ফা-হিয়েন


ফা-হিয়েন  প্রাচীন চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী। তিনি মধ্য এশিয়া, ভারত ও শ্রীলংকা ভ্রমণ করেন ও তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেন। ফা-হিয়েনের নামের সঠিক উচ্চারণ সম্ভবত ‘ফাজিয়ান’ বা ‘ফা-সিয়েন’। শানজি (শানসি)-র অধিবাসী ফা-হিয়েন মাত্র তিন বছর বয়সে বৌদ্ধ সংঘে যোগ দেন। নবব্রতিত্ব লাভ করার পরই ফা-হিয়েনের মনে বৌদ্ধ ধর্মের মঠতান্ত্রিক নীতি সম্বলিত গ্রন্থ ‘বিনয় পিটক’-এর সন্ধানে ভারতে আসার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখন ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন তখন তাঁর বয়স সম্ভবত ৬৪ বছর।

মধ্য এশিয়া ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে পরিভ্রমণ করে ফা-হিয়েন উত্তর ভারতে উপস্থিত হন। এরপর তিনি একে একে গঙ্গা উপত্যকায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিভিন্ন পবিত্র স্থান দর্শন করেন, যেমন বুদ্ধের জন্মভূমি কপিলাবস্ত্ত, বুদ্ধের দিব্যজ্ঞান প্রাপ্তির স্থান বুদ্ধগয়া; বুদ্ধের প্রথম ধর্মোপদেশ প্রদানের স্থান সারনাথ এবং নির্বাণ লাভের স্থান কুশীনগর। তিনি তাঁর ভ্রমণের অধিকাংশ সময়ই মধ্য ভারত বা মগধ পরিভ্রমণ অতিবাহিত করেন। ফা-হিয়েন দক্ষিণ ভারতের অঞ্চলসমূহ ভ্রমণ করেন নি। তিনি সমুদ্রপথেই ভারত ত্যাগ করে শ্রীলংকা পরিভ্রমণের পর চীনে প্রত্যাবর্তন করেন। ফা হিয়েনের বর্ণনাই ছিল দ্বীপটি সম্পর্কে কোন চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী কর্তৃক প্রদত্ত একমাত্র প্রত্যক্ষ বিবরণ।

চেংয়ান (তৎকালীন চৈনিক রাজধানী) থেকে মধ্য ভারতে পৌঁছতে ফা-হিয়েনের ছয় বছর সময় লেগেছিল এবং সেখানে তিনি ভ্রমণে ছয় বছর অতিবাহিত করেন এবং প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি তিন বৎসর সময় নিয়ে বর্তমান চীনের পূর্বউপকূলীয় প্রদেশ শানডং-এর চিংচৌ (Qingzho) এ পৌঁছেন।

ফা-হিয়েনের তীর্থযাত্রা চীনের পরবর্তী প্রজন্মের যাজকদের অনুপ্রাণিত করেছিল। চরমসত্য বা ধম্ম অনুসন্ধানে বুদ্ধের পবিত্র ভূমি পরিভ্রমণে জলপথ অথবা স্থলপথের সমস্ত কষ্টই তাঁরা অগ্রাহ্য করেছিলেন।

ভারত ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে তিনি সীমান্ত রাজ্য চম্পার মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন। তাঁর গন্তব্যস্থল ছিল সে সময়ের বিখ্যাত আন্তর্জাতিক বন্দর তাম্রলিপ্তি (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত তমলুক)। সেখান থেকেই সমুদ্রপথে তিনি অপর বৌদ্ধপ্রধান অঞ্চল শ্রীলঙ্কায় যেতে চেয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার পূর্বে ফা-হিয়েন দীর্ঘ দ'ুবছর তাম্রলিপ্তিতে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের অনুলিপি তৈরি ও বৌদ্ধ মূর্তির ছবি অংকন করেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়, এ সময় তাম্রলিপ্তিতে চবিবশটি বৌদ্ধ বিহার ও সেখানে অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ছিলেন। অবশ্য তিনি তার বিস্তারিত বিবরণ দেন নি।  [হরপ্রসাদ রায়]