্ত। আদি বসতি স্থাপনকারীরা সবাই ছিল পুরুষ। তাদের অনেকে ইউরেশিয়ান পরিবারে বিয়ে করে। পরবর্তীকালে তারা চীনের মূল ভূ-খন্ডে অথবা অন্য জায়গায় চীনা পরিবারে বিয়ে করে একসাথে পারিবারিক ব্যবসায় দেখাশুনার জন্য স্ত্রীসহ কলকাতায় ফিরে আসে। তবে ভারতীয় পরিবারে তাদের বিবাহের ঘটনা ছিল অত্যন্ত বিরল। চীনারা বাইরে থেকে তাদের ব্যবসার কাজে সহায়তা করার জন্য নিজেদের লোকবল নিয়ে আসত। অনেক সময় তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠার কাজে সহায়তা করত।

সময়ের সাথে সাথে বাংলায় চীনারা ধীরে ধীরে স্থানীয় জীবনযাত্রা ও ধর্মবিশ্বাসের সাথে একেবারে মিশে যেতে না পারলেও খুব কাছাকাছি চলে আসে। তারা নিজেদের (চান্দ্র) নববর্ষের অনুষ্ঠান উদযাপন ছাড়াও তাদের বাঙালি প্রতিবেশীদের দুর্গাপূজা, কালীপূজা,  ঈদ ও দীউয়ালি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে শুরু করেছিল। একজন চীনা ভক্ত কর্তৃক নির্মিত কলকাতার চায়না টাউনের বিখ্যাত চীনা কালীবাড়ি (মন্দির) সকল সম্প্রদায়ের প্রিয় প্রার্থনাস্থল।

বাংলায় চীনাদের উপস্থিতি শুধু কলকাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ঢাকার অর্থনৈতিক জীবনেও তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল, বিশেষ করে জুতা তৈরী ও আফিম ব্যবসার ক্ষেত্রে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তারা ঢাকায় চীনা রেস্তোরাঁ স্থাপন করে। ঢাকায় চীনা অভিবাসনও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধোত্তর ঘটনা। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তারা শহরের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বাস করত। জুতা প্রস্ত্ততকারীরা বাস করত ইমামগঞ্জের মিটফোর্ড এলাকায় এবং এ অঞ্চলের রাস্তায় তাদের অনেক সারিবদ্ধ দোকান ছিল। আজিমপুরের চায়না বিল্ডিং-এ বিভিন্ন পরিবার একসাথে বাস করত। এটি আমাদেরকে ঢাকায় তাদের অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। চট্টগ্রামেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চীনা ব্যবসা ও জুতা তৈরীর কাজে নিয়োজিত ছিল।

চীনা বসতিস্থাপনকারীদের মূল বৈশিষ্ট্য এ যে, তারা শহরে বাসস্থান গড়ে তুলেছিল। সেখানে তারা সহজে বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন যাপন করতে পারত। তারা গ্রামাঞ্চলে খুব কমই বসতি স্থাপন করেছিল।  [হরপ্রসাদ রায়]

গ্রন্থপঞ্জি  Alabaster, C, ‘The Chinese Colony in Calcutta’, Calcutta Review, 1849, (reprinted in, Pradip Chaudhuri and Abhijit Mukhopadhyaya (eds), Calcutta: People and Empire, Gleanings from Old Journal, Calcutta, 1975); Pradip Sinha, Calcutta in Urban History, Calcutta, 1978; The Census Reports of Bengal, up to 1991; Salmon Claudine, ‘Bengal as Reflected in two South-East Asian Travelogues from the Early Nineteenth Century’, in Om Prakash and Denys Lombard (eds), Commerce and Culture in the Bay of Bengal, 1500-1800, Manohar, Delhi, 1999.