শিল্পোদ্যোগ

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২৩:০৩, ৪ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
(পরিবর্তন) ← পূর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ → (পরিবর্তন)

শিল্পোদ্যোগ  উৎপাদন প্রক্রিয়া ও অথনৈতিক উন্নয়নের প্রধান উপাদান। শিল্পোদ্যোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক কার্যাবলীকে নির্দেশ করে। অধ্যাপক ই.ই হ্যাগেন শিল্পোদ্যোগের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, এর কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি, নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান সংগঠন, মূলধন সংগ্রহ, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংস্থান, নতুন উৎপাদন কৌশল এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবন কাঁচামালের নতুন উৎস সন্ধান এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যাবলী পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক নির্বাচন করা। বস্তুত শিল্পোদ্যোগ একজন ব্যক্তির এমন কর্মদ্যোগ ও গুণাবলীকে বুঝায় যা তাকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শুরু এবং সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি বহন করে সাফল্যের দ্বারে পৌঁছাতে সাহয্য করে। যে ব্যক্তি এসব কাজ যথার্থভাবে সম্পাদন করতে পারেন তিনিই শিল্পোদ্যোক্তা। শিল্পোদ্যোক্তার উদ্যোগী কর্ম প্রচেষ্টার সৃষ্ট ফল একটি প্রতিষ্ঠান/সংগঠন এবং পণ্য অথবা সেবা। শিল্পোদ্যোক্তার সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানটির আইনগত সংগঠন হতে পারে একক মালিকানা, অংশীদারী ব্যবসা এবং যৌথ মালিকানা কোম্পানি। একক মালিকানা ব্যবসার ক্ষেত্রে মালিক নিজেই ঝুঁকি বহন করে এবং ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু অংশীদারী ব্যবসা এবং যৌথ মালিকানা কোম্পানির ক্ষেত্রে এসব কাজ যথাক্রমে অংশীদার এবং শেয়ার মালিকের মধ্যে বণ্টিত থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশেষ করে শিল্পায়নে শিল্পোদ্যোক্তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোগ বিকাশের ইতিহাস অতি প্রাচীন। দূরাতীত কালেও বাংলায় নানা ধরনের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানে সমৃদ্ধ ছিল এবং ব্যবসাবাণিজ্যে বেশ উন্নত ছিল। বাংলার পুরানো শিল্পের মধ্যে ছিল সূক্ষ্ম মসলিন, চিনি, লবণ ইত্যাদির উৎপাদন। দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপে এসব পণ্য বহুল পরিমাণে রপ্তানি হতো। ভারতের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। ফলে বাংলার শিল্প বিকাশের পথ সুগম হয়। আরব দেশসমূহ থেকে আগত অনেক ব্যবসায়ী বাংলায় বিভিন্ন ধরনের কারবার হাতে তুলে নেয়। আবার তারা পাশ্চাত্যের জনগণের সঙ্গে মিলেমিশেই ব্যবসা পরিচালনার নীতি অনুসরণ করায় স্থানীয় জনগণও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিকাশে তথা শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে।

প্রাক্-মুগল মুসলিম বাংলায়, বিশেষ করে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকায় একটি শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণি গড়ে ওঠে। হস্তশিল্প, তাঁতের কাজ, দুগ্ধজাত পণ্য বানানো, অলংকার নির্মাণ ইত্যাদিতে তাদের নিপুন দক্ষতা ছিল। রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করার পর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে যায়। বাণিজ্যিকভাবে ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয় এবং সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও শিল্পোদ্যোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এ সময়ে ইউরোপীয়, বিশেষ করে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ব্রিটিশ এবং ফরাসি ব্যবসায়ীরা অধিক সংখ্যায় ঢাকা আসতে শুরু করে। দিল্লির মুগল বাদশাহদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার মসলিন শিল্প নতুন উদ্যমে বিকশিত হয়ে ওঠে। মসলিন ছাড়া সোনা, রুপা বা রেশমি সুতায় বোনা জমিন ও পাড়ের সাধারণ বা ফুলেল ডিজাইনের জামদানি শাড়িও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এসব বস্ত্র হেজাজ, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও দিল্লিতে বাজার লাভ করে। এ সময়ে বিকশিত অন্যান্য শিল্পের মধ্যে ছিল সোনা ও রুপার কাজ, হাড়ের চিরুনি ও বোতাম বানানো, শাঁখা ও লাক্ষাশিল্প, ট্যানারি এবং কাগজ তৈরি।

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে শিল্পোদ্যোগের কিছু নতুন ধারার সূচনা হয়। নিজেদের দেশে রপ্তানি করে পাঠানোর লক্ষ্যে ব্রিটিশরা ভারতে সস্তায় যা কিছু উৎপাদন করা যায় প্রয়োজনে নিপীড়নমূলক পথ ব্যবহার করে হলেও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সেসব উৎপাদনে বাধ্য করে। বাংলায় নিপীড়নের মাত্রা খুব বেশি ছিল বলে এ অঞ্চলে  উদ্যোক্তা-বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আগে সমুদ্রে পথে ভারত আসতে ব্রিটিশদের সময় লাগত ১০০ দিন, সুয়েজ খাল খুলে দিলে এই সময় দাঁড়ায় মাত্র ২৫ দিন। এই সুবিধা এবং ইংল্যান্ডে সংঘটিত শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটিশরা ভারতে তাদের বাণিজ্য নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। নতুন নীতিতে তারা ব্রিটেন থেকে নানা ধরনের পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল ভারতে আমদানি শুরু করে। উদ্দেশ্য, স্থানীয় সস্তা শ্রমিক এবং উৎপাদনের অন্যান্য সকল খাতে সাশ্রয়ী ব্যয়ের সুবিধা নিয়ে এখানে তৈরি পণ্য ইংল্যান্ডে পুনঃরপ্তানি করা। ব্রিটিশরা সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহ আর উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন করে দেশীয় বাজার থেকে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় হটিয়ে দেয়। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার দেশীয় বাজারে বিদেশি পুঁজির আগমন উৎসাহিতকরণের অজুহাতে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য অধিক হারে কর আরোপ করেও তাদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার যে মানসিকতা পোষণ করত তার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশরাও মুসলিমদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখার কৌশল গ্রহণ করে। এসব কারণে ব্রিটিশ আমলে বাংলায় দেশীয় উদ্যোক্তাগোষ্ঠীর বিকাশ ব্যাহত হয়। এর ফলে শিল্পোদ্যোগের পরিব্যাপ্তিতে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয় তা পূরণে ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলের অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে আসে। অবশ্য এদের তৎপরতা ছিল মূলত কলকাতা-কেন্দ্রিক এবং এই সময়ে বাংলায় শিল্পোদ্যোগ বিকাশে যেটুকু অগ্রগতি সাধিত হয় তৎকালীন বাংলা এলাকা তার ছিটেফোঁটা মাত্র পায়।

উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় মূলত জমি কেনাবেচা ও অবাণিজ্যিক খাতে মূলধনের ব্যবহার বেশি হয়। পরিবহণ, বিশেষ করে রেলপথ ও শিপিং লাইনের বিকাশ এবং মুদ্রা অর্থনীতির ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় জমিতে বিনিয়োগ লাভজনক হয়ে ওঠে। নানা পেশা ও চাকরিতে নিয়োজিত বাঙালি লোকজন তাদের বেতন ও অন্যান্য  আয় থেকে সঞ্চিত উদ্বৃত্ত ভূসম্পত্তিতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হয়। বিনিয়োগের এই নতুন ধারা শিল্পোদ্যোগ বিকাশকে ঠেকিয়ে রাখে। অবশ্য বাঙালিদের মূলধনও ছিল আধুনিক শিল্পোদ্যাগ গড়ে তোলার জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। সে সময় বেসরকারি উদ্যোগকে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারি অর্থসংস্থানের ধারণাও অচেনা ছিল। ফলে প্রাথমিক পুঁজির জন্য বাঙালি উদ্যোক্তাদের বিদ্যমান সীমিত পুঁজিবাজার থেকে অথবা চড়া সুদে অপ্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হতো। মাড়ওয়ারিরাই ছিল মহাজনি ঋণের প্রধান উৎস। তবে বাঙালি উদ্যোক্তরা এদের তেমন সহযোগিতা পেত না। বাংলার ব্যবসায়ীমহল বড় পুঁজির সঙ্কটে এবং অনেকটা সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনার অভাবে বা সাংস্কৃতিক জাড্যতার কারণে শিল্প গড়ার চেয়ে ট্রেডিং তথা কেনা-বেচার ব্যবসাতেই বেশি আগ্রহী ছিল। বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারক আমলাগোষ্ঠীও উদ্যোক্তাবিকাশের এজাতীয় সমস্যা সমাধানে কোন কার্যকর ভূমিকা রাখে নি।

১৯৪৭-এ ভারত বিভাগের পর ঐতিহাসিক কারণেই পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল কোন অভিজ্ঞ শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণি লাভ করে নি। আবার এই অঞ্চল শিল্পোদ্যোগ বিকাশ সম্পর্কিত তৎপরতা লাভেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের যথাযথ মনোযোগ ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের আনুকূল্য ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি। এসব বিরূপ পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান শিল্পোদ্যোগ বিকাশে বেশ পিছিয়ে পড়ে, যদিও পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন (ইপিআইডিসি) বাঙ্গালি উদ্যোক্তাদের সাথে নিয়ে দেশের কোন কোন শিল্পখাতে বিশেষ করে পাট শিল্পে কিছু সংখ্যক কারখানা গড়ে তুলে এবং পরে এগুলির মালিকানা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করে। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের সাহায্য দিয়ে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নে ভুমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোগ বিকাশে সামান্য হলেও কিছুটা অবদান রাখে।

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। যুদ্ধের সময় অনেক কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সড়ক ও রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, টেলিফোন সংযোগ, গ্যাস পাইপলাইনসহ অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়ে যায়। যুদ্ধশেষে বহু কল-কারখানা ও ব্যাংক পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এবং সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে দেশ স্বাধীন হবার পরপরই এগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানায় চলে যায়। তবে তিন-চার বছর সময়ের মধ্যেই সরকারি নীতির ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটে এবং শিল্পখাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ভূমিকার ওপর যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বিলগ্নীকরণ ও বিরাষ্ট্রীয়করণের সুবাদে বাঙালি উদ্যোক্তারা অনেক বড়, মাঝারি এবং ছোট শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা অর্জন করে। তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রকৃতি ও ধরন প্রায় অপরিবর্তিতই রয়ে যায়, ব্যাপ্তিতেও থেকে যায় বিশাল। ফলে বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশির রাষ্ট্রীয় শিল্পোদ্যোগের বিকাশ ঘটে। সরকার অবশ্য বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতিতে এবং একই সঙ্গে মুদ্রা ও বিনিময়হার নীতিতে কিছু পরিবর্তন আনে। এসব পরিবর্তনের ফলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ অনেক শিথিল হয়, দেশীয় শিল্পের সংরক্ষণ মাত্রা হ্রাস পায়, সম্পদ আবণ্টনে কিছুটা দক্ষতা আসে এবং দেশীয় শিল্পসমূহের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে অনেক অর্থনৈতিক সংস্কার সূচিত হয়েছে, যেগুলি উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করছে, তারা ব্যবসায়ের নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন বছরে গৃহীত শিল্পনীতিসমূহ দেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা বিকাশকে উৎসাহিত করেছে। আমদানি নীতি, রাজস্ব নীতি ও কর নীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থানীয় এবং বিদেশি পুঁজির বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাণিজ্য উদারীকরণ ও বিনিয়োগ নীতির সংস্কার সাধন করা হয়েছে।

প্রথম দিকে বাংলাদেশে শেয়ার বাজার ছিল না বলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ মেয়াদি ঋণ মূলধনের প্রধান উৎস ছিল। বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা (বিএসআরএস), বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ সংস্থা (আইসিবি)। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ এবং অনেক বেসরকারি ব্যাংকও শিল্প অর্থসংস্থানে এগিয়ে আসছে। শেয়ার বাজার থেকে ও অনেক উদ্যোক্তা মূলধন সংগ্রহ করছেন। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক এবং বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা একত্রিত করে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড গঠন পূর্ব পর্যন্ত যথাক্রমে ১৮৪২টি ও ৬২৫টি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য মেয়াদি ঋণ দেয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ সংস্থা এ পর্যন্ত ৪৯৭টি প্রকল্প/পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে অবলিখন, সেতু অর্থায়ন, সম-মূলধন অর্থায়ন এবং ডিবেঞ্চার অর্থায়নের সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোশেন (বিসিক) ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উন্নয়নের চাহিদা শক্তি হিসাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা ও বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে। বিসিক-এর শিল্পনগরী কর্মসূচি এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) কর্তৃপক্ষ উদ্যোক্তাদেরকে অবকাঠামোগত সুবিধাসহ, উন্নত শিল্প প্লট দিয়ে শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নের গতিকে তরান্বিত করছে।

বাংলাদেশে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠিত কোন কোন বড় কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে। এ কাজে তারা নিজ নিজ পুরানো অভিজ্ঞতাকে প্রধান সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং এ কারণে এগুলির অধিকাংশই যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। তৈরি পোশাক শিল্প, খাদ্য ও ময়দা প্রক্রিয়াজাত খাতে এ জাতীয় নতুন শিল্পোদ্যোগের নজির অনেক।

সময় অতিক্রমের সাথে ব্যবসার নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং নীতিগত সমর্থন ও উৎসাহমূলক পদক্ষেপসহ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠাপোষকতা বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোগ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সমাজের একটি শ্রেণি, বিশেষ করে বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিবর্গ যেমন: সেনা কর্মকর্তা, সরকারি আমলা, ব্যাংকার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক ও ঠিকাদারদের অনেকে রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে ব্যবসায়িক সুযোগ ব্যবহার করে সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন।

বাংলাদেশে ধোলাই খাল-এ শিল্পোদ্যোগ বিকাশের ঘটনাটি কতিপয় দেশে শিল্পবিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে, যেমন জাপান, হংকং বা তাইওয়ানে যে জাতীয় অনুকরণমূখী শিল্পের অগ্রগতি ঘটেছিল অনেকটা তারই অনুরূপ। আজকের দিনে এসব উন্নত দেশে এ জাতীয় শিল্পোদ্যোগই ক্রমান্বয়ে দেশীয় প্রযুক্তির চুড়ান্ত বিকাশ ঘটায় এবং রাষ্ট্রীয় আনুকুল্যে তা থেকেই নতুন শিল্পোদ্যোক্তা শ্রেণীর সৃষ্টি করে। পুরানো ঢাকার ধোলাই খাল এলাকা প্রকৌশলী কর্মশালাগুলি বিদেশ থেকে আমদানি করা অনেক কিছু নকল করে উৎপাদনে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। তবে এসব শিল্পোদ্যোগের অধিকাংশই নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উৎপাদন কাজ চালাচ্ছে। এসব কারখানার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, শ্রমিক-কর্মচারীদের যথাযথ কারিগরি দক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণেরও তেমন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া আছে তহবিলের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় জায়গার অভাব, ডিজাইন বা নমুনার দুষ্প্রাপ্যতা ইত্যাদি সমস্যা।

ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ইত্যাদি অনেক দেশে উপ-ঠিকাদারি ব্যবস্থা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের বিকাশে একটি বিশেষ ও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশে প্রথম পাঁচসালা পকিল্পনার সময়েই (১৯৭৩-৭৮) উপ-ঠিকাদার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন ঘটে আর পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন মেয়াদে (১৯৯৭-২০০২) বৃহৎ, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সম্মুখ ও পশ্চাত-অন্বয়ী উৎপাদান এবং উপ-ঠিকাদারী ব্যবস্থার বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। দেশে উপ-ঠিকাদারী ব্যবস্থার উন্নয়ন ত্বরান্বিতকরণের জন্য উপযোগী অনেক নীতি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়। তবে বহুজাতিক বাটা সু-কোম্পানি এবং বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানির মতো বড় কিছু প্রতিষ্ঠানে শুধু উপ-ঠিকাদারী মোটামুটি কার্যকরভাবে চালু হয়েছে। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাতের প্রতিষ্ঠানসমূহ এখনও এটিতে অভ্যন্ত হয়ে ওঠে নি। কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করার মানসিকতা আর রাজস্ব নীতিতে বেশ কিছু গরমিলও এই ব্যবস্থার বিকাশকে ব্যাহত করেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপের অনেক দেশ, জাপান, ভারত, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশের অনুকরণে বাংলাদেশেও শিক্ষিত যুবক ও মহিলাদের শিল্পোদ্যোগ উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা ব্যবস্থা স্নাতকপূর্ব ও স্নাতকোত্তর এবং টেকনিক্যাল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠক্রমে একটি পৃথক বিষয় হিসেবে শিল্পোদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সীমিত হলেও এই ব্যবস্থা শিক্ষিত তরুণ সমাজকে শিল্পোদ্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদেরকে শিল্পোদ্যোগ পেশা গ্রহণে অনুপ্রাণিত করছে।

বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের অসামান্য উন্নয়নের মূলে রয়েছে বেসরকারি খাতে এই শিল্প স্থাপন ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত ভূমিকা। বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্যসংখ্যা ১৯৭৮ সালে ১ থেকে বর্তমান (২০১০) সময় পর্যন্ত ৫০০০ উন্নীত হওয়া এ শিল্পের লক্ষণীয় প্রবৃদ্ধিই প্রমাণ। এ শিল্পের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই পরিবারভিত্তিক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে গঠিত যার ফলে এদেশে গোষ্ঠীগত শিল্পোদ্যোগ ধারণার বিকাশ লাভ করেছে। এ ধারণার প্রধান শিল্পোদ্যোক্তার সাথে পরিবারে অন্যান্য সদস্যরা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের মাধ্যমে শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

বাংলাদেশের শিল্পদ্যোক্তা উন্নয়নের ইতিহাসে একটি ইতিবাচক দিক হলো পরিবারের চার দেয়ালের গন্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নারীদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। শুরুর দিকে নারীরা গৃহস্থলি কাজের অতিরিক্ত কাজ যেমন: ফাস্টফুড, বুটিকশপ এবং বিউটি, দুগ্ধজাত দ্রব্যাদির মত ক্ষুদ্র ব্যবসার বিউটি পার্লারের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মধ্যে সীমিত রাখলেও আজকাল নারীরা অনেক অভিজাত এবং চ্যালেঞ্জিং শিল্প কর্মকান্ডে নিজেদেরকে অন্তর্ভূক্ত করছে এবং সফলতার সাথেই পুরুষের মতই শিল্পোদ্যোগ দক্ষতা প্রদর্শন করছে। আর এইক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গৃহীত শিল্পনীতিমালা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও শিল্পোদ্যোগী করে তুলতে সাহায্য করছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোগ উন্নয়ন ধারায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে পল্লী শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নের বিকাশ। পল্লী অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তার লাভ, কর্মসংস্থানের বিকল্প উপায়ের অভাব, পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি, উন্নত যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে উদ্যোগগুণাবলী সম্পন্ন যুব সমাজ আজ হাঁস-মুরগির খামার ও দুগ্ধজাত খামারের মতো ছোট শিল্প স্থাপন করে জীবিকার পথ বেঁছে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়া পল্রী শিল্প উদ্যোগ উন্নয়নের পথ ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কৌশলগত একটি লক্ষ্য হচ্ছে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন শুধুমাত্র দেশের শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নের গতি বৃদ্ধির সাথে সাথে একটি দক্ষ উদ্যোক্তা শ্রেণি গঠনের মাধ্যমে সম্ভব। বর্তমান শিল্পনীতিমালায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দান এবং অন্যান্য উৎসাহমূলক সাহায্য ও সহযোগিতাসহ অনুকুল পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের পর্যাপ্ততা, সস্তা শ্রম, পণ্য ও সেবার চাহিদা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি শিল্পোদ্যাগ গুণাবলীসম্পন্ন মানব সম্পদের উপস্থিতির প্রেক্ষিতে দেশে সম্ভাবনাময় শিল্পোদ্যোগ প্রবৃদ্ধির পথ প্রসারিত হয়েছে।  [এ.এইচ.এম হাবিবুর রহমান]