ওলী


ওলী  আল্লাহর নিকটতম ঈমানদার ব্যক্তি এবং মুমিনদের বন্ধু। যিনি আল্লাহভীরু এবং আল্লাহর উপদেশ-নির্দেশ যথাযথভাবে মেনে চলেন তিনিই ওলী। ওলী হওয়ার জন্য প্রয়োজন ঈমান, অত্যধিক সৎকাজ ও নফল ইবাদত। সাধনার দ্বারা পুরুষের ন্যায় স্ত্রীলোকও ওলী হতে পারে।

সুফিবাদে ওলী বলতে শুধু কামিল ওলীকেই বোঝায়, যদিও ওলীদের মর্যাদার তারতম্য আছে। সুফিদের মতে ওলী হতে হলে শরিয়ত ও তরিকত উভয়ের অনুশীলন অপরিহার্য। শরিয়ত ও তরিকত উভয়ই পালন করে যিনি মারিফত ও হকিকত লাভ করেন তিনিই হচ্ছেন ওলী। কোনো কোনো সময় আল্লাহর কৃপায় তাঁর কেরামত (অলৌকিক শক্তি) প্রকাশ পায়, কিন্তু তিনি তা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন। তাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর অন্তরে স্বজ্ঞামূলক জ্ঞান ও বিশেষ অবস্থা আপতিত হয়। এগুলি হলো ওলীর বৈশিষ্ট্য।

সুফিদের বিশ্বাস, আল্লাহ সব সময় পৃথিবীতে ওলী বিরাজমান রাখেন, যদিও তাঁদের ওলীত্ব সর্বদা প্রকাশ পায় না। সব ওলীই নিজেকে প্রকাশ করেন না। কেউ কেউ নিজেকে অজ্ঞাতাবাসে রাখেন। তাঁরা যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, তাঁদের ফয়য-বরকত সর্বদাই পৃথিবীতে বিরাজমান থাকে। তাঁদের ওসিলায় জগদ্বাসীর ওপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়। কোনো কোনো সুফি আরও বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বজগতের আধ্যাত্মিক প্রশাসন ওলীদের ওপরই ন্যস্ত। শরিয়ত অবশ্য সুফিদের এরূপ বিশ্বাসের গুরুত্ব দেয় না।

বিখ্যাত ওলীদের অন্যতম হযরত  শাহ জালাল (র.) (মৃত্যু ১৩৪৪), হযরত  খান জাহান (র.) (মৃত্যু ১৪৪৯) এবং হযরত  শাহ আলী বাগদাদী (র.) (মৃত্যু ১৪৮০)-এর সঙ্গে আরো অনেক ওলী  ইসলাম প্রচারার্থে বাংলাদেশে আগমন করেন। এদের মধ্যে শাহ পরান (র.), শাহ মখদুম (র.), মৌলানা কারামত আলী জৌনপুরী, শাহ সুলতান (র.), শাহ আমানত (র.), গরিবুল্লা শাহ (র.), মোহসীন আওলিয়া (র.), শাহ বদর (র.), শরফুদ্দিন চিশতি (র.), শাহ জামাল (র.) ও আরো অনেকে এদেশে শায়িত। ওলীগণ দেশের বিভিন্ন স্থানে খানকাহ নির্মাণ করে আধ্যাত্মিক সাধনা করেন এবং পাশাপাশি নানাবিধ জনসেবামূলক কাজ ও ইসলাম প্রচার করেন। তাঁদের পবিত্র জীবন ও তাঁদের দ্বারা প্রচারিত ইসলামের সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্ববোধে আকৃষ্ট হয়ে স্থানীয় জনগণ ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁদের নবদীক্ষিত শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই কালক্রমে আধ্যাত্মিকতার উচ্চস্তরে পৌঁছেন এবং কেউ কেউ ওলীর মর্যাদাও লাভ করেন। এভাবে স্থানীয় ও বহিরাগত সুফি ও ওলীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এবং মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় মধ্যযুগের বাংলায় জীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধিত হয়।

বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ওলীদের অধিকাংশই আলেম ও সুফি। তাঁরা সাধারণত চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নক্শবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়া তরিকার অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের আমলের মধ্যে জিকির প্রধান। এ ছাড়া, কাল্ব বা আত্মার উন্নতিকল্পে তাঁরা নির্জনতা, মুরাকাবা, তাওবা, তাওয়াক্কুল ইত্যাদির ওপরও জোর দেন। শরিয়ত অনুশীলনের ওপর তাঁরা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁদের মতে, সব পর্যায়েই শরিয়ত মেনে চলা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের মানুষ সাধারণভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ওলী দুনিয়াতে সব সময়েই বিরাজমান। সব ওলী সমমর্যাদার নন। সর্বশ্রেষ্ঠ ওলী হচ্ছেন গাওছ এবং তাঁর পরে কুতুব। হযরত আবদুল কাদের জিলানী (র.)-কে (মৃত্যু ১১৬৬) এদেশে গাওছুল আজম বা সর্বশ্রেষ্ঠ গাওছ হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়।

ওলীদের কেরামত সত্য- এ বিশ্বাস ইসলামি আকিদার অন্তর্ভুক্ত। এদেশের অনেক ওলী কাশ্ফ-এর অধিকারী এবং তাঁদের একাধিক কেরামত প্রকাশিত।

ওলী যত বড়ই হন না কেন, তাঁর স্থান নবীর পরে। তিনি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাত্র। বিপদে-আপদে আল্লাহর নিকট দোয়া করার জন্য মানুষ তাঁর শরণাপন্ন হয় এবং সুফল কামনা করে। তাঁর ইন্তেকালের পর মানুষ তাঁর কবর জিয়ারত করে। এসব শরিয়তসিদ্ধ আচার-অনুষ্ঠান অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও প্রচলিত আছে। কিন্তু তাঁকে বা তাঁর কবরকে সেজদা করা, তাঁর কবরে ফুল দেওয়া ও বাতি জ্বালানো এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাঁর দরগায় মানত করা- এসব সংস্কার শরিয়তে নিষিদ্ধ হলেও ভাবাবেগে কেউ কেউ করে থাকেন। প্রকৃত ওলীগণ অবশ্য এসব  থেকে ভক্তদের বিরত রাখেন।  [এম.এ কাশেম]