হিন্দু আইন


হিন্দু আইন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস ও জীবন-যাপন প্রণালীকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন কতিপয় বিধিবিধান, প্রথা ও আচরণবিধির সমাহার। হিন্দু আইন দুটি ধারায় বিভক্ত: দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা। দায়ভাগের রচয়িতা বাঙালি স্মৃতিকার জীমূতবাহন। প্রধানত যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি অনুসারে সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম বিষয় অবলম্বনে দায়ভাগ রচিত। এর রচনাকাল খ্রিস্টীয় একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে মিতাক্ষরা (আনু. ১১শ শতক) হচ্ছে যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা। এটি রচনা করেন অবাঙালি স্মৃতিকার বিজ্ঞানেশ্বর। উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ধারণে দায়ভাগ বঙ্গে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল; এর কর্তৃত্ব ছিল সর্বোচ্চ। তবে দত্তক সম্পর্কে কুবের রচিত দত্তকচন্দ্রিকা (আনু. ১৬শ শতক) একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। সংস্কৃত রচনায় যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাতে মনে হয়, বাংলায় হিন্দু আইন খুব ব্যাপক ও জটিল আকারে বিকশিত হয়েছে। বাংলায় ব্রিটিশ শাসকগণ কর্তৃক সম্পত্তি বণ্টন, উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ণয় ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে দেওয়ানি আইনসমূহ প্রযুক্ত হতো সম্ভবত ভারতের অন্যান্য অংশে ব্যবহূত সাধারণ নিয়মানুযায়ী। বাংলায় এই সাধারণ দেওয়ানি আইনসমূহ ব্রিটিশদের উদ্যোগে দুটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে: একটি বিবাদার্ণবসেতু, অন্যটি বিবাদভঙ্গার্ণব। প্রথমটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন হ্যালহেড ১৭৭৬ সালে এবং দ্বিতীয়টি অনুবাদ করেন কোলব্রুক ১৭৯৬ সালে। এরপর আনুষ্ঠানিক বিচারপদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দিলে সর্বভারতীয় ভিত্তিতে প্রণীত হয় দেওয়ানী কার্যবিধি (১৯০৮ সালের ৫ নং আইন)।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ভারতে হিন্দু আইনের পরিবর্তন ঘটে। ১৯৫৫ সালে ভারতে নতুন বিবাহ আইন প্রচলিত হয়, যাতে বিবাহ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটে এবং বহুপত্নীর বিধান বিলুপ্ত হয়। বিবাহ-বিচ্ছেদ পদ্ধতিরও প্রবর্তন হয়। ১৯৫৬ সালে অপর একটি ধারাবলে দায়ভাগ বা মিতাক্ষরা নির্দিষ্ট উত্তরাধিকারক্রম পরিবর্তিত হয়। পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর সম্পত্তিতে পুত্র-কন্যা উভয়ের সমান অংশ এবং স্ত্রী বা স্বামীর এক-তৃতীয়াংশ পাওনা স্বীকৃত হয়। দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা উভয় ধারার চর্চা পরিবর্তিত হয় এবং ভারতের সকল হিন্দুর জন্য একই আইন কার্যকর হয়। কিন্তু পাকিস্তানে সেই পুরনো হিন্দু আইন বলবৎ থাকে, এমনকি পূর্বপাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশেও দায়ভাগ পদ্ধতি কার্যকর রয়েছে।

বিবাহ  দায়ভাগ ও মিতাক্ষরা অনুসারে হিন্দুদের মধ্যে আট প্রকার বিবাহ প্রচলিত ছিল, যার প্রথম চারটি সামাজিকভাবে অনুমোদিত এবং অবশিষ্ট চারটি অননুমোদিত। আট প্রকার বিবাহ হলো: ক. ব্রাহ্ম: সর্বোত্তম পদ্ধতি, যাতে অলঙ্কারে সজ্জিতা কন্যাকে শিক্ষিত ও চরিত্রবান বরের হাতে তুলে দেয়া হতো; এক্ষেত্রে বরের নিকট থেকে কোন পণ নেয়া হতো না; খ. দৈব: এ ধরনের বিবাহে যজ্ঞ সম্পাদনকারী পুরোহিতের নিকট কন্যা সম্প্রদান করা হতো; গ. আর্ষ: এ বিবাহে কনের পিতা বরের নিকট থেকে এক বা দুই জোড়া গাভী গ্রহণ করতেন; ঘ. প্রজাপত্য: এ বিবাহে কনের পিতা বরের নিকট থেকে কোন পণ গ্রহণ ছাড়াই কন্যা দান করতেন এবং তাদের আশীর্বাদ করতেন যাতে তারা পারস্পরিক বিশ্বাস ও সুখের সঙ্গে দাম্পত্য জীবন যাপন করতে পারে; ঙ. অসুর: এ বিবাহে বর পিতা অথবা অভিভাবকের নিকট থেকে মূল্য দিয়ে কনেকে ক্রয় করত; চ. রাক্ষস: এ বিবাহে কন্যার আত্মীয়দের প্রহার করে রোরুদ্যমান কন্যাকে তুলে নেয়া হতো; ছ. গন্ধর্ব: বর ও কনের পরস্পরের পরিচয় ও সম্মতিতে এ বিবাহ অনুষ্ঠিত হতো; জ. পৈশাচ: নিকৃষ্টতম বিবাহ; এতে কন্যার প্রেমিক (কন্যার সম্মতি ব্যতিরেকে) নিদ্রিত অবস্থায় অথবা মদোম্মত্ত বা উম্মত্ত কন্যার সঙ্গে সঙ্গত হতো।

দায়ভাগ অনুসারে পুরুষের বিবাহের ক্ষেত্রে তেমন কোন বিধিনিষেধ ছিল না। স্ত্রীর সতীত্ব সংক্রান্ত ব্যাপার ছাড়া বিবাহ-বিচ্ছেদেরও ব্যবস্থা ছিল না। কোন কারণে স্ত্রী বর্জিত হলে স্বামীর নিকট থেকে সে নিজের ও সন্তানের ভরণপোষণ পেত। একজন বিধবা তার শ্বশুরের নিকট থেকে ভরণপোষণ পেত, যদি না স্বামী তার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ রেখে যেত। বিধবা চাইলে পুনর্বিবাহ করতে পারত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন পাস হয়।

দত্তক গ্রহণ  এ ব্যাপারে নন্দ পন্ডিত রচিত দত্তকমীমাংসা এবং কুবের রচিত দত্তকচন্দ্রিকা সর্ব ভারতে স্বীকৃত। তবে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সেক্ষেত্রে বাংলায় শেষেরটিই অনুসৃত  হতো।

দত্তকচন্দ্রিকা মতে দত্তক গ্রহণের দুটি উদ্দেশ্য হলো: ক. দত্তক গ্রহণকারী পিতা এবং তার পূর্বপুরুষদের প্রতি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং খ. দত্তক গ্রহণকারী পিতার উত্তরাধিকারী হওয়া। যেকোন পুত্রহীন ব্যক্তিই দত্তক নিতে পারেন; এক্ষেত্রে ‘পুত্রহীন’ বলতে তাকেই বোঝায় যার পুত্র, পৌত্র কিংবা প্রপৌত্র কিছুই নেই। একমাত্র শূদ্র ব্যতীত অন্য কেউ দৌহিত্র কিংবা ভাগিনেয়কে দত্তক নিতে পারে না। কারও একমাত্র পুত্র দত্তক হতে পারে না। জীবিত স্বামীর অনুমতি ব্যতীত স্ত্রী পুত্রকে দত্তক দিতে পারে না। স্বামী মৃত হলে তার পূর্ব-নিষেধ না থাকলে স্ত্রী পুত্রকে দত্তক দিতে পারে। দত্তক পুত্র আত্মজের অনুরূপ অধিকার লাভ করে।

উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম  দায়ভাগ ও মিতাক্ষরার মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো হলো: ক. দায়ভাগ সম্পত্তির প্রতি জন্মগত অধিকার স্বীকার করে না, মিতাক্ষরা করে; খ. দায়ভাগ মতে উত্তরাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম নির্ধারিত হয় পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের বিধান দ্বারা, কিন্তু মিতাক্ষরা মতে নির্ধারিত হয় রক্তসম্পর্কের দ্বারা। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম বলতে এখানে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও পিন্ডদানকে বোঝায়। সাধারণ অর্থে কোন মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে কারও অধিকার জন্মে প্রথমোক্ত ব্যক্তির পারলৌকিক মঙ্গলের জন্য পিন্ড প্রদানে শেষোক্ত ব্যক্তির যোগ্যতালাভের দ্বারা; গ. দায়ভাগ মতে যৌথ পরিবারের সদস্যরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অংশীদার হয় এবং সেগুলো তারা পরিবার ভাগ হওয়ার পূর্বেই বিলিবন্দোবস্ত করতে পারে; ঘ. দায়ভাগ মতে যৌথ পরিবারের বিধবা তার স্বামীর অংশের মালিক হয়, যদি স্বামী নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায়, কিন্তু মিতাক্ষরায় এ বিধি স্বীকৃত নয়।

দায়ভাগের বিধান অনুযায়ী পিতার অকৃষিবিষয়ক সম্পত্তি ব্যতীত অন্যান্য সম্পদের  একমাত্র উত্তরাধিকারী তার পুত্ররা। অকৃষিবিষয়ক সম্পত্তির ক্ষেত্রে মৃতের স্ত্রী পুত্রদের সমান অংশীদার হয়। পিতামহের আগে মৃত পিতার পুত্ররা কেবল সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়, যা তাদের পিতা তাদেরকে দান করে যায়, যদি তারা পিতামহের মৃত্যুকালে জীবিত থাকে। আর এক্ষেত্রে যদি পিতামহের অন্য কোনো পুত্রসন্তান কিংবা স্ত্রী অথবা পূর্বে মৃত পুত্রের পুত্ররাও বেঁচে না থাকে, তাহলে তার (পিতামহের) কন্যারা তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়; এক্ষেত্রে কুমারী কন্যারা অগ্রাধিকার পায়। বন্ধ্যা বিধবা কন্যা কিংবা পুত্রহীন অথবা পুত্র লাভের সম্ভাবনা নেই এমন কন্যারা পিতার সম্পত্তির অধিকারী হয় না। অসতী স্ত্রী কিংবা কন্যাও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য নয়। দায়ভাগ মতে কেবল পাঁচ শ্রেণীর স্ত্রীলোক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তারা হলো: স্ত্রী, কন্যা, মা, পিতামহী এবং প্রপিতামহী। তবে এরা কেবল এদের জীবদ্দশায় এ অধিকার ভোগ করতে পারে; মৃত্যুর পর মৃত পুরুষের নিকটতম পুরুষ উত্তরাধিকারী এর মালিক হয়, মহিলা উত্তরাধিকারীর উত্তরাধিকারীরা নয়। আজীবন উত্তরাধিকার প্রাপ্ত স্ত্রীলোক কেবল বৈধ প্রয়োজনে সীমিত পরিমাণে সম্পত্তি বিক্রয় করতে পারে।

স্ত্রীধন  স্ত্রীর স্বোপার্জিত কিংবা উপহার হিসেবে প্রাপ্ত সম্পত্তি। তারা এ ধন নিজের ইচ্ছামতো বিক্রয় অথবা দান করতে পারে। উপার্জনের উৎস অনুযায়ী স্ত্রীধন চার প্রকার। স্ত্রীধনের উত্তরাধিকারও ভিন্ন ধরনের এবং তা কন্যাদের অধিকতর উত্তরাধিকার ক্ষমতা প্রদান করে।

স্ত্রীধনের প্রকৃতি অনুযায়ী তার উত্তরাধিকারক্রম এরূপ: ক. শুল্ক (কন্যাপণ): ভাই, মা, পিতা ও স্বামী; খ. যৌতুক (বিবাহকালে প্রাপ্ত উপহার): অবাগ্দত্তা কন্যা, বাগ্দত্তা কন্যা, বিবাহিতা কন্যা যার পুত্র রয়েছে কিংবা পুত্রসম্ভবা, বন্ধ্যা বিবাহিতা কন্যা এবং নিঃসন্তান বিধবা কন্যা সমান অংশে; পুত্র, দৌহিত্র, পৌত্র, প্রপৌত্র, সতীন পুত্র, সতীন পৌত্র, সতীন প্রপৌত্র। উপর্যুক্তদের অভাবে স্ত্রীলোকের যৌতুক সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে স্বামী, ভাই, মা, বাবা; গ. অন্বাধেয় (বিবাহোত্তরকালে পিতৃদত্ত): এক্ষেত্রে উত্তরাধিকারক্রম প্রায় যৌতুকের মতোই, তবে পার্থক্য হলো: বিবাহিতা কন্যাদের চেয়ে পুত্ররা অগ্রাধিকার পায়; এবং নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী হয় তার ভাই, মা, পিতা, স্বামী; ঘ. অযৌতুক (বিবাহের পূর্বে বা পরে আত্মীয়গণ কর্তৃক প্রদত্ত; বিবাহের পূর্বে পিতৃদত্ত): এ ক্ষেত্রে পুত্র এবং কুমারী কন্যারা সমান অংশীদার; বিবাহিত পুত্রবতী অথবা পুত্রসম্ভবা কন্যা, পৌত্র, দৌহিত্র, বন্ধ্যা বিবাহিতা কন্যা এবং নিঃসন্তান বিধবা কন্যা। উপযুক্তদের অভাবে অযৌতুক স্ত্রীধনের উত্তরাধিকারীরা হলো: ভাই, মা, পিতা, স্বামী, দেবর, স্বামীর ভ্রাতুষ্পুত্র, বোনপো, স্বামীর ভাগিনেয়, নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র, জামাতা, স্বামীর সপিন্ড, সকুল্য ও সমানোদক, পিতার জ্ঞাতি।

উত্তরাধিকার বঞ্চিতগণ নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়: পুরুষত্বহীন, জন্মান্ধ, আজন্ম বধির, উন্মাদ, নির্বোধ, বোবা, বিকলাঙ্গ, ধর্মত্যাগী, ধর্মত্যাগীর পুত্র, দুরারোগ্য ব্যাধিগ্রস্ত, কুষ্ঠরোগী, সংসারত্যাগী ও বিশ্বাসঘাতক। কোন হিন্দু ধর্মান্তরিত হলে ধর্মান্তরের পরে উত্তরাধিকার নির্ধারিত হলে সে সম্পত্তির অধিকার পায় না। যদি কোন হিন্দু-বিধবা পুনরায় বিবাহ করে তাহলে ভূতপূর্ব স্বামীর নিকট থেকে প্রাপ্ত সম্পদ তাকে ত্যাগ করতে হয়।

হিন্দু আইনে উত্তরাধিকার প্রত্যাহারের বিষয়টি স্বীকৃত। এ আইনে ধর্মীয় অনুদান একটি সাধারণ ব্যাপার এবং তা পরিচালনার জন্য যাকে নিয়োগ করা হয় তাকে বলা হয় সেবায়েত। উত্তরাধিকারীদের অভাবে কোন মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার গুরু, শিষ্য এবং সতীর্থদের মধ্যে বণ্টিত হয়।

হিন্দু আইনের উদ্ভবের সময়কাল সঠিকভাবে নিরূপন করা দুষ্কর। এরূপ মনে করা হয় যে, এ আইন কারও সৃষ্ট নয় এবং অন্যান্য আইনের মতো এ আইন একদিনে প্রণীত বা ঘোষিতও হয় নি। বিধিবদ্ধ হবার পূর্বে এ আইন সম্ভবত প্রথা ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করেছে। [সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তপনকুমার চক্রবর্তী]