খড়গ বংশ


খড়গ বংশ  আনুমানিক খ্রিস্টীয় সাত ও আট শতকে প্রাচীন বাংলার বঙ্গসমতট অঞ্চল শাসন করে। আশরাফপুরে (ঢাকার নিকটবর্তী) প্রাপ্ত দুটি তাম্রশাসন, মুদ্রা ও চৈনিক পরিব্রাজক শেং চি-এর (আনুমানিক সাত শতক) বিবরণ ইত্যাদি থেকে এ রাজবংশ সম্পর্কে তথ্যাদি পাওয়া যায়। এগুলির মধ্যে আশরাফপুরে প্রাপ্ত তাম্রশাসন দুটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। জানা মতে, রাজবংশের প্রথম শাসক ছিলেন খড়্গদ্যোম (আনুমানিক ৬২৫-৬৪০ খ্রি.), তবে তাঁর পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। খড়্গদ্যোমের উত্তরসূরি ছিলেন তাঁরই পুত্র জাতখড়্গ (আনুমানিক ৬৪০-৬৫৮ খ্রি.)। জাতখড়্গের উত্তরসূরি হিসেবে পরবর্তীকালে এসেছিলেন যথাক্রমে তাঁর পুত্র দেবখড়্গ (আনুমানিক ৬৫৮-৬৭৩ খ্রি.) ও পৌত্র রাজভট্ট (আনুমানিক ৬৭৩-৬৯০ খ্রি.)। রাজভট্টের পরবর্তী শাসক ছিলেন সম্ভবত তাঁর ভাই বলভট্ট (আনুমানিক ৬৯০-৭০৫ খ্রি.)। আশরাফপুরে প্রাপ্ত দ্বিতীয় তাম্রশাসনে জনৈক উদীর্ণখড়্গ নামে একজনের উল্লেখ আছে। তার নামের শেষাংশ ইঙ্গিত করে যে, তিনিও সম্ভবত খড়্গ রাজবংশেরই কেউ একজন ছিলেন। কিন্তু তার শাসনকাল এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত।

খড়্গ রাজাগণ পরমেশ্বর বা এ জাতীয় কোনো সর্বোচ্চ উপাধি ব্যবহার করেন নি। এতে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁরা ছিলেন স্থানীয় শাসক এবং তাদের রাজ্যসীমা নির্ধারণ করা কঠিন। আশরাফপুর তাম্রশাসনদ্বয়ের মধ্যে একটিতে তলপাটক ও দত্তকটকের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলিকে শনাক্ত করা হয়েছে নরসিংদীর রায়পুর পুলিশ স্টেশনের অধীন তালপাড়া ও দাতগাও গ্রামের সাথে।

রাজনৈতিকভাবে খড়্গদের ভিত্তি ছিল বঙ্গ। আশরাফপুর তাম্রশাসনগুলি দেবখড়্গের ত্রয়োদশ রাজাঙ্কে (আনুমানিক ৬৭১ খ্রি.) জয়করমান্তবাসক-এর জয়স্কন্ধবার থেকে প্রদান করা হয়েছিল। জয়স্কন্ধবার-কে কুমিল্লার বরকান্তার (বড়কামতা) সাথে অভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দেবখড়্গ রাত রাজা শ্রীধারণ রাতকে (আনুমানিক ৬৬০-৬৭০ খ্রি.) উচ্ছেদ করে বঙ্গ থেকে সমতট পর্যন্ত তাঁর ক্ষমতা সম্প্রসারিত করেছিলেন। আর এর সমর্থন পাওয়া যায় রানী প্রভাবতীর দেউলবাড়ি শরবাণী মূর্তি লিপিতে। এতে দেবখড়্গকে দয়ালু (দানপতি), শক্তিশালী (প্রতাপী) ও সকল শত্রুর বিজেতা (বিজিতারিখন্ড) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে তার এ বিজয়কে সম্ভবত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন কিংবা এর পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বৈধ করে নিতে হয়েছিল। আর সম্ভবত সে কারণেই দেবখড়্গ সে যুগের প্রচলিত নিয়মে বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের জন্য ভূমি দান করতে বাধ্য হন।

আশরাফপুরের উভয়  তাম্রশাসনে এটি পরিষ্কার যে, দেবখড়্গ ও তাঁর পুত্র রাজভট্ট দুজনই গুরু সংঘমিত্রের তত্ত্বাবধানে চারটি  ‘বিহার’ ও ‘বিহারিকা’র জন্য ১৫ পাটক ও ২০ দ্রণ ভূমি দান করেছিলেন। দানকৃত ভূমির পরিমাণ বর্তমানের হিসেবে ৪৮৪ বিঘা (১ পাটকে কমপক্ষে ১২৮ বিঘা)। তবে দেবখড়্গকে মঠটি নির্মাণ করতে হয় নি, বরং এগুলি ইতঃপূর্বেই নির্মিত ছিল। খড়্গ রাজা এগুলিকে শুধু একটি একক সীমানায় (একগন্ডিকৃত...) নিয়ে আসে। এভাবেই এলাকাটি হয়ে ওঠে পবিত্র এক ভূমি।

দানকৃত ভূমি থেকে আর্থিক সুবিধা লাভের চেষ্টা করা হয়েছিল। তাম্রফলকটিতে কৃষ্যমাণকদের (যার অর্থ ভূমি কর্ষণকারী) উল্লেখ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ভূমি কর্ষণকারীরা এখানে শুধু কৃষি শ্রমিক, কারণ তারা জমির মালিকও নয় কিংবা জমি ভোগ করারও কোনো অধিকার তাদের নেই। মঠগুলির ওপর ভূমিস্বত্ব ন্যস্ত ছিল। দানপত্রে উল্লিখিত ভূজ্যমাণক নামক আর একটি সামাজিক স্তর ভূমির অধিকার ভোগ করত। এ ভূজ্যমাণ করা ছিল প্রকৃত ভূমি কর্ষণকারীদের (কৃষ্যমাণক) থেকে আলাদা। এ পার্থক্যের কারণেই ধারণা করা যায় যে, সে যুগে তিন স্তর বিশিষ্ট ভূমি ব্যবস্থা ছিল ভূমি স্বত্বাধিকারী মঠ (বিহার বা বিহারিকা), ভোগকারী (ভূজ্যমাণক) এবং ভূমির প্রকৃত কৃষক (কৃষ্যমাণক)। এ ভূমি ব্যবস্থা যজ্ঞবল্ক্য স্মৃতিতে (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিস্টীয় ২০০ অব্দ) উল্লিখিত ব্যবস্থা যেমন, মহীপতি (রাজা), ক্ষেত্রস্বামী (ভূমি স্বত্বাধিকারী) এবং কর্ষক (প্রকৃত চাষী)-এর অনুরূপ।

শুধু দেবখড়্গই নয়, তাঁর পুত্র রাজভট্টও সমতটে বৌদ্ধধর্ম চর্চা সমর্থন করেছিলেন। চৈনিক ভিক্ষু শেং চি চা’ন সি লিখেছেন যে, তিনি যখন সমতটে আসেন (তার আগমন তারিখ জানা যায় না) তখন সেখানকার রাজা হলেন হো-লুও-শে-পো-তো’, যাকে শনাক্ত করা হয়েছে দেবখড়গের পুত্র রাজারাজ (ভট্ট)-এর সাথে। তিনি ত্রিরত্নের প্রতি বিশেষভাবে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এ ত্রিরত্ন হলো বুদ্ধ, আইন-শৃঙ্খলা (সান-পাও) এবং বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চবিধানের অনুসারী উপাসক (উ-পো-সো-চিয়া)। জানা যায়, এ রাজা সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের থাকা-খাওয়ার জন্য বিভিন্ন রকমের দান-দক্ষিণা করতেন। প্রত্যহ সকালে রাজার পক্ষে একজন অফিসার মঠে আসতেন এবং শেং-চি সহ সেখানে বসবাসকারী সকল সন্ন্যাসীদের খোঁজ-খবর নিতেন। শেং-চি এবং সন্ন্যাসীগণ যে বিহারে থাকতেন সেটি হলো রাজবিহার। রাজবিহার বিহারটিকে বিনয়গুপ্তের (৫০৭ খ্রি.) গুনাইগড় তাম্রশাসনে উল্লিখিত বিহারের অনুরূপ বলে ধারণা করা হয়। এসব সমর্থন বা পৃষ্ঠপোষকতাকে রাজার ক্ষমতা বৈধকরণে তার প্রচেষ্টা বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

দেবখড়গের আর এক পুত্র বলভট্ট-এর তাম্রশাসনে উল্লেখ আছে যে, তিনি বিহার ও  স্তূপগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং আশ্রমগুলির পুনঃনির্মাণ ও মেরামতের জন্য ধনলক্ষ্মীপাটক (এখন পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয় নি) এলাকায় ২৮ পাটক জমি দান করেছিলেন। তাম্রশাসনে মহাভোগাশ্রম-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত এ আশ্রমে ধর্মীয় মহোৎসব অনুষ্ঠিত হতো। মোট আটটি বিহারের তথ্য পাওয়া যায় যেখানে পারিমিতমতম ও দানচন্দ্রিকা আলোচনা ও শিক্ষা দেয়া হতো। তবে এটা প্রতীয়মান যে, বৌদ্ধ ধর্মত্রয়ী বুদ্ধ, ধর্ম ও সঙ্ঘ-কে সামনে রেখেই ধর্মীয় কর্মকান্ডের উদ্দেশ্যে আবাসিক সুযোগ সুবিধার জন্য এ দান সংঘটিত হয়েছিল।

প্রথম আশরাফপুর তাম্রশাসন এ রাজবংশের ধর্মের প্রতি আগ্রহ সম্পর্কে আরও কিছু বেশি তথ্য সরবরাহ করে। এটি ধর্মচক্র (আইনের চাকা) নয়, বরং বাম দিকে মুখ ফেরানো উৎকীর্ণ ষাঁড়-এর নিচে শ্রীমত দেবখড়গের নাম সম্বলিত শিলালিপির কথা উল্লেখ করে। এর থেকে তার শৈব ধর্মের প্রতি ঝোঁকের কথা অনুমান করা যায়। শৈব ধর্মের প্রতি এ প্রবণতা তার পুত্র বলভট্টের সময়েও বিদ্যমান ছিল। বলভট্ট তার তাম্রশাসনে নিজেকে পরমেশ্বর রাজপুত্র  হিসেবে উল্লেখ করেন।

কুমিল্লার  দেউলবাড়ি থেকে আর একটি উদাহরণ পাওয়া যায় যেখানে দেখা যাচ্ছে যে, দেবখড়গের রানী প্রভাবতী শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ (মহাদেবী ভক্ত্যা হেমলিপ্তম্-অরেয়াত্) দেবী শরবাণীকে স্বর্ণপত্রে মুড়ে দিয়েছেন। দেবী শরবাণীর আট হাতের মধ্যে বাম দিকের হাতে ধরা আছে বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ, ঘণ্টা, ধনুক ও ঢাল, আর ডান দিকের হাতে রয়েছে শঙ্খ, অঙ্কুশ, তরবারি ও চক্র। ব্রাহ্মণ্য মন্দিরের ভেতরে দেবী শরবাণী একটি সিংহের পিঠে পদ্মাসনের উপর দাঁড়িয়ে আছেন।

তবে দেউলবাড়ি লেখচিত্রের কোথাও উল্লেখ নেই যে, শরবাণী দেবীর মূর্তি দেউলবাড়িতে নির্মিত ও স্থাপিত হয়েছিল। বরং লিপি প্রমাণে মনে হয় যে, মূর্তিটি দেউলবাড়িতে পূর্বে থেকেই ছিল যা রানী প্রভাবতী পরবর্তীসময়ে স্বর্ণপত্রে মুড়ে দিয়েছিলেন। দেবখড়্গ, তাঁর রানী প্রভাবতী ও তার পুত্র বলভট্টের শৈব প্রীতিকে চিহ্নিত করা যেতে পারে সমতটে (বিজিতারিখন্ড) খড়্গ রাজবংশের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে। এটি বোঝা যায় যখন দেখা যায় যে, দেবখড়গের সাথে বিজিতারিখন্ড শব্দটি জড়িত হওয়ার পর রানী কর্তৃক দেবী মূর্তিকে স্বর্ণপত্রে মোড়ানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।

শালবন বিহারএর খননকৃত প্রত্নস্থল থেকে আরও দুটি তাম্রশাসন পাওয়া গেছে, তবে এ দুটি তাম্রশাসন থেকে খড়্গ রাজবংশের কার্যকলাপ সম্পর্কে কোনো কিছুই জানা যায় না। লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণে ধারণা করা হয় যে, সম্ভবত আট শতকে  দেব রাজবংশ খড়্গদের ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। [কৃষ্ণেন্দু রায়]

গ্রন্থপঞ্জি  Kamalakanta Gupta, ‘Two Mainamati Copper plate Inscriptions of the Khadga and Early Deva Times (7th and 8th cent. AD)’, Bangladesh Archaeology, I, 1979; দীনেশচন্দ্র সরকার, পাল-পূর্ব যুগের বংশানুচরিত, কলকাতা, ১৯৮৫; ABM Hussain (ed), Mainamati – Devaparvata, Dhaka, 1997; BM Morrison, Lalmai, A Cultural Centre of Early Bengal, Washington.