মুহররম


মুহররম  ইসলামী বা হিজরী বর্ষের প্রথম মাস। এর অর্থ ‘পবিত্র ও নিষিদ্ধ মাস’।  হযরত মুহাম্মাদ (স.) -এর সময়ের মতো ইসলামপূর্ব যুগেও এ মাসে যুদ্ধ করা ছিল বেআইনি (হারাম)। এ মাসের ৯ ও ১০ তারিখে সিয়াম পালন করার নির্দেশ হাদীসে আছে। রমযানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে আশুরায় (১০ তারিখে) রোযা রাখা ফরয ছিল। মুহররমের প্রথম দশ দিন মুসলমান  শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা হযরত মুহাম্মাদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসায়নের (রা.) শাহাদতের জন্য শোকদিবস হিসেবে পালন করে। মুহররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়। উমায়্যা খলীফা মুআবিয়ার (রা.) পুত্র ইয়াজীদের সৈন্যদের হাতে ইমাম হুসায়ন (রা.) শাহাদতবরণ করেন। শিয়ারা এদিন ইমাম হুসায়নের সমাধির প্রতীক  তাজিয়া নিয়ে মিছিল করে। শোক প্রকাশের জন্য তারা বুক চাপড়ায় বা ছুরি বা চেইন দিয়ে নিজেদের শরীরে আঘাত করে। পরবর্তী হিজরী মাস সফরের প্রথম দশ দিন পর্যন্ত মোট চল্লিশ দিন এই শোক পালন চলতে থাকে।

খ্রিস্টীয় দশম শতক থেকে সর্বজনীনভাবে মুহররম পালিত হয়ে আসছে। বাংলায় কয়েকশ বছর ধরে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। ঢাকার  হোসেনী দালান ইমামবারা মুহররমের মূল কেন্দ্র। শিয়ারা ন্যূনপক্ষে মুহররমের প্রথম দশদিন শোকের প্রতীক কালো পোষাক পরিধান করে। এ সময় তারা আনন্দ-ফুর্তি করা, গান শোনা বা নাটক-সিনেমা দেখা থেকেও বিরত থাকে। এ মাসে তারা বিবাহেরও আয়োজন করে না। শিয়াদের কেউ কেউ এ সময় হুসায়ন এবং তাঁর অনুসারীদের পানির কষ্টের কথা স্মরণ করে মাছ খাওয়া থেকেও বিরত থাকে।

মুহররমের মিছিল

এই দশদিনের প্রতিদিন শোক প্রকাশের জন্য ইমামবারাগুলিতে নারী-পুরুষভেদে পৃথক পৃথক মজলিস বসে। এতে ইমাম হুসায়নের শাহাদত বরণের ঘটনা বর্ণিত হয় এবং মরসিয়া বা শোকগাথা আবৃত্তি করা হয়। মজলিস শেষে জনসাধারণের মধ্যে খাদ্য বিতরণ করা হয়। সপ্তম দিবসে স্বাভাবিক মজলিস ছাড়াও শির্নী (বিশেষ বিশেষ খাবার) বিতরণ করা হয় এবং আল্লাহর রহমত কামনা করা হয়। এ উপলক্ষে মজলিসে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ও ফল-ফলাদি বিতরণ করা হয়। যারা রহমত কামনা করে তারা এসব খাদ্যদ্রব্যের যে কোন একটি মানত করে এবং পরবর্তী এক বছর ওই খাদ্যটি খাওয়া থেকে বিরত থাকে। যদি দোয়া কবুল হয় তাহলে তারা পরবর্তী বছর শির্নী দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে। এই শির্নীর সঙ্গে কেউ কেউ রূপার তৈরি পাঞ্জা-ও  প্রদান করে। পাঞ্জা অর্থ খোলা হাত। এর দ্বারা হযরত মুহাম্মাদ (স.), তাঁর কন্যা ফাতিমা (রা.), তাঁর জামাতা আলী (রা.) এবং তাঁর দুই দৌহিত্র হাসান-হুসায়নকে বুঝায়।

বাংলায় আঠার শতকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে মুহররমের মিছিল বের হতো। তাতে ঘোড়া এবং হাতিও ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে তা অনেক সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে। ঢাকায় এই মিছিল হোসেনী দালান থেকে শুরু হয় এবং বিভিন্ন রাস্তা ঘুরে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে নির্মিত কৃত্রিম কারবালায় এসে শেষ হয়। মিছিলে দুলদুল ও পতাকা বহনের মাধ্যমে ইমাম হুসায়নকে স্মরণ করা হয়। মুহররমের সময় হুসায়ন ও ইয়াজীদ বাহিনীর মধ্যেকার যুদ্ধের স্মরণে লাঠিখেলা প্রদর্শন করা হয়। বাংলাদেশে অন্যান্য উৎসবের মতো মুহররম উপলক্ষেও বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে।  [নিয়াজ জামান]