গীতিকা


গীতিকা  আখ্যানধর্মী  লোকসাহিত্য। আবৃত্তির পাশাপাশি এটি গীত হয় এবং প্রকাশভঙ্গিতে থাকে লৌকিক বৈশিষ্ট্য। এর মূল ভিত্তি জনশ্রুতিমূলক বিষয় এবং বর্ণনায় প্রায়শ লৌকিক  ছন্দ ব্যবহূত হয়। বাংলা ‘গীতিকা’ ও ইংরেজি ব্যালাড শব্দদুটি প্রায় সমধর্মী।

গীতিকা রচয়িতার মধ্যে থাকে এক ধরনের নিরাসক্ত চেতনা। বিষয়বস্ত্ততে থাকে একটিমাত্র ঘটনা বা সঙ্কটপূর্ণ কাহিনী। নাটকীয়তা ও সংলাপধর্মিতা এর প্রধান গুণ। গীতিকার কাহিনী ক্রিয়া, চরিত্র, পরিবেশ ও বিষয়বস্ত্ত এ চারটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দৃঢ়বদ্ধ। এক্ষেত্রে ক্রিয়াই (action) প্রধান হয়ে নাটকীয় গুণ অর্জন করে। ঘটনার উত্থান-পতনে চমক ও বিস্ময় সৃষ্টি হয়। ঘন-সন্নিবিষ্ট নিচ্ছিদ্র ঘটনাজাল এবং অনাবশ্যক ও অপ্রাসঙ্গিক বর্ণনা পরিহার করে কেবল মূল ঘটনাপ্রবাহই পরিণতির পথে দ্রুত অগ্রসর হয়। ধারাবাহিক ও বিস্তৃত বর্ণনার স্থলে কাহিনীর মধ্যস্থিত কতিপয় সঙ্কটময় মুহূর্তের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয় এবং তাতেই কাহিনী সমগ্রতা লাভ করে। কোনো শাখা বা উপকাহিনীর ভারে এর গতি মন্থর করার সুযোগ নেই। বিষয়বস্ত্তও কখনও কখনও প্রত্যক্ষগোচর না হয়ে পরোক্ষ ইঙ্গিতে প্রকাশিত হয়।

গীতিকার চরিত্রসমূহ প্রায়শ একপ্রকার আদর্শায়িত (typed) রূপ লাভ করে, তবে মাঝে মাঝে তা নাটকের মতো সুস্পষ্ট ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণও হয়ে ওঠে। গীতিকা গীত হয় দেশি  বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গতানুগতিক সুরে। কিন্তু কাহিনী মূল লক্ষ্য হওয়ায় সুরের একঘেয়েমি শ্রোতার কাছে অপ্রীতিকর মনে হয় না। আর এখানেই লোকসঙ্গীতের সঙ্গে গীতিকার পার্থক্য। লোকসঙ্গীতে সুরই মুখ্য, কথা গৌণ। গীতিকায় এর বিপরীত অবস্থা। আদিম সমাজে গীতিকার উদ্ভব হয়নি, একটি সংহত লোকসমাজে এর উদ্ভব। এর অর্থ গীতিকা মূলত কোনো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অধিকারী সমাজ ও অভিজ্ঞ কবিমনেরই সৃষ্টি।

গীতিকা মৌখিক সাহিত্য বিধায় তা মনে রাখার জন্য কতগুলি সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। যেমন, কোনো কোনো অংশের পুনরাবৃত্তি, বাংলায় যাকে বলা হয় ‘ধুয়া’; ইংরেজিতে এর কাছাকাছি একটি শব্দ আছে refrain। তবে উভয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে। ধুয়ার পদ সাধারণত একটি হয় এবং তা অনেক সময় গেয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। কিন্তু refrain-এ একাধিক পদ থাকে এবং তা গেয় বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইউরোপে ছোট আকারের আখ্যানমূলক একপ্রকার প্রাচীন লোকগীতিকে ব্যালাড বলা হয়। ব্যালাড ইউরোপ-আমেরিকার সেসব অঞ্চলে এখনও বর্তমান যেসব অঞ্চলে শহুরে সংস্কৃতি বা গণমাধ্যমের প্রবেশ ঘটেনি।

ইউরোপে ব্যালাডের অস্তিত্ব কেবল ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলেই সীমাবব্ধ নয়, তা রয়েছে ফ্রান্স, ডেনমার্ক, জার্মানি, রাশিয়া, গ্রিস ও স্পেনে। রাশিয়ায় এর নাম byliny, স্পেনে romances, ডেনমার্কে viser, ইউক্রেনে dumi, সাইবেরিয়ায় junacka pesme ইত্যাদি। ব্রিটিশ ও আমেরিকান ব্যালাডগুলি অভিন্নভাবে অন্ত্যমিলযুক্ত এবং কবিগানের ধাঁচে স্তবকে বিভক্ত। ব্যালাডের কাহিনী যেমন সংক্ষিপ্ত তেমনি দৃঢ়বদ্ধ। একটি একক ও চরম পরিণতিমূলক পরিস্থিতির ওপর পাঠকের দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত রাখা হয়, আর পরিহার করা হয় দ্বন্দ্ব-সংঘাতপূর্ণ ঘটনাসমূহ।

ব্যালাডে চরিত্রায়ণ স্বল্পতম আয়তনে সীমাবদ্ধ থাকে। চরিত্রগুলি নিজেদের প্রকাশ করে কর্মপ্রক্রিয়া ও সংলাপের মাধ্যমে। ব্যালাডে সব বর্ণনাই হয় সংক্ষিপ্ত ও প্রথানুগ। আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিতভাবে দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটে। সময়ের পরিবর্তনগুলি নির্দেশিত হয় অস্পষ্টভাবে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও আবেগ ব্যক্ত হয় তীব্র, তীক্ষ্ণ ও দ্বিধাহীন সংলাপের মাধ্যমে। উত্তেজনাপূর্ণ নাট্যসংবেদন সৃষ্টির লক্ষ্য থেকে ব্যালাডের কাহিনী গ্রথিত হয়। ব্যালাড নিরক্ষর লোকদের মধ্যে বিকশিত হয় এবং প্রতিবার গীত হওয়ার সময় স্মৃতি থেকে নতুন করে উপস্থাপন করা হয় বলে এর মূল পাঠ ও সুরে সব সময়ই পরিবর্তনের ছাপ থাকে। যেখানে ঐতিহ্য সমৃদ্ধ নয় এবং সাহিত্যিক ও অন্যবিধ বহিঃস্থ সাংস্কৃতিক প্রভাব ব্যাপক নয়, সেখানে এসব পরিবর্তন ব্যালাডকে প্রাণবন্ত রাখে এবং লোকসমাজের জীবনধারাকে তার যূথবদ্ধ, বিশ্বাস ও আবেগী প্রয়োজনের সঙ্গে একাত্ম করে রাখে। পুঞ্জীভূত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্যালাডের নতুন নতুন ভাষ্য সৃষ্টি হয়। একটি ব্যালাড যখন মুদ্রিত হয় তখনই তা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। কিন্তু এরও একটি সীমাবদ্ধতা আছে, কারণ এটি একটি নির্দিষ্ট সময় বা নির্দিষ্ট স্থানের রূপ। তাই প্রথম মুদ্রিত হওয়ার রূপটিই এর প্রকৃত রূপ নয়।

গীতিকার সৃষ্টি নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে। একশ্রেণীর সমালোচক গীতিকা ও লোকসঙ্গীতের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট পার্থক্য অনুভব করেন নি। তাদের ধারণা, লোকসঙ্গীতের অন্যান্য শাখার মতো গীতিকাও কোনোও এক সংহত সমাজের ঐক্যবদ্ধ সৃষ্টি। এ মত পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তিত হয় এবং ধারণা করা হয়, ব্যক্তিবিশেষের অধিনায়কত্বে জনসাধারণই এর রচয়িতা। যিনি অধিনায়কত্ব করতেন তিনি সম্পাদনারও দায়িত্ব পালন করতেন; অর্থাৎ গীতিকার অনাবশ্যক অংশ বাদ দিয়ে সামগ্রিকভাবে এর একটি বিশিষ্ট রূপ ফুটিয়ে তুলতেন। আধুনিক পাশ্চাত্য সমালোচকরা এ উভয় মত খন্ডন করে বলেছেন, ব্যালাড ব্যক্তিপ্রতিভারই একক সৃষ্টি।

তবে ব্যক্তির সৃষ্টি-সংক্রান্ত এ সত্যটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ গায়ক নিজেকে কখনও এককভাবে উপস্থাপন করেন না এবং একটি ব্যালাড কখনোই ব্যালাড হতে পারে না, যতক্ষণ না তা লোকসমাজ গ্রহণ করে। গীতিকা বা ব্যালাডের সৃষ্টি নিয়ে নানা মতের অস্তিত্ব থাকলেও সকলেই স্বীকার করেছেন যে, গীতিকা আদিম সমাজের নয়, উন্নততর সমাজের সৃষ্টি। আদিম সমাজে সঙ্গীত বা লোকসঙ্গীতের অস্তিত্ব থাকলেও গীতিকার অস্তিত্ব ছিল না।

আরও একটি বিষয়ে সকলেই মোটামুটি একমত যে, গীতিকার উদ্ভব ঘটেছে মহাকাব্য সৃষ্টির পরবর্তী যুগে। এর প্রমাণ, গীতিকার মধ্যে মহাকাব্যের অনেক বিষয়ের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। সমালোচকেরা আরও সহমত পোষণ করেন যে, গীতিকায় কেবল সমসাময়িক ঘটনা কিংবা ভাববস্ত্তরই সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না, সমাজ-সংস্কৃতিতে বিধৃত প্রস্ত্তরীভূত আদিম উপকরণেরও প্রতিফলন ঘটে। ফলে গীতিকাকে জাতীয় ইতিহাসের মূল্যবান উপকরণের আধার হিসেবে গণ্য করা যায়।

গীতিকা লোকসাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত বলে একশ্রেণীর লোক এগুলি মুখস্থ করে বিভিন্ন উপলক্ষে নানা অনুষ্ঠানে পরিবেশন করত। তারা ছিল সাধারণত নিরক্ষর; স্মৃতিই ছিল তাদের একমাত্র অবলম্বন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নানা নামে অভিহিত করা হতো। যেমন, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও কাশ্মীরে ‘গীতিকা-ব্যবসায়ী’, রাজপুতানায় ‘চারণ’, মধ্যপ্রদেশে ‘পরধান’, বাংলায় ‘ভাট’ প্রভৃতি। এরা বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে গীতিকা পরিবেশন করে জীবিকা নির্বাহ করত।

বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত যেসব গীতিকা সংগৃহীত ও প্রকাশিত হয়েছে সেগুলিকে প্রধানত দুভাগে ভাগ করা যায়: পূর্ববঙ্গগীতিকা ও নাথগীতিকা।  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  দীনেশচন্দ্র সেন কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত হয়ে চারখন্ডে  পূর্ববঙ্গ-গীতিকা প্রকাশিত হয়। তাতে গীতিকার সংখ্যা ৫৪টি। এ ছাড়া ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিকের সম্পাদনায় সাত খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে প্রাচীন পূর্ববঙ্গ-গীতিকা। এতে অবশ্য নতুন কোনো গীতিকা সংকলিত হয়নি। দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত গীতিকারই সংশোধিত, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপ তিনি সংকলিত করেন।

দীনেশচন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক সম্পাদিত পূর্ববঙ্গের গীতিকাগুলির মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও অধিক গীতিকা (সংখ্যা: ৩৯) ময়মনসিংহ অঞ্চলের; বাকিগুলি সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী প্রভৃতি অঞ্চল থেকে সংগৃহীত। ময়মনসিংহের আরও কিছু গীতিকা (সংখ্যা: ৫) এবং অন্যান্য জেলা থেকেও কিছু গীতিকা পরবর্তীকালে সংগৃহীত ও প্রকাশিত হয়েছে।

ময়মনসিংহ ছাড়া বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে সংগৃহীত গীতিকাগুলির শিল্পমান ততটা উৎকৃষ্ট নয়। সে কারণে অনেক সমালোচকই ময়মনসিংহের গীতিকাগুলিকে অন্যান্য অঞ্চলের গীতিকা থেকে আলাদা দেখতে আগ্রহী। স্মরণীয় যে, বিদেশি মনীষীরা দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত মৈমনসিংহ-গীতিকার (পূর্ববঙ্গ-গীতিকার ১ম খন্ড) ইংরেজি ভাষ্য পড়েই প্রশংসামুখর হয়েছিলেন। এসব গীতিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘চন্দ্রাবতী’, ‘দেওয়ানা মদিনা’, ‘কঙ্ক ও লীলা’, ‘কমলা’, ‘দেওয়ান ভাবনা’ প্রভৃতি।

নাথগীতিকাগুলির বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। একটিমাত্র ঐতিহাসিক বিষয়বস্ত্ত অবলম্বনে সমস্ত নাথগীতিকা রচিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে বিষয়গত কোনো পার্থক্য নেই। যে মূল ঐতিহাসিক বিষয়বস্ত্ত অবলম্বনে সেগুলি রচিত তার একটি সর্বজনীন মানবিক আবেদন ছিল। এ ছাড়া এ গীতিকাসমূহ একটি সর্বভারতীয় ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অবলম্বনের সুযোগ লাভ করে। নাথ সম্প্রদায়বিষয়ক রচনার দুটি প্রধান ভাগ: একটি হলো নাথগুরুদের অলৌকিক সাধন-ভজনের কাহিনী এবং অন্যটি তরুণ রাজপুত্র গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাসের কাহিনী। প্রথমোক্ত বিষয় নিয়ে রচিত হয়েছে  গোরক্ষবিজয়, মীনচেতন প্রভৃতি; আর দ্বিতীয়োক্ত বিষয় নিয়ে রচিত হয়েছে মানিকচন্দ্র রাজার গান, গোবিন্দচন্দ্রের গীত, ময়নামতীর গান, গোপীচাঁদের সন্ন্যাস, গোপীচাঁদের পাঁচালি প্রভৃতি। রাজপুত্রের অপূর্ব আত্মত্যাগের পাশাপাশি নাথগুরুদের অলৌকিক মাহাত্ম্যের কথাও এতে কীর্তিত বলে এগুলি বিষয়ের দিক থেকে বৈচিত্র্যহীন হলেও সর্বজনীনত্বের গুণে বাংলার সীমা অতিক্রম করতে পেরেছিল।

নাথগীতিকাগুলি প্রধানত উত্তরবঙ্গে প্রচার লাভ করেছিল। সেখানে এগুলি ‘যুগীযাত্রা’ নামে পরিচিত। বৈশিষ্ট্য ও বিষয়বস্ত্ত অনুযায়ী গীতিকাকে নানা শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যেমন: ১. খাঁটি প্রেমমূলক: মহুয়া, মলুয়া, কমলা; ২. ধর্মকেন্দ্রিক প্রণয়: চন্দ্রাবতী; ৩. রূপক-প্রণয়মূলক: কঙ্ক ও লীলা; ৪. বিবাহোত্তর প্রণয়: দেওয়ানা মদিনা; ৫. ঐতিহাসিক: ঈশা খাঁ মসনদালি; ৬. দস্যুবৃত্তিমূলক/লোকনায়কভিত্তিক: দস্যু কেনারামের পালা; ৭. স্থানভিত্তিক: বারতীর্থের গান; ৮. বারমাসী: বগুলার বারমাসী; ৯. রূপকথাধর্মী: কাজলরেখা প্রভৃতি।  [সৈয়দ আজিজুল হক]

আরও দেখুন লোকসাহিত্য