সত্যপীর


সত্যপীর  স্থানীয় লোকদের সঙ্গে মুসলমানদের সুদীর্ঘ সাহচর্য এবং ক্রমবর্ধমান ধর্মান্তরিত লোকদের প্রভাবে ইসলামের ব্যবহারিক কার্যবিধিতে প্রবিষ্ট বিশ্বাস ও আচরণমালার মধ্যে সত্যপীরের ধারণা অন্যতম। হিন্দু লেখকগণ পীরের পরিবর্তে ‘নারায়ণ’ শব্দ ব্যবহার করেন, যদিও মুসলমানদের ‘সত্যপীর’, আর হিন্দুদের ‘সত্যনারায়ণ’-এর মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য ছিল না। সত্যপীরের উপাসনা এমনকি বিশ শতকের প্রথম দিকেও প্রচলিত ছিল, বিশেষ করে বাংলার উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে। কাঠের তক্তা দিয়ে সত্যপীরের বেদী তৈরি করা হতো এবং প্রসাদ হিসেবে দেওয়া হতো মিষ্টি, দুধ, চিনি, পান-সুপারি ইত্যাদি।

সাহিত্যে দুটি উপাখ্যান প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথম উপাখ্যান অনুসারে হিন্দু দেবতা শ্রীহরি ফকিরের ছদ্মবেশে জনৈক গরীব ব্রাহ্মণের নিকট এসে তাকে সত্যনারায়ণের পূজা দিতে বলেন। ব্রাহ্মণ হুকুম পালন করে এবং ধনবান হয়। দ্বিতীয় উপাখ্যান অনুসারে এক বণিক সত্যনারায়ণের আশীর্বাদে কন্যাসন্তান লাভ করে। কন্যা বড় হলে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়, জামাতাকে সঙ্গে নিয়ে বণিক বাণিজ্যে যায় এবং সত্যপীরের উপাসনা না করায় বিপদে পড়ে। কিন্তু তার স্ত্রী সত্যপীরের ভক্ত ছিল বলে সে যাত্রা বণিক বিপদ হতে পরিত্রাণ পায়। জামাতাসহ ফেরার পথে আবারও তার ডুবে মরার উপক্রম হয়, কেননা বণিকের কন্যা স্বামীর সঙ্গে মিলনচিন্তায় বিভোর হয়ে সত্যপীরের প্রসাদ দিতে অবহেলা করে। পরে অবশ্য সত্যপীরের উপাসনার তাৎপর্য সে উপলব্ধি করে এবং তারা সবাই বিপদমুক্ত হয়। এ সকল কল্পকথার মাধ্যমে সতপীর (বা সত্যনারায়ণ) বিষয়ক সাহিত্য জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ সকল সাহিত্যের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সত্যপীরকে মহিমান্বিত করা। সত্যপীর কাব্য সত্যপীর ভিত্তিক প্রথম গ্রন্থ। শেখ ফয়জুল্লাহর প্রতি আরোপিত এই বইটি ১৫৪৫ থেকে ১৫৭৫ সালের মধ্যে রচিত বলে ধরা হয়। অনেক পন্ডিত মনে করেন যে, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ (১৪৯৪-১৫১৯) সত্যপীর আন্দোলনের প্রবর্তক, তবে এই মত সমর্থন করার মতো কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই।

সাহিত্য পর্যালোচনা, উপাসনার নিয়ম-কানুন প্রভৃতির বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় যে, সত্যপীরের (বা সত্যনারায়ণ) উপাসনা স্থানীয় মনসা বা চন্ডী দেবীর পূজার সঙ্গে প্রায় অভিন্ন। সত্যপীরকে কোনো মূর্তির অবয়বে দেখানো হয়নি। প্রতীক হিসেবে শুধু সাধারণ তক্তপোষ বসানো থাকত। সাধারণত গরিব জনগোষ্ঠী থেকে সত্যপীরের উপাসকেরা আসত এবং তাদের প্রদত্ত উপচারও ছিল সাদামাটা। সত্যপীরের ধারণায় হিন্দু ও মুসলমান উভয় রীতির প্রভাব ছিল। অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সত্যপীর (বা সত্যনারায়ণ) ধারণাটি মুসলমানদের পীর ও হিন্দুদের স্থানীয় দেবতা পূজার সংশ্লেষণের ফল। এটি মুসলমানদের পীরানি ধারণার স্থানীয় প্রকাশ। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্থানীয় জনগণের পীরানি ধারণার সঙ্গে তাদের পূর্বতন দেবতাদের অলৌকিক ক্ষমতার সংমিশ্রণ ঘটে। এই পরিবর্তন ধারার চরম পরিণতিতে দেখা দেয় পীর পূজা (সত্যপীর বা সত্যনারায়ণ)। পীরগণ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী বলে তখন লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে।  [আবদুল করিম]

গ্রন্থপঞ্জি  Sukumar Sen, Bangla Sahityer Itihas (in Bangla), Calcutta, 1920; Muhammad Enamul Haq, Bange Sufi Prabhava (in Bangla), Calcutta, 1935; Abdul Karim, Social History of the Muslims in Bengal, (2nd ed), Chittagong, 1985.