শাহ জালাল (রঃ)


শাহ জালাল (রঃ)  বাংলার একজন প্রখ্যাত সুফি দরবেশ। তাঁর পুরো নাম শায়খ জালালুদ্দীন। তিনি এখনও উপমহাদেশে মুসলিম সমাজে পরম শ্রদ্ধার অধিকারী। তিনি সিলেটে সমাহিত আছেন।

মুসলমানদের সিলেট জয়ের সঙ্গে হজরত শাহ জালাল (রঃ)-এর নাম জড়িত। কিংবদন্তি অনুসারে গৌর গোবিন্দ নামে একজন হিন্দু রাজা সিলেট অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। কথিত আছে যে, বুরহানুদ্দীন নামে একজন মুসলমান তাঁর এলাকায় বাস করতেন। তাঁর পুত্রের আকিকা উপলক্ষে তিনি একটি গরু জবাই করেছিলেন। কিন্তু ঘটনাক্রমে একটি চিল জবাই করা গরুর এক টুকরা মাংস নিয়ে এক ব্রাহ্মণের ঘরে (অন্য এক বিবরণ অনুযায়ী রাজার মন্দিরে) ফেলে। এজন্য রাজার আদেশে শিশুটিকে হত্যা করা হয় এবং বুরহানুদ্দীনের হাত কেটে ফেলা হয়। বুরহানুদ্দীন গৌড়ে গিয়ে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের নিকট বিচার প্রার্থনা করেন। সুলতান তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র সিকান্দর খান গাজীর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী পাঠান। গৌর গোবিন্দ দুবার তাঁকে পরাজিত করেন। এরপর সুলতান তাঁর সিপাহসালার নাসিরুদ্দীনকে যুদ্ধে যেতে নির্দেশ দেন। ঠিক সে সময়েই তিনশত ষাট জন সাথী ও মুরিদ নিয়ে শাহ জালাল (রঃ) বাংলায় আসেন এবং সিলেট অভিযানে মুসলমান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। এবার মুসলমান সৈন্যরা জয়লাভ করে। গৌর গোবিন্দ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং সিলেট মুসলমানদের শাসনাধীন হয়।

হজরত শাহ জালাল (রঃ)-এর সমাধি, সিলেট

লোককাহিনীর ওপর এর ভিত্তি হলেও উপরের এ কাহিনী ঐতিহাসিক সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। রাজা গৌর গোবিন্দ, সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ, সিকান্দর খান গাজী, নাসিরুদ্দীন, শাহ জালাল (রঃ) এঁরা সবাই ঐতিহাসিক ব্যক্তি। এ কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণের সঙ্গে হয়ত কাল্পনিক কাহিনীর মিশ্রণ ঘটেছে, তবে মূল বিষয়টি, অর্থাৎ সিলেট বিজয়ের বিষয়টি সঠিক। সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহ ১৩০১ থেকে ১৩২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন এবং চারদিকেই তাঁর রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে সিলেট বিজয়ের এবং এর সঙ্গে শাহ জালাল (রঃ)-এর সংশ্লিষ্টতার ঐতিহাসিকতা লিপিগত এবং সাহিত্যিক উৎসগুলি দ্বারাও সমর্থিত।

সোনারগাঁওয়ে সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের রাজত্বকালে (১৩৩৮-১৩৪৯ খ্রি) ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন। তিনি ১৩৪৫-৪৬ খ্রিস্টাব্দে শাহ জালাল (রঃ)-এর সঙ্গে তাঁর খানকায় সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং সেখানে তিনদিন অবস্থান করেছিলেন। ইবনে বতুতা এই দরবেশের নাম শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজি রূপে লিপিবদ্ধ করেছেন। অনেক পন্ডিতের মতে, ইবনে বতুতা কুনিয়ায়িকে ‘তাবরিজি’ বলে উল্লেখ করেছেন। কুনিয়ায়ি হচ্ছে শাহ জালাল (রঃ)-এর স্থানিক পরিচিতিমূলক বিশেষণ।

মুসলমানদের প্রথম সিলেট বিজয় এবং সেখানে ইসলামের আবির্ভাব সম্পর্কিত প্রথম এবং গ্রহণযোগ্য তথ্যের উৎস হচ্ছে একটি ফারসি শিলালিপি। এটির তারিখ হচ্ছে ৯১৮ হিজরি/১৫১২ খ্রিস্টাব্দ এবং এটি সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৯৪-১৫১৯ খ্রি) উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। এ শিলালিপি অনুসারে শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে সিকান্দর শাহ গাজী ৭০৩ হিজরি/১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম সিলেট জয় করেন। শিলালিপিটি শায়খ জালাল মুজাররদ ইবন মুহম্মদের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। এ শিলালিপিটি ঘটনার দুশ বছরের সামান্য পরে উৎকীর্ণ করা হলেও এটি ঘটনার নির্ভুল তারিখ প্রদান করে।

হজরত শাহ জালাল (রঃ) ও তাঁর সঙ্গীদের সিলেট বিজয়ের বিবরণ গওছীর গুলজার-ই-আবরার  গ্রন্থে পাওয়া যায় যা ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। শায়খ আলী শের কর্তৃক লিখিত একটি পূর্বতন গ্রন্থ শরহ্-ই-নুজহাত-উল-আরওয়া থেকে নেওয়া উপাদানের সাহায্যে এটি লেখা হয়েছিল। শায়খ আলী শের ছিলেন শায়খ নূরুল হুদা আবুল কারামতের বংশধর। শেষোক্ত ব্যক্তি ছিলেন শাহ জালাল (রঃ)-এর সঙ্গী এবং তিনি সিলেট বিজয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই উৎস অনুসারে শায়খ জালালুদ্দীন মুজাররদ ছিলেন তুর্কিস্তানে জন্মগ্রহণকারী সিলেটের অধিবাসী এবং তিনি ছিলেন সুলতান সাইয়্যদ আহমদ ইয়াসাভীর খলিফা। পীরের অনুমতি নিয়ে তিনি তাঁর সাতশ সঙ্গী সহ জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য ভারতে আসেন এবং বাংলায় পৌঁছার সময় তাঁর সঙ্গে তিনশত ষাট জন সঙ্গী ছিল। তাঁরা সিলেটের রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। গৌর গোবিন্দ পালিয়ে যান এবং সিলেটের আশেপাশের এলাকা বিজয়ীদের দখলে আসে। শাহ জালাল (রঃ) তাঁর শিষ্যদের মধ্যে বিজিত অঞ্চল ভাগ করে দেন। তিনি তাঁদের বিয়ে করতে অনুমতি দান করেন, তবে তিনি নিজে কুমার থাকেন। এই উৎসে সিলেট বিজয়ের কৃতিত্ব শাহ জালাল (রঃ) ও তাঁর শিষ্যদের দেওয়া হয়েছে। এতে শাসনকারী রাজা বা তাঁর সেনাপতিদের কোন উল্লেখ নেই।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে নাসিরুদ্দীন হায়দার ফারসিতে শাহ জালাল (রঃ)-এর জীবনী সুহায়ল-ই-ইয়ামান লিখেছিলেন। দরবেশের দরগাহে রক্ষিত দুটি ফারসি পান্ডুলিপির (১৭১১ খ্রিস্টাব্দে রচিত মুহ্য়ুদ্দীন খাদিমের রিসালাত এবং ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে এক অজ্ঞাত লেখক রচিত রওজাত-উস-সালাতীন) ওপর ভিত্তি করে তিনি এ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। শাহ জালাল (রঃ)-এর পিতার নাম মুহম্মদ এবং তিনি ছিলেন ইয়ামনের একজন সুফী। বাল্যকালে তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে হারান এবং তাঁর মামা সাইয়্যদ আহমদ কবীর, যিনি ছিলেন একজন বড় দরবেশ, তাঁকে লালন-পালন করেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষালাভের পর তিনি তাঁর মামার কাছে আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। শেষোক্ত ব্যক্তি তারপর তাঁকে এক মুঠো মাটি দিয়ে ইসলাম প্রচারের জন্য ভারতে যেতে নির্দেশ দেন। তিনি তাঁকে আরও বলেন যে, যে জায়গায় অনুরূপ রং ও গন্ধযুক্ত মাটি পাওয়া যাবে সে জায়গা পবিত্র এবং তিনি যেন সেখানেই প্রার্থনা ও ধ্যানে তাঁর বাকি জীবন কাটান। পথে শাহ জালাল (রঃ) দিল্লিতে শেখ নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নিজামুদ্দীন আউলিয়া (রঃ) তাঁকে এক জোড়া পায়রা দিয়েছিলেন। এ ধরনের পায়রা এখন সিলেটে শাহ জালালের দরগায় এবং বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায়। এরপর শাহ জালাল বাংলায় চলে আসেন। এ সময় সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের সৈন্যদল সিলেটের রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। শাহ জালাল (রঃ) এবং তাঁর সাথী ও শিষ্যগণ যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধে মুসলমান সেনাবাহিনী জয়লাভ করে। এ গ্রন্থে সিলেট বিজয়ের আলোচনার সঙ্গে দরবেশের কারামতের (অলৌকিক শক্তির) কাহিনীও বর্ণনা করা হয়েছে। বিজয়ের জন্য সৈন্যবাহিনীর শক্তির চেয়ে দরবেশের কারামতকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

কিছুটা সত্যতা এবং কিছুটা কিংবদন্তি ও জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে রচিত গ্রন্থ হলেও সুহায়েল-ই-ইয়ামানকে অনেকদিন পর্যন্ত হজরত শাহ জালাল (রঃ)-এর মানসম্পন্ন জীবনীগ্রন্থ রূপে বিবেচনা করা হতো। এ গ্রন্থানুসারে দরবেশ এসেছিলেন ইয়েমেন থেকে, তবে এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে সিলেটে আবিষ্কৃত একটি শিলালিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, শাহ জালাল (রঃ) ছিলেন কুনিয়ায়ি, অর্থাৎ তিনি এসেছিলেন তুরস্কের কুনিয়া শহর এলাকা থেকে। গওছীর গুলজার-ই-আবরার গ্রন্থেও তাঁকে তুর্কিস্তানি রূপে অভিহিত করা হয়েছে। এ শিলালিপি অনুসারে শাহ জালাল তুরস্ক থেকে এসেছিলেন। শায়খ-উল-মাশাইখ মখদূম শায়খ জালাল মুজাররদ ইবন মুহাম্মদের সম্মানে উৎকীর্ণ আরেকটি শিলালিপিতে বলা হয়েছে যে, সুলতান ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে ৭০৩ হিজরি/১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে সিকান্দর খান গাজী প্রথম সিলেট জয় করেছিলেন। সাক্ষ্যের এই অংশটি গুলজার-ই-আবরার কর্তৃকও সমর্থিত।

সৌভাগ্যক্রমে ইবনে বতুতার ভ্রমণ-রোজনামচায় হজরত শাহ জালাল সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি শায়খকে একজন অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন অতিবৃদ্ধ মহান দরবেশ রূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁকে বলা হয়েছিল যে, দরবেশ বাগদাদে খলিফা  আল-মুস্তাসিম বিল্লাহকে দেখেছিলেন এবং খলিফার হত্যার সময় তিনি সেখানে ছিলেন। পরবর্তীকালে দরবেশের অনুচরবৃন্দ ইবনে বতুতাকে বলেছিলেন যে, দরবেশ ১৫০ বছর পরিণত বয়সে ইন্তেকাল করেছিলেন। তিনি প্রায় সারা বছরই রোজা রাখতেন। তিনি সারারাত নামায পড়তেন। তিনি ছিলেন শীর্ণ, লম্বা এবং তাঁর সামান্য দাড়ি ছিল। এই পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাগণ তাঁর কাছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল।

ইবনে বতুতা এই দরবেশের কিছু কারামতও বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে, পরের বছর বেইজিং-এ থাকা কালে তিনি দরবেশের মৃত্যুসংবাদ শুনতে পেয়েছিলেন। আধুনিক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন ১৩৪৫-১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে। সুতরাং শায়খের মৃত্যু তারিখ ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে নির্ধারণ করা যায়। তিনি ছিলেন সায়্যিদ আহমদ য়াসাভির শিষ্য এবং সুফীদের নকশবন্দিয়া তরিকার লোক। মঙ্গল আক্রমণের পরবর্তী বিশৃঙ্খল দিনগুলিতে তাঁর গুরু এবং সঙ্গীগণ দুঃখ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন যাপন করতেন।

তিনি শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন ইবনে বতুতার এই স্পষ্ট বর্ণনা বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আধুনিক কিছু পন্ডিত মনে করেন যে, দুজন জালালই (শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজি এবং সিলেটের শাহ জালাল) এক ও অভিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে তাঁরা ছিলেন দুজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি। দুজনই ছিলেন বড় দরবেশ, বাংলার মানুষের উপর দুজনই বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তবে তাঁদের কর্মক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজির নাম মালদহের (পশ্চিমবঙ্গ) পান্ডুয়া ও দেওতলার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু শাহ জালালের নাম সিলেটের (পূর্ববঙ্গ) সঙ্গে জড়িত। তাঁদের সময়কালও ভিন্ন। শেখ জালালুদ্দীন তাবরিজি সিলেটের শাহ জালালের চেয়ে কমপক্ষে এক শতক আগে সক্রিয়ভাবে বর্তমান ছিলেন। প্রথমোক্ত ব্যক্তি ছিলেন সুলতান শামসুদ্দীন ইলতুৎমিশ (মৃত্যু ১২৩৬ খ্রি.), দিল্লির শেখ কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকি (মৃত্যু ১২৩৫ খ্রি.) এবং মুলতানের শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার (মৃত্যু ১২৬২ খ্রি.) সমসাময়িক। দরবেশদের জীবনীমূলক সাহিত্য অনুসারে জালালুদ্দীন তাবরিজি ১২২৬ অথবা ১২৪৪  খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেছিলেন। কাজেই শেষোক্ত তারিখটি মেনে নিলেও তিনি শাহজালালের মৃত্যুর ১০৩ বছর আগে ইন্তেকাল করেছিলেন।

এখনও বহু মানুষ রোজ শাহ জালাল (রঃ)-এর মাজার জিয়ারত করেন। তাঁর কবরটি অস্বাভাবিকরকম বড় (বাংলার মানুষের আকৃতির তুলনায়) এবং এটা ইবনে বতুতার সাক্ষ্যকে সমর্থন করে।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  HAR Gibb, Ibn Battuta: Travels in Asia and Africa, London 1928; Gulzar-i-Abrar of Ghausi, Journal of the Asiatic Society of Pakistan, II, 1959; Muhammad Enamul Haq, A History of Sufism in Bengal, Dhaka 1975; Abdul Karim, Social History of the Muslim in Bengal, (2nd ed), Chittagong 1985.