ইসলাম খান চিশতি


ইসলাম খান চিশতি (১৬০৮-১৬১৩)  পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের জন্য বাংলার মুগল সুবাহদার ছিলেন। প্রকৃত নাম শেখ আলাউদ্দীন চিশতি। সম্রাট  জাহাঙ্গীর তাঁকে ইসলাম খান উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। শেখ বদরউদ্দীন চিশতির পুত্র ও ফতেহপুর সিক্রির শেখ সেলিম চিশতির পৌত্র ইসলাম খান ছিলেন শাহজাদা সেলিমের খেলার সাথী (সেলিম চিশতির খানকায় শাহজাদার অবস্থানকালে এ সম্পর্ক গড়ে ওঠে)।

তাঁর বিখ্যাত পূর্বসূরিগণ যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেখানে চট্টগ্রাম ছাড়া সমগ্র বাংলা জয় করে মুগলদের নিয়ন্ত্রণে আনার সাফল্য লাভ করায় বাংলার সুবাহদার হিসেবে ইসলাম খান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৫৭৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে  আকবর প্রায় বারোজন দক্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে বাংলা জয় করার জন্য পাঠালেও রাজধানী নগরী তান্ডা এর আশে পাশের কিছু অংশ মাত্র দখল করতে সফল হয়েছিলেন। স্থানীয় রাজা, ভূঁইয়া, জমিদার ও আফগান নেতা তখন বাংলাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে শাসন করছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আক্রমণকারী মুগল সেনাবাহিনীর বশ্যতা স্বীকার করে নিলেও আক্রমণকারীরা রাজধানীতে ফিরে গেলেই বিজিত নেতারা আগের মতোই স্বাধীনভাবে শাসন করতেন। কাজেই পিতা আকবরর এর ইচ্ছাপূরণের দায়িত্বটা পুত্র জাহাঙ্গীরের ওপর বর্তায়। জাহাঙ্গীরের অধিনস্ত প্রথম কয়েকজন সুবাহদার বাংলা জয়ে সাফল্য অর্জণে ব্যর্থ হলে তরুণ ও উদ্যমী ইসলাম খানকে তিনি বাংলা জয়ের জন্য নির্বাচিত করেন ও সুবাহদার হিসেবে ১৬০৮ সালে বাংলায় প্রেরণ করেন।

আটত্রিশ বছর বয়স্ক ইসলাম খানের কোনো সামরিক প্রশিক্ষণ ছিল না। তবে অনুমান করা যেতে পারে যে, অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করার ফলে তিনি মুসলমানদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন। বাংলায় আসার আগে তিনি বিহারের সুবাহদার ছিলেন। নিয়োগ লাভ করে তিনি অনতিবিলম্বে বাংলার তদানীন্তন রাজধানী রাজমহলএ চলে আসেন। ইসলাম খান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাংলার ভূ-রাজনীতি পরীক্ষা করে দেখেন এবং সম্রাটের প্রবীণ যোদ্ধাদের সহযোগিতায় তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তৈরি করেন। বিদ্রোহী বাংলা প্রদেশে মুগল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সুসজ্জিত, সুপ্রশিক্ষিত, অনুগত, বিশ্বাসী ও কর্তব্যপরায়ণ সামরিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। ভাটি অঞ্চলে বারো ভূঁইয়া এবং  খাজা উসমান ও তার ভাইদের নেতৃত্বাধীন আফগানরা মুগল কর্তৃক বাংলা বিজয়ে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল বলে তিনি মনে করতেন। আফগানরা বুকাইনগর দখল করে নিয়েছিল। ফলে ইসলাম খান সর্বপ্রথম ভাটি ও বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করেন। তিনি ছোট-বড় নদী ও খালে পরিপূর্ণ ভাটির নিম্নাঞ্চলে যুদ্ধে কার্যকর ফললাভের জন্য শক্তিশালী নৌ-বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সুতরাং ইসলাম খান মুগল নৌ-বাহিনীকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি এটাও উপলব্ধি করেন যে, তদানীন্তন রাজধানী রাজমহল ছিল বাংলা প্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এবং গোলযোগপূর্ণ পূর্ব বাংলা থেকে রাজমহলের দূরত্বও ছিল অনেক। সুতরাং তিনি ঢাকায় বালার রাজধানী স্থানান্তর করেন। কারণ ঢাকা ছিল ভাটি অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং বারো ভূঁইয়াদের সদর দফতরের সঙ্গে নদী দ্বারা উত্তম যোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক স্থান।

সৈন্যবাহিনী ও নৌ-বাহিনী পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ইসলাম খান সম্রাটের কাছ থেকে সহায়তা লাভ করেন। মুগল সম্রাট ইতিমাম খানকে  মীর বহর (নৌ-সেনাপতি) এবং মুতাকিদ খানকে  দীউয়ান নিযুক্ত করেন। এ দুজনই ছিলেন অভিজ্ঞ এবং স্ব স্ব বিভাগের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং ইসলাম খান তাঁদের অকুণ্ঠ সহযোগিতা লাভ করেন। তিনি রাজমহল ত্যাগ করে ভাটির উদ্দেশ্যে ঘোড়াঘাট অভিমুখে অগ্রসর হন। তাঁর লক্ষ্যস্থল ভাটি হলেও এবং বারো ভুঁইয়াদের দমন করার প্রকাশ্যে ঘোষিত উদ্দেশ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও তিনি তাঁর বাহিনীর পশ্চাৎ ভাগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভুলে যান নি। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা শেখ কামালকে দক্ষিণ পশ্চিমের তিনটি রাজ্য বিষ্ণুপুর, পচেত এবং হিজলি আক্রমণ করতে প্রেরণ করেন এবং রাজ্যগুলি মুগল বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। ঘোড়াঘাট যাওয়ার পথে ইসলাম খান এর সঙ্গে যশোরের ধনী ও শক্তশালী জমিদার প্রতাপাদিত্য সাক্ষাৎ করে আত্মসমর্পণ করেন। ভূষণার রাজা সত্রজিৎও সুবাহদারের কাছে আত্মসমর্পণ করে সম্রাটের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। উত্তর পশ্চিম বাংলার অবাধ্য জমিদারদের বিরুদ্ধেও ইসলাম খান সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। বাংলার জমিদার ও সামন্ত প্রভুরা অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও এবং ইসলাম খানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কোনো সুযোগই তাদের ছিল না। এ প্রক্রিয়ায় ইসলাম খান তাঁর বাহিনীর পশ্চাদভাগকে যেমন নিরাপদ রেখেছেন তেমনি রাজধানীর সঙ্গে তার যোগাযোগের পথও ছিল বিপদমুক্ত।

১৬০৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইসলাম খান রাজমহল থেকে যাত্রা শুরু করে ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ঘোড়াঘাট পৌঁছেন। বর্ষাকালটা সেখানে কাটিয়ে তিনি অক্টোবর মাসে ভাটির দিকে অগ্রসর হন। ১৬১০ খ্রিস্টাব্দের জুন-জুলাই মাসের দিকে ঢাকা পৌঁছার আগে তিনি সে বছরের প্রথম কয়েক মাস বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কাটান।  ঈসা খান এর পুত্র  মুসা খান ছিলেন বারো ভূঁইয়াদের নেতা। তাঁর নেতৃত্বে বারো ভূঁইয়াগণ প্রতিটি দুর্গে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হন। ইসলাম খান ঢাকা দখল করে সেখানে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এ স্থানের নতুন নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। তখনো পর্যন্ত ভূঁইয়াদের সম্পূর্ণরূপে দমন করা সম্ভব হয় নি। তাঁরা লক্ষ্যা নদীর উভয় তীরে তাঁদের অবস্থানগুলিকে সুরক্ষিত করে রেখেছিলেন। ইসলাম খান ঢাকাকে সুরক্ষিত করে তিনি ভূঁইয়াদের সব অবস্থানের বিরুদ্ধে অভিযান প্রেরণ করেন এবং ১৬১১ খ্রিস্টাব্দেই মুসা খানসহ বারো ভূঁইয়াদের সবাই ইসলাম খানের নিকট বশ্যতা স্বীকার করেন। সুবাহদার যশোরের প্রতাপাদিত্য, বাকলার  রামচন্দ্র এবং  ভুলুয়ার অনন্তমাণিক্যকেও পরাজিত করেন এবং তাঁদের রাজ্যগুলি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।

এরপর তিনি খাজা উসমানের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন আফগানদের বুকাইনগরে পরাজিত করেন। আফগানরা উহারে (মৌলভীবাজারে) পালিয়ে যায়, তবে তারা তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। ইসলাম খানের অনুরোধে উসমানের বিরুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে সুজ্জাত খানকে সম্রাট প্রেরণ করেন। আফগানদের সঙ্গে এ যyুদ্ধর ফলাফল প্রায় অনিশ্চিত হতে যাচ্ছিল। কিন্তু উসমানের আকস্মিক মৃত্যু মুগলদের অপ্রত্যাশিত বিজয় এনে দেয়। রাতের অন্ধকারে আফগানরা পালিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে তারা মুগলদের বশ্যতা স্বীকার করে। সিলেটে বায়েজীদ কররানী এর নেতৃত্বাধীন আফগাদেরও বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। এভাবে সমগ্র বাংলা মুগলদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বাংলার দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত নির্ধারিত হয় ফেনী নদী, যার পরেই ছিল আরাকান রাজ্য।

এরপর ইসলাম খান  কুচবিহার, কামরূপ এবং কাছাড় রাজ্যের দিকে মনোযোগ দেন। কুচবিহারের রাজা লক্ষ্মীনারায়ণ সর্বদাই ছিলেন মুগলদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন, কিন্তু রাজা পরীক্ষিৎনারায়ণ মুগলদের অগ্রগতির বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পর তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীকালে তাঁকে সম্রাটের দরবারে প্রেরণ করা হয় এবং কামরূপ মুগল সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত হয়। কাছাড়ের পরাজিত রাজাও মুগলদের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।

ইসলাম খান সমগ্র বাংলা জয় করতে এবং সীমান্তরাজ্য কামরূপ দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এক এক করে প্রতিপক্ষদের পরাজিত করে তিনি তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হতে দেন নি। ভূঁইয়া ও সামন্ত প্রভুদের দ্বিধাবিভক্ত করে শাসন করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক কৌশল। পরাজিত জমিদার, ভূঁইয়া এবং সামন্তপ্রভুদের তিনি তাঁদের স্ব স্ব এলাকায় বিনা শর্তে ফিরে যেতে অনুমতি প্রদান করেন নি। তাঁদের এলাকা ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনি তাঁদের সৈন্যদেরকে মুগল সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেন এবং রণতরীগুলি বাজেয়াপ্ত করেন। মুগল সৈন্য বাহিনীতে যোগদান করে তাঁদের সমগোত্রীয় জমিদার ও ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হতো। এ রূপেই সযত্ন পরিকল্পনা ও অব্যাহত প্রচেষ্টার দ্বারা ইসলাম খান সাফল্য অর্জন করেন এবং সম্রাট কর্তৃক তাঁর ওপর ন্যস্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।  দাউদ খান কররানীর পতনের বত্রিশ বছর পরেও আকবরের বিখ্যাত সেনাপতিগণ যে কাজ করতে পারেন নি ইসলাম খান পাঁচ বছরের কম সময়েই তা সুসম্পন্ন করেতে সক্ষম হন। এরপর ভূঁইয়া, জমিদার এবং আফগান দলপতিগণ আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন নি। আফগানশক্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং ভূঁইয়া, জমিদার ও স্থানীয় রাজগণ মুগলদের অধীনস্থ জমিদারে পরিণত হন।

ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করা ছিল ইসলাম খানের আরেকটি বড় কৃতিত্ব। ইসলাম খান ছিলেন প্রথম সুবাহদার যিনি মুগলদের সৈন্য ও যুদ্ধ পরিচালনায় পূর্ব বাংলার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এ জন্যই তিনি সে এলাকার কেন্দ্রস্থলে রাজধানী স্থানান্তর করেন। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ইসলাম খানই প্রকৃতপক্ষে মুগলদের জন্য বাংলা জয় করেছিলেন। সমরূপ প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংগঠিত করে তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁকে মুগল সাম্রাজ্যের একজন নির্মাতা এবং বাংলা প্রদেশের শ্রেষ্ঠ্য সুবাহদার হিসেবে গণ্য করা হয়। পাঁচ বছরের সামান্য কিছু বেশি সময় সাফল্যের সঙ্গে বাংলা প্রদেশ শাসন করার পর ইসলাম খান ঢাকা থেকে প্রায় পঁচিশ মাইল উত্তরে ভাওয়ালে ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দের শেষ দিকে পরলোক গমন করেন। প্রথমে তাঁকে ঢাকার বাদশাহী বাগে (পুরাতন হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ) সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর শবাধার ফতেহপুর সিক্রিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাঁর কীর্তিমান পিতামহ শেখ সেলিম চিশতির মাযার-প্রাঙ্গণে এবং তাঁর পাশেই চিরবিশ্রামে শায়িত করা হয়।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি H Beveridge & A Rogers (tr), Tuzuk-i-Jahangiri, 2nd edn, Delhi, 1968; JN Sarkar (ed), History of Bengal, II, Dacca, 1948; Abdul Karim, History of Bengal, Mughal Period, I, Rajshahi, 1992.