স্মৃতিশাস্ত্র


স্মৃতিশাস্ত্র এতে হিন্দুদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিবিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। স্মৃতিশাস্ত্রের উদ্ভব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বাংলায় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী পাল রাজাদের সময় (আনু. ৭৫০-১১৫৫) বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল গভীর ও ব্যাপক। ফলে তান্ত্রিক ধর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মুসলমান শাসনামলে  চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) প্রবর্তিত উদার বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে হিন্দুদের মধ্যে চিরপ্রচলিত বর্ণপ্রথার কঠোরতা অনেকটা শিথিল হয়। অন্যদিকে সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মের বিরোধী তান্ত্রিক ধর্ম স্ত্রীলোক ও শূদ্রকে ধর্মাচরণে পর্যাপ্ত অধিকার দেয়। এরূপ একটি অবস্থার সম্মুখীন হয়ে ব্রাহ্মণ্য সমাজের নেতারা স্মৃতিনিবন্ধসমূহ রচনা করে শাস্ত্রীয় বিধি-নিষেধের নিগড়ে জনগণকে নিয়ন্ত্রিত করতে প্রয়াসী হন। ফলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলায়ও স্মার্তসম্প্রদায় গড়ে ওঠে এবং রচিত হয় অসংখ্য স্মৃতিগ্রন্থ।

বঙ্গীয় বা গৌড়ীয় স্মার্ত সম্প্রদায়ের বিকাশ ঘটে তিনটি যুগ ধরে রঘুনন্দন-পূর্বযুগ, রঘুনন্দনযুগ ও রঘুনন্দনোত্তর যুগ। রঘুনন্দন-পূর্বযুগের স্মার্তদের মধ্যে প্রাচীনতম ভবদেব ভট্ট আনুমানিক ৮০০-১১০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোনোও এক সময় আবির্ভূত হন। তিনি বালক, জিকন প্রভৃতি নামে যে প্রাচীনতর স্মার্তদের উলে­খ করেছেন, তাঁরা বাঙালি হলেও তাঁদের কোনো গ্রন্থ পাওয়া যায়নি। কর্মানুষ্ঠান পদ্ধতি, প্রায়শ্চিত্তপ্রকরণ (বা নিরূপণ) ভবদেব রচিত সুবিদিত স্মৃতিগ্রন্থ। সেযুগের অপর বিখ্যাত স্মৃতিকার জীমূতবাহনের (আনু. ১০৫০-১১৫০)  দায়ভাগ বাঙালি হিন্দুদের সম্পত্তির স্বত্বাধিকার ও উত্তরাধিকারক্রম সম্বন্ধে সর্বাপেক্ষা প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। কৌলীন্যপ্রথার প্রবর্তক রাজা বল­াল সেনের (আনু. ১১৫৮-৭৯) নামাঙ্কিত দানসাগর ও অদ্ভুতসাগর দুটি সুপরিচিত স্মৃতিগ্রন্থ। তাঁর গুরু অনিরুদ্ধ হারলতা ও পিতৃদয়িতা রচনা করেন। লক্ষ্মণসেনের কর্মাধ্যক্ষ বা প্রধান বিচারপতি হলায়ুধের ব্রাহ্মণসর্বস্বও একখানা প্রামাণিক গ্রন্থ।  শূলপাণি (আনু. ১৩৭৫-১৪৬০) অন্তত এগারোখানি স্মৃতিনিবন্ধ রচনা করেছিলেন। তাঁর শ্রাদ্ধবিবেক ও প্রায়শ্চিত্তবিবেক দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ। স্মৃতিরত্নহার রায়মুকুট  বহে’ক্সতি মিশ (আনু. ১৫শ শতকের পূর্বার্ধ) কর্তৃক রচিত। রঘুনন্দনের গুরু শ্রীনাথ আচার্যচূড়ামণি রচিত বহু নিবন্ধের মধ্যে কৃত্যতত্ত্বার্ণব একখানা বিখ্যাত স্মৃতিগ্রন্থ। এই যুগের কুল­ুকভট্ট মনুস্মৃতির জনপ্রিয় টীকা মন্বর্থমুক্তাবলী রচনা করেন।

বাংলায় স্মৃতিশাস্ত্রের ইতিহাসে যুগস্রষ্টা ছিলেন  রঘুনন্দন ভট্টাচার্য (১৫শ-১৬শ শতক)। তাঁর মলমাসতত্ত্ব থেকে জানা যায় যে, তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ২৮খানা তত্ত্ব অর্থাৎ স্মৃতিগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। সেগুলির দ্বারা দীর্ঘকাল বাংলার হিন্দুসমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। স্মৃতিশাস্ত্রের সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াও রঘুনন্দনের সমাজ-সংস্কারকের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। যে তন্ত্রশাস্ত্র ব্রাহ্মণ-সমাজে উপেক্ষিত ছিল, তার বিপুল জনপ্রিয়তা লক্ষ করে রঘুনন্দন সর্বপ্রথম বঙ্গদেশে তান্ত্রিক দীক্ষাকে স্বীকৃতি দেন। জ্যেষ্ঠার পূর্বে কনিষ্ঠা ভগ্নীর বিবাহ নিন্দিত হলেও তিনি বিধান দেন যে, বিশেষ কোনো কারণে জ্যেষ্ঠার বিবাহ বিলম্বিত হলে কনিষ্ঠার বিবাহে কোনো দোষ নেই। তাঁর প্রায় সমকালীন গোবিন্দানন্দ দানক্রিয়াকৌমুদী, বর্ষক্রিয়াকৌমুদী প্রভৃতি চারখানি গ্রন্থ ছাড়াও শূলপাণির প্রায়শ্চিত্তবিবেক ও শ্রীনিবাসের শুদ্ধিদীপিকার টীকা রচনা করেছিলেন।

রঘুনন্দনোত্তর যুগের অধিকাংশ স্মৃতিগ্রন্থই হয় মূল গ্রন্থসমূহের সংক্ষিপ্তসার, না হয় পৌরোহিত্যের উপযোগী প্রয়োগবিষয়ক। তবে এই যুগের প্রখ্যাত স্মার্ত পন্ডিত  চন্দ্রকান্ত তর্কালঙ্কার (১৮৩৬-১৯১০) স্বাধীন চিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর উদ্বাহচন্দ্রালোক, শুদ্ধিচন্দ্রালোক ও ঔর্ধ্বদেহিক চন্দ্রালোক নামক তিনটি গ্রন্থে। তিনি নানা বিষয়ে রঘুনন্দনের মত খন্ডন করে নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসকদের বিচার-কার্যের সুবিধার্থে তাঁদেরই উদ্যোগে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন (মৃত্যু. ১৮০৬) এবং  বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার (আনু. ১৭০০-১৭৮৮) অপর কযেকজনের সহযোগিতায় যথাক্রমে বিবাদভঙ্গার্ণব  ও বিবাদার্ণবসেতু (১৭৭৬) নামক দুখানি স্মৃতিগ্রন্থ সংকলন করেন।

স্মৃতিগ্রন্থসমূহে আলোচিত বিষয়গুলিকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়, যথা আচার, প্রায়শ্চিত্ত ও ব্যবহার। কোনো কোনো গ্রন্থে মৈথিল, উড়িয়া ও কামরূপীয় গ্রন্থের উল্লেখ আছে; সেসবের কিছু মতামতও খন্ডন করা হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে  দুর্গাপূজা সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে এবং সেক্ষেত্রে কুমারীপূজাকে অপরিহার্য বলা হয়েছে। দশমীকৃত্যের মধ্যে শবরোৎসব বিহিত হয়েছে। এতে ভক্তরা গায়ে লতাপাতা জড়িয়ে কাদা মেখে পরস্পর অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে।

আইন-কানুনবিষয়ক কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্মৃতিশাস্ত্রগুলি ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার পার্থক্য সৃষ্টি করেছে। যেমন, জীমূতবাহনের মতে পিতার মৃত্যুর পর তার সম্পত্তিতে পুত্রের অধিকার জন্মে, কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে জন্মমাত্রই পুত্র পিতার সম্পত্তির অংশভাগী হয়। এই আইন ভারতের স্বাধীনতাপূর্ব বলবৎ ছিল।

স্মৃতিনিবন্ধসূত্রে প্রতিফলিত সমাজে দেখা যায়, প্রাচীন শাস্ত্রানুসারে যোগ্যপাত্রের অভাবে কন্যা আমরণ পিতৃগৃহে থাকবে, তথাপি অযোগ্য পাত্রে তাকে সমর্পণ করা উচিত নয়। উল্লিখিত অদ্ভুতসাগরে নানা প্রকার অশুভ লক্ষণ এবং সেগুলির প্রতিকার সম্পর্কে লোকবিশ্বাস দেখা যায়। রঘুনন্দনের মতে কিছু অশুভ লক্ষণ হলো: গাছে অকালে ফুল ফোটা বা ফল ধরা, মাথায় কাক বা শকুনের পতন, গৃহোপরি বানর, পেঁচক প্রভৃতির অবস্থান ইত্যাদি। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষার প্রভাব এবং সমাজ পরিবর্তনের ফলে স্মৃতিশাস্ত্রের এসব বিধিনিষেধ আগের মতো পালিত হয় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্মৃতিশাস্ত্রের প্রভাব অনেকটাই অটুট রয়েছে।  [সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]