কাসিম খান জুইনি


কাসিম খান জুইনি (১৬২৮-১৬৩২)  সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক বাংলার সুবাহদার নিযুক্ত হন। সম্রাট শাহজাহান সিংহাসনে আরোহণ করেই ফিদাই খানকে বরখাস্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন মীর মুরাদের পুত্র। সম্রাট আকবর শাহজাদা খুররমকে (শাহজাহান) ধনুর্বিদ্যায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মীর মুরাদকে নিয়োজিত করেন এবং পরে তাঁকে লাহোরের বখশী নিয়োগ করা হয়।  ইসলাম খান চিশতির সুবাহদারি আমলে কাসিম খান বাংলায় খাজাঞ্চি পদে কর্মরত ছিলেন। বাংলায় তার সুবাহদারি আমলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা পর্তুগিজদের নিকট থেকেহুগলি দখল।

ইউরোপীয়দের মধ্যে পর্তুগিজরাই সর্বপ্রথম বাংলায় বসতি স্থাপন করে। বাংলায় শক্তিশালী মুগল শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে সেখানে বিরাজমান নৈরাজ্যকর অবস্থায় পর্তুগিজগণ বহু আইনবহির্ভূত ও হঠকারী কার্যকলাপে জড়িত হয়ে পড়ে, অথচ তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিবদ্ধ রাখা। তাদের নৃশংসতা ও বহুবিধ দুষ্কর্ম স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্দশা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। হুগলি, ঢাকা, যশোর ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্যকুঠি থেকে তারা তাদের বাণিজ্য ও বহুবিধ ঘৃণ্য কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। বাংলার নিম্নাঞ্চল থেকে পর্তুগিজগণ ধনসম্পদ লুঠ করে এবং নারী-পুরুষ, শিশুদের বলপূর্বক ধরে নিয়ে দাসরূপে বিক্রি অথবা জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করে।

বাংলায় পর্তুগিজদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এমনি অসহনীয় হয়ে পড়ে যে, মুগলরা কাসিম খানের নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়। এটি ছিল বাংলায় পর্তুগিজদের অরাজকতা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক গৃহীত সুদুরপ্রসারী নীতি।

হুগলির প্রতিরক্ষায় অংশগ্রহণকারী খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক ক্যাবরাল মত প্রকাশ করেছেন যে, পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহকালে পর্তুগিজরা তাঁকে সমর্থন না দেওয়ায় এবং সম্রাট পদে অভিষিক্ত হওয়ার পর তাঁর প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন না করায় শাহজাহান পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। কাসিম খান ধীরগতিতে অভিযানের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করেন এবং প্রায় তিন মাস ধরে হুগলি অবরোধ করে রাখেন। ফলে পর্তুগিজদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে এবং প্রচুর সম্পদ ও প্রাণহানির পর তারা হুগলি ত্যাগ করে। এভাবে পর্তুগিজদের দাস ব্যবসা এবং বলপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তকরণের শক্তিশালী খাঁটি ধ্বংস করা হয়। হুগলি দখলের অল্পদিন পরে ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে কাসিম খান জুইনির মৃত্যু হয়।  [কে.এম করিম]