মোসলেম ক্রনিকল


মোসলেম ক্রনিকল (১৮৯৫-১৯০৫)  আবদুল হামিদ কর্তৃক সম্পাদিত একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। এটি কলকাতা থেকে ১৮৯৫ হতে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। এটি ছিল বাংলার ইংরেজি শিক্ষিত শহুরে মুসলিমদের উঠতি শ্রেণির মুখপত্র। ১৮৬১ সালে মির্জা দেলোয়ার হোসায়েন আহমেদ প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট হিসেবে ডিগ্রি অর্জনের পর থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে নিয়মিতভাবে এই উঠতি শ্রেণিটি বের হয়ে আসছিলেন। সংবাদপত্রটির বেশ প্রচার ছিল, এমনকি, মফস্বল শহরেও এর গ্রাহক ছিল।

ঊনিশ শতকে ভারতীয় মুসলিমগণ ছিলেন সাম্রাজ্যবিহীন এক পতিত জাতি এবং আকস্মিক ভাগ্য পরিবর্তনে তারা ছিলেন হত-বিস্মিত। উত্তর পশ্চিমের মুসলিমদের তুলনায় বাংলার মুসলিমদের অবস্থা ছিল অধিকতর করুণ। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে বাংলার ইংরেজি শিক্ষিত মুসলিমগণ সংখ্যায় অল্প হলেও মুসলিমদের অবস্থা বিবেচনা করছিলেন এবং সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন এবং তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণ ও তার সম্ভাব্য প্রতিকারের উপায় ব্যখ্যা করছিলেন। বাংলায় নেতৃত্ব দানকারী দুজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রাচীনপন্থী নওয়াব আবদুল লতিফ এবং আধুনিকপন্থী সৈয়দ আমীর আলী

মোসলেম ক্রনিকল সংবাদ পরিবেশন করা ছাড়াও আধুনিকপন্থী ও সনাতনপন্থীদের চিন্তা-চেতনার অভিব্যক্তির বাহন ছিল। এ উভয় দলই মুসলিমদের প্রগতি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করছিল। সম্পাদক আবদুল হামিদ নওয়াব সমর্থক না হয়ে সৈয়দের একজন সমর্থক হওয়ার কারণে মোসলেম ক্রনিকলে আধুনিকপন্থীদের প্রভাব বেশি ছিল। সৈয়দ আমীর আলীর সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন এর কাজকর্ম আবদুল হামিদের পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতো। মোহামেডান লিটার‌্যারি সোসাইটি ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত হতো। নিজেকে মুতাজিলাপন্থী বিবেচনাকারী মির্জা দেলাওয়ার হোসায়েন আহমেদের গোঁড়ামি বর্জিত এবং বহুলাংশে নাস্তিক্যবাদী লেখনী দ্বারা মোসলেম ক্রনিকলের আধুনিকপন্থী ধারা আরও জোরদার হয়ে উঠেছিল। তাঁর একথা বলার সাহস ছিল যে,শরীয়া আইনের সংস্কার ও মুসলিমদের চিন্তা-চেতনায় উদার মনোভাবের প্রবর্তন করা ছিল মুসলিম সমাজের অগ্রগতির পূর্বশর্ত। মোসলেম ক্রনিকল তাঁর নাস্তিক্যবাদী লেখা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল।

মুসলিমদের ভাগ্যকে প্রভাবান্বিত করে এমন সব সমসাময়িক রাজনীতির অন্যান্য কিছু প্রশ্ন নিয়ে লেখকগণ মোসলেম ক্রনিকলের পাতায়, বিশেষ করে সম্পাদকীয়, সম্পাদকের নিকট পত্র এবং সরাসরি লেখার মাধ্যমে বিতর্ক করতেন। রাজনৈতিকভাবে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ইতোমধ্যে প্রকট আকার ধারণ করেছিল এবং ঊনিশ শতকের শেষদিকে, মোসলেম ক্রনিকলের পাতায় যা প্রতিফলিত হয়েছে, সে অনুযায়ী মুসলিমগণ তাদের ভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাগত স্বার্থ নিয়ে নিজদেরকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে বিবেচনা করছিলেন। তখন পর্যন্ত বাংলায় আলীগড় আন্দোলনের প্রভাব অতি সামান্য থাকলেও দেখা যায় যে, মোসলেম ক্রনিকল দল আন্দোলন দ্বারা, বিশেষ করে কংগ্রেস-মুসলিম সম্পর্ক, উর্দু-হিন্দি বিতর্ক, নির্বাচন নীতির প্রবর্তন, একই সময়ে লন্ডন এবং দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস’-এর পরীক্ষাগ্রহণ, স্থানীয় স্বায়ত্ত শাসন, মুসলিমদের শিক্ষা বিষয়ক প্রশ্নাবলি- যেমন, আবদুল লতিফ এবং আমীর আলীর যথাক্রমে মাদ্রাসাপন্থী ও মাদ্রাসা বিরোধী ধারা- প্রভৃতি প্রশ্নের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবান্বিত হয়েছিল বলে মনে হয়।

ক্রনিকল ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের অবজ্ঞাপূর্ণ সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে সাহসিকতার সাথে প্রতিবাদ জানায় এবং ইংরেজদের দ্বারা ভারতীয়দের নিষ্ঠুর নির্যাতনের কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ করে। কলকাতায় বিভিন্ন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার প্রতিবেদনগুলি সাপ্তাহিকীটির পাতায় কালিমা লেপন করেছে। এর প্রকাশনার শেষ বছরগুলিতে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) বিষয়ক উত্তেজনাপূর্ণ বিতর্ক এর পাতায় ব্যাপক স্থান লাভ করে। ঊনিশ শতকের বাংলার মুসলিমদের ইতিহাসের উৎস-উপকরণ হিসেবে মোসলেম ক্রনিকল বিশেষভাবে চিহ্নিত।  [আবু ইমাম]