কাউন্সিল


কাউন্সিল প্রথমে বাংলা ও পরে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের শীর্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করে। সতেরো ও আঠারো শতকে বাংলায় কোম্পানির ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো থেকে ‘কাউন্সিল’ শব্দটি উদ্ভূত। তখন কাউন্সিলের সাহায্য নিয়ে একজন কর্তাব্যক্তি কোম্পানির কারখানাসমূহ অথবা ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। কর্তাব্যক্তিটির সংবিধিবদ্ধ খেতাব ছিল ‘চীফ অ্যান্ড কাউন্সিল অব ফ্যাক্টরস’। কোনো অঞ্চলের কারখানাসমূহের পুরো সমষ্টিকে ‘সেটেলমেন্ট’ বলা হতো, যার প্রধানকে ‘চীফ’ বলে আখ্যায়িত করা হতো। বোম্বে ও মাদ্রাজের গভর্নরদের অনুকরণ করে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে গভর্নরও বলা হতো। বাংলায় ইংরেজদের ‘সেটেলমেন্ট’ ১৬৯০ সালে হুগলি থেকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়। ১৭০০ সালের সনদ আইনের আওতাধীনে সেটেলমেন্টটিকে প্রেসিডেন্সি ঘোষণা করা হয় এবং কর্তাব্যক্তির পদবি পরিবর্তন করে ‘গভর্নর অ্যান্ড কাউন্সিল অব দি প্রেসিডেন্সি অব দি ফোর্ট উইলিয়ম ইন বেঙ্গল কাউন্সিল’ রাখা হয়। ১৭২৬ ও ১৭৫৩ সালের সনদ আইনসমূহ ফোর্ট উইলিয়ম কাউন্সিলকে কলকাতা শহর ও ফোর্ট উইলিয়মএর অধীন স্থানসমূহের সুশাসনের জন্য উপবিধি ও অধ্যাদেশ প্রবর্তনের ক্ষমতা প্রদান করে। ১৭৫৩ সালের সনদ আইন গভর্নর ও কাউন্সিলকে অসামরিক ও সামরিক উভয় প্রকার ক্ষমতায় বিভূষিত করে।

১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট-এর ক্ষমতাবলে বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনকল্পে প্রণীত এ কাউন্সিল ব্যবস্থা সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তরিত হয়। এ আইনের মাধ্যমে প্রাক্তন ‘গভর্নর ও কাউন্সিল’ পুনঃনামকরণ করা হয় ‘বাংলায় ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর জেনারেল ও কাউন্সিল’। গভর্নর জেনারেল ও পার্লামেন্ট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য চারজন সদস্য নিয়ে কাউন্সিল গঠিত হতো। কাউন্সিলকে একটি সমষ্টিগত কর্তৃত্বে পরিণত করা হয় এ অর্থে যে, পরিষদের সকল সিদ্ধান্ত সদস্যদের সংখ্যগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে গৃহীত হতে হবে। যা হোক, গভর্নর জেনারেলের নির্ধারক ভোট (casting vote) প্রদানের বিশেষ সুবিধা ছিল, যদি কখনও সভাপতিসহ পরিষদের সদস্যবৃন্দ কোনো আলোচ্য ব্যাপারে সম-সংখ্যায় বিভক্ত হয়ে যেতেন। এ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিটি স্বচ্ছন্দভাবে কাজ করে নি। ওয়ারেন হেস্টিংস-এর প্রশাসন কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যের অসহযোগিতার কারণে বিপর্যস্ত হয়। ঔপনিবেশিক রাজ্য শাসনের ব্যাপারে এ রকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পার্লামেন্ট একটি বিপজ্জনক ত্রুটি বলে উপলব্ধি করে। ১৭৮৪ সালের পিট-এর ভারত আইন আইনের আওতাধীনে কাউন্সিলের সদস্যবৃন্দের ক্ষমতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয় এবং গভর্নর জেনারেলকে কাউন্সিলের সদস্যদের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়। ওই সময় কাউন্সিলের নতুন খেতাব দেওয়া হয় ‘গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিল অব দি ফোর্ট উইলিয়ম ইন বেঙ্গল’। ভারতে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাধ্যক্ষ পদাধিকার বলে কাউন্সিলের একজন সদস্য হন। কাউন্সিলের সাংবিধানিক উপাধি ১৮৩৩ সালে আবার পরিবর্তিত হয় যখন এর নামকরণ করা হয় ‘গভর্নর জেনারেল অব ইন্ডিয়া ইন কাউন্সিল’।

কাউন্সিলের এ নামকরণ ১৮৫৮ সালে কোম্পানির শাসনের অবসান পর্যন্ত চলতে থাকে। ১৮৫৮ সালের ভারত সরকার আইনের ক্ষমতাবলে কোম্পানির ভারত শাসনের অধিকার পার্লামেন্টে ব্রিটিশ নৃপতির নিকট চলে যায় এবং তখন থেকে ভারতে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য দুটি পরিষদ গঠন করা হয় একটি লন্ডনে, অন্যটি কলকাতায়। প্রথমটি ছিল ‘কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’, যাতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন পার্লামেন্ট কর্তৃক মনোনীত পনেরো জন সদস্য এবং যার প্রধান ছিলেন মন্ত্রিসভার একজন সদস্য, যার উপাধি দেওয়া হয় ‘সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া ইন কাউন্সিল’। অন্যটিকে অভিহিত করা হয় ‘ভারতের গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিল’ হিসেবে। ১৮৬১ সালের কাউন্সিল আইন পাসের পর থেকে বাংলা এবং ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের ক্রম যাত্রা শুরু হয়। এ আইনের মাধ্যমে বাংলা একটি ‘লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ লাভ করে যা ১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতাধীনে শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ আইন প্রণয়নকারী অঙ্গ-সংগঠনে প্রসারিত হয়। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী বঙ্গীয় আইন প্রণয়নকারী পরিষদের দুটি কক্ষ ছিল যার উচ্চ কক্ষটিকে বলা হতো ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ এবং নিম্ন কক্ষটিকে ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে কাউন্সিল ব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে। [সিরাজুল ইসলাম]