সাধনা


সাধনা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের তরুণ-বংশধরদের সম্পাদিত চতুর্থ পত্রিকা। এর পূর্বে অন্যান্য পত্রিকাসমূহ হলো- তত্ত্ববোধিনী,  ভারতী এবং বালক। সাধনা প্রথম প্রকাশিত হয় ১২৯৮ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ মাসে (ডিসেম্বর, ১৮৯১) এবং পরবর্তী চার বছর পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। প্রথম তিন বছরের সংখ্যাগুলিতে সম্পাদক হিসেবে  দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরএর তৃতীয় পুত্র সুধীন্দ্রনাথের (১৮৬৯-১৯২৯) নাম ছাপা হলেও প্রকৃতপক্ষে পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। প্রকাশের চতুর্থ বছরে রবীন্দ্রনাথ এর সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। একবছর পর (কার্তিক, ১৩০২ বঙ্গাব্দ) পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়।

সাধনার পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ভারতী পত্রিকার সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর মতামত প্রকাশের জন্য নিজস্ব একটি মাধ্যমের পরিকল্পনা করেন। তিনি ছিলেন এর প্রধান লেখক। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধসমূহ এ পত্রিকার জন্য লেখা হয়েছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু তাঁর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন। সাধনা তাঁর নিজের পত্রিকা। প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি এর প্রত্যেকটি অংশ অতি সতর্কতার সাথে আধুনিক সাহিত্যে সংকলিত হয়েছে। তিনি হিতবাদী পত্রিকায় তাঁর  ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। কিন্তু সাধনায় তিনি তা অব্যাহত রাখেন। অবশ্য এতে কবিতাও ছিল। এছাড়াও তিনি নিয়মিতভাবে সমালোচনামূলক লেখা লিখতেন এবং এতে তিনি এর কয়েকটি অংশ অনুবাদও করেছিলেন। তিনি অন্যান্য প্রবন্ধগুলি সম্পাদনা করেন, এমনকি, তিনি প্রেস কপিও প্রস্ত্তত করতেন এবং প্রুফ শুদ্ধ করতেন। তিনি নিয়মিতভাবে অন্যান্য লেখকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং সাধনায় লেখার জন্য তাদেরকে উৎসাহ দিতেন। সাধনায় যারা লিখতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন ঠাকুর পরিবারের সদস্য। এঁদের মধ্যে ছিলেন বলেন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ এবং ঋতেন্দ্রনাথ। এ পত্রিকায়  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতার বিশদ ব্যাখ্যাও করেছিলেন।

সাধনা ছিল পুরানো কাগজে সুন্দরভাবে ছাপানো একটি পত্রিকা। প্রতিটি সংখ্যা এক হাজার কপি করে ছাপানো হতো এবং বিজ্ঞাপনের সংখ্যা খুবই কম ছিল। পত্রিকাটি প্রকাশে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতেন রবীন্দ্রনাথ ও  গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে রবীন্দ্রনাথ শুধু একটি পত্রিকায় নিজেকে বেশি দিন আটকিয়ে রাখতে পারেন নি। আর্থিক সংকট ছাড়াও পত্রিকাটি প্রকাশের চতুর্থ বছরে তিনি ক্লান্তি বোধ করছিলেন এবং শেষপর্যন্ত পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। এর ব্যাপ্তিকাল স্বল্প হলেও সাধনা বাংলার পত্রিকার ইতিহাসে একটি মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত।  [ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী]