ওসমান, শওকত


শওকত ওসমান

ওসমান, শওকত (১৯১৭-১৯৯৮)  কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান; ‘শওকত ওসমান’ তাঁর সাহিত্যিক নাম।

শওকত ওসমান কলকাতার আলীয়া মাদ্রাসা থেকে প্রবেশিকা (১৯৩৩), সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে আইএ (১৯৩৬) ও বিএ (১৯৩৯) এবং  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ (১৯৪১) পাস করেন। আই.এ পাস করার পর তিনি কিছুদিন কলকাতা করপোরেশন এবং বাংলা সরকারের তথ্য বিভাগে চাকরি করেন। এম.এ পাস করার পর তিনি গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজে (১৯৪১) লেকচারার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ অব কমার্স-এ যোগ দেন এবং ১৯৫৯ সাল থেকে ঢাকা কলেজে অধ্যাপনা করে ১৯৭২ সালে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। চাকরি জীবনের প্রথমদিকে স্বল্পসময় তিনি কৃষক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।

উপন্যাস ও গল্প রচয়িতা হিসেবেই শওকত ওসমানের মুখ্য পরিচয়; তবে প্রবন্ধ, নাটক, রম্যরচনা, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ গ্রন্থও তিনি রচনা করেছেন। বিদেশি ভাষার অনেক উপন্যাস,  ছোটগল্প ও নাটক তিনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। গ্রন্থ সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো: উপন্যাস জননী (১৯৫৮), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৯৬৭), চৌরসন্ধি (১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩), আর্তনাদ (১৯৮৫), রাজপুরুষ (১৯৯২); গল্পগ্রন্থ  জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প (১৯৫২), মনিব ও তাহার কুকুর (১৯৮৬), ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৯০); প্রবন্ধগ্রন্থ ভাব ভাষা ভাবনা (১৯৭৪), সংস্কৃতির চড়াই উৎরাই (১৯৮৫), মুসলিম মানসের রূপান্তর (১৯৮৬); নাটক আমলার মামলা (১৯৪৯), পূর্ণ স্বাধীনতা চূর্ণ স্বাধীনতা (১৯৯০); শিশুতোষ গ্রন্থ ওটেন সাহেবের বাংলো (১৯৪৪), মস্কুইটোফোন (১৯৫৭), ক্ষুদে সোশালিস্ট (১৯৭৩), পঞ্চসঙ্গী (১৯৮৭); রম্যরচনা নিজস্ব সংবাদদাতা প্রেরিত (১৯৮২) ইত্যাদি।

তাঁর জননী ও ক্রীতদাসের হাসি উপন্যাস দুটি প্রশংসিত হয়েছে। জননীতে সামাজিক জীবন ও ক্রীতদাসের হাসিতে রাজনৈতিক জীবনের কিছু অন্ধকার দিক উন্মোচিত হয়েছে। প্রাচীন কাহিনী, ঘটনা ও চরিত্রের রূপকে লেখক সমকালীন রাজনীতিতে স্বৈরাচারী চরিত্র ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছেন। জননীতে গ্রাম ও নগরজীবনের সংঘাতে একটি পরিবারের বিপর্যস্ত অবস্থার বিবরণ আছে। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত নেকড়ে অরণ্য গ্রন্থে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলার নরনারীর নির্যাতনের করুণ বিবরণ আছে।

শওকত ওসমানের স্মৃতিকথামূলক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: স্বজন সংগ্রাম (১৯৮৬), কালরাত্রি খন্ডচিত্র (১৯৮৬), অনেক কথন (১৯৯১), গুড বাই জাস্টিস মাসুদ (১৯৯৩), মুজিবনগর (১৯৯৩), অস্তিত্বের সঙ্গে সংলাপ (১৯৯৪), সোদরের খোঁজে স্বদেশের সন্ধানে (১৯৯৫), মৌলবাদের আগুন নিয়ে খেলা (১৯৯৬), আর এক ধারাভাষ্য (১৯৯৬) ইত্যাদি। স্বজন সংগ্রামে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-সংগ্রামের অনেক কথা বর্ণিত হয়েছে।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অনূদিত গ্রন্থ: নিশো (১৯৪৮-৪৯), লুকনিতশি (১৯৪৮), বাগদাদের কবি (১৯৫৩), টাইম মেশিন (১৯৫৯), পাঁচটি কাহিনী (লিও টলস্টয়, ১৯৫৯), স্পেনের ছোটগল্প (১৯৬৫), পাঁচটি নাটক (মলিয়ার, ১৯৭২), ডাক্তার আব্দুল্লাহর কারখানা (১৯৭৩), পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মানুষ (১৯৮৫), সন্তানের স্বীকারোক্তি (১৯৮৫) ইত্যাদি।

সাহিত্য ও সংস্কুতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৩), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭)-এ ভূষিত হন। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।  [সৈয়দ আজিজুল হক]