মুসলিম ধর্মীয় আন্দোলন


মুসলিম ধর্মীয় আন্দোলন  ছিল প্রধানত ঊনিশ শতকে বাংলার ধর্মীয় পুনর্জাগরণধর্মী আন্দোলন। তবে অংশত এ আন্দোলনগুলি উদার আধুনিকতাবাদী সংস্কারমূলক প্রকৃতিরও ছিল।

ঊনিশ শতকে বাংলার মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে কতিপয় সংস্কার আন্দোলন রূপলাভ করে। এদের মধ্যে ফরায়েজী, তরিকা-ই-মুহম্মদিয়া, তাইয়ুনী ও আহল-ই-হাদীস এর মতো ইসলামি সংস্কার আন্দোলন উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে। প্রকৃতিগতভাবে এগুলি ছিল পুনর্জাগরণধর্মী এবং পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর বাংলাব্যাপী মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে গভীরভাবে উদ্দীপিত করে মুসলিম জনগণকে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার কাজে এগুলি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। যে তাবলিগ-জামাত ও সিরাত সম্মেলন আন্দোলন সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে অনুরূপ গণ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, তা পূর্ববর্তী শতকের আন্দোলনগুলির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এগুলি অনেকাংশে পূর্ববর্তী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারীও বটে।

বিশ্বজনীন পরিপ্রেক্ষিত  ধর্মীয় আন্দোলনগুলি সামাজিক বিষয় হওয়ায় তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে এগুলির পর্যালোচনা প্রয়োজন। ঊনিশ শতকে বাংলায় ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলন এত বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, ঐতিহাসিকগণ এগুলিকে একটি পরাধীন ও ক্ষয়িষ্ণু মুসলিম সম্প্রদায়ের জীবন-চেতনার অবিচ্ছিন্ন প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদ শুধু বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি সমগ্র মুসলিম সমাজ বা ‘উম্মাহ্কে প্রভাবিত করে সমকালীন  মুসলিম বিশ্বে বিস্তার লাভ করে। এরূপ ধারণা প্রচলিত আছে যে, সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবের ফলেই বিশ্বের বিভিন্ন অংশে এ আন্দোলন রূপলাভ করে। উসমানীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবে আরবের ওহাবী আন্দোলন এর উদ্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়। মুগল ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ রূপ দিয়েছিল শাহ ওয়ালীউল্লাহ্র মতবাদ ও তরিকা-ই-মুহম্মদীয়া আন্দোলনের, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে উদ্ভব ঘটে ফরায়েজী, তাইয়ুনী ও আহলে হাদিস আন্দোলনের। ফরাসি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে উত্তর আফ্রিকায় ফুলানি ও সানুসিয়া আন্দোলন এবং ওলন্দাজ সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবের ফলে ইন্দোনেশিয়ায় পাদুরি ও মুহম্মদীয়া আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে।

অপর একটি মত এই যে, এসব ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন কতকটা পাশ্চাত্যপন্থী রেনেসাঁ প্রভাবিত মুসলিম আধুনিকতাবাদ ও প্যান-ইসলামিবাদের (ইত্তেহাদুল ইসলাম) বিরুদ্ধ মত হিসেবে সাধারণ্যে ওহাবীবাদ ও ইসলামি পুনর্জাগরণবাদ (তাজদিদুল ইসলাম) নামে পরিচিতি লাভ করে। এ দুধরনের আন্দোলনের প্রস্ত্ততি ছিল সর্বজনীন। দুটিরই উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের পুনর্জাগরণ এবং উভয়েরই শ্লোগান ছিল ‘ইসলাম বিপন্ন’। কাজেই এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও অভীষ্ট লক্ষ্যের যথেষ্ট ঐক্য এবং অনুভূতির অভিন্নতা বিদ্যমান ছিল। এতদ্সত্ত্বেও আন্দোলনগুলি ভিন্নতর লক্ষ্যে কাজ করত, প্রায়শ একটি অন্যটির কর্মসূচির প্রতি বৈরী মতামত প্রকাশ করত এবং সতর্কতার সঙ্গে সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখত। তবে একমাত্র বিশ্বজনীন পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া এসব আন্দোলনের মধ্যে তেমন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

স্থানীয় সর্বজনীন পরিপ্রেক্ষিত  বাংলার স্থানীয় পরিবেশের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, খ্রিস্টীয় তেরো শতকের প্রারম্ভে দেশটি মুসলমান কর্তৃক অধিকৃত এবং আঠারো শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত শাসিত হলেও সম্পূর্ণরূপে ইসলামিকরণ হয়নি। মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধদের সমন্বয়ে এখানে গড়ে উঠেছিল একটি সর্বজনীন সমাজ এবং তারা ইসলামের সহনশীল শান্তি, বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার মধ্যে সন্নিহিত অথচ স্বতন্ত্র গ্রাম ও পল্লীতে পাশাপাশি বসবাস করত। এ স্থানীয় সর্বজনীন ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে ঊনিশ শতকের বাংলার সংস্কারমূলক সামাজিক প্রেক্ষাপট আঠারো শতকে বিরাজমান স্থবির অবস্থার সঙ্গে সুস্পষ্ট বৈপরীত্য প্রদর্শন করেছিল। ঊনিশ শতকের বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কারের প্রেরণায় বিশেষভাবে স্পন্দিত, গতিময় ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে এবং তা মুসলিম ও হিন্দু সমাজকে প্রভাবিত করে। শতকের দ্বিতীয় দশকে এ উদ্দীপনা এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত শ্রেণি গড়ে তোলে, যারা তাদের স্ব স্ব ধর্মের অনুপ্রেরণামূলক উৎসের সঙ্গে তাদের চলমান জীবনধারার এবং তাদের সম্প্রদায়ের আপাত ও ভবিষ্যৎ উন্নতির সঙ্গতি সম্পর্কে সন্ধিহান হয়ে ওঠেন। বাংলার ওপর ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবই ছিল এরূপ একটি পুনর্জাগরণের বর্তমান ও আশু কারণ।

বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন দেশের সামাজিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। প্রথমত, তারা মুগল শাসকশ্রেণির কর্তৃত্ব ও মর্যাদা বিনষ্ট করে, যাতে সমভাবে হিন্দু ও মুসলমানগণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, তারা গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণত অবস্থাপন্ন শ্রেণির সনাতন আয়ের উৎসগুলি বিনষ্ট করে দেয়। তৃতীয়ত, তারা কলকাতার ভিনদেশী হিন্দু বানিয়াদের ব্যবসায়ে প্রতিষ্ঠিত করে। এরা প্রধানত মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী ও কুসীদজীবী এবং গোমস্তা (ভারতে ইংরেজদের বাণিজ্য-প্রতিনিধি) হিসেবে কাজ করত। প্রায়শ এরা ‘সাদা আদমিদের কালা গোমস্তা’ নামে অভিহিত হতো। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এর ফলে ইউরোপীয় সামন্ত প্রভু বা ব্যারনদের ধাঁচে সৃষ্ট জমিদারগণ জনসাধারণের ওপর অত্যাচার চালাত। গোমস্তা ও জমিদারদের সঙ্গে যোগ দেয় তৃতীয় একদল উচ্চভিলাষী ভাগ্যান্বেষী। এরা ছিল এমন একদল ইংরেজ যারা সম্ভবত আমেরিকায় হারানো উপনিবেশগুলি থেকে অর্থ ও দক্ষতা স্থানান্তরিত করে গ্রাম-বাংলার মাটিতে মূলধন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছিল এবং এরা নীলকর হিসেবে রাজকীয় মনোভাব নিয়ে কৃষককুলের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছিল।

একটি পরাধীন জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামোর ওপর এরূপ শক্তিশালী ও সম্মিলিত প্রভাবের ফলাফল সহজেই অনুমান করা যায়। ‘ঝুঁকিহীন নির্যাতন’-এর এই প্রক্রিয়া মুগল শাসনব্যবস্থার সুনিয়ন্ত্রিত ধ্বংসের সুযোগে বাংলার ওপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের (১৭৫৭-১৮৫৭) ‘অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে’ ত্বরান্বিত করেছে। ল্যাথ্রোপ স্টোভার্ড (Lathrop Stoddard) একে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ‘প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুপ্রবেশ’ নীতিরূপে আখ্যায়িত করেছেন। এই নীতি বিশেষত বাংলার গ্রামজীবনে বহুবিধ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসঙ্গতির সৃষ্টি করেছিল।

এতে অবাক হওয়ার এমন কিছু নেই যে, এ পরিস্থিতি খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের মনে করুণার গভীর অনুভূতি, ইংরেজ শাসকবর্গের কিছুসংখ্যক সহূদয় ব্যক্তির বিবেকদংশন এবং ইংল্যান্ডের জনসাধারণের মানবতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে বেশ সহানুভূতি জাগিয়ে তোলে। তাদের আশীর্বাদ, উৎসাহ, সাহায্য ও অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৮১৪ বা ১৮১৬ সালের দিকে রাজা রামমোহন রায় কলকাতায় ‘রেনেসাঁ’ ধরনের একটি আধুনিকতাবাদী সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই আন্দোলন বাংলা ও ভারতবর্ষে হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে অসংখ্য নতুন বা বিচ্ছিন্ন সমাজ সংস্কার আন্দোলনের উদ্ভব ঘটায়।

কিন্তু তৎকালে ব্রিটিশের ইতিবাচক ভূমিকা বাংলার হিন্দু শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া জাগালেও মুসলমানদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং ১৮১৮ সালের দিকে বাংলায় গড়ে ওঠা হাজী শরীয়তউল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন ও দিল্লির রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ শহীদের তরিকা-ই-মুহম্মদীয়া আন্দোলন থেকে শুরু করে কিছুসংখ্যক পুনর্জাগরণমূলক ধর্মীয় আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে। দুটি আন্দোলনেরই উদ্ভব হয় ১৮১৮ সালের দিকে।

যেখানে মুসলিম পুনর্জাগরণ আন্দোলন ছিল সংস্কারপন্থী সেখানে রাজা রামমোহন রায়ের আন্দোলন সাধারণত রেনেসাঁ হিসেবে বিবেচিত। তথাপি এটা লক্ষণীয় যে, ইউরোপীয় ‘রেনেসাঁ আদলের’ তুলনায় এটি ছিল স্বতন্ত্র ধরনের এক রেনেসাঁ। বিশেষভাবে এটি আদি হিন্দু অথবা আর্য ধর্মীয় চেতনার পুনর্জাগরণমূলক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল। ইউরোপীয় রেনেসাঁর লক্ষ্য ছিল যুক্তিবাদ সম্পর্কে গ্রিক-রোমানদের পুরানো ক্লাসিক্যাল সেক্যুলার ধ্যান-ধারণা এবং ‘বর্তমানের’ ক্ষমাশীল খ্রিস্টান ‘নীতিবাদের’ মিলন ঘটানো, যাতে ‘মানবতাবাদের’ কল্পিত ‘উজ্জ্বলতার’ মধ্যে ‘একটি ভবিষ্যৎ’ সুখী ও সভ্য জগৎ গড়ে তোলার উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে রাজা রামমোহন রায়ের রেনেসাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী ধ্যান-ধারণার সাহায্যে ‘একেশ্বরবাদের’ আদি আর্য চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা। তবে অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যে এই রেনেসাঁ সেক্যুলার ছিল না, ছিল গভীর ধর্মনিষ্ঠ। ফলে ‘আর্যসমাজে’র মতো কিছুসংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু সংস্কার আন্দোলন রামমোহনের সংস্কারমূলক তৎপরতার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়।

ইসলামি পুনর্জাগরণবাদ ও হিন্দু রেনেসাঁর উত্থান একই স্থানে এবং প্রায় একই সময়ে ঘটে। দুর্ভাগ্যবশত রেনেসাঁর প্রকৃত বা কল্পিত ‘যুক্তিসিদ্ধ’ প্রণোদনার চেয়ে পারস্পরিক শত্রুভাবাপন্ন ইসলামি বনাম হিন্দু পুনর্জাগরণমূলক প্রেরণার দ্বারা একটি অপরটিকে প্রভাবিত করেছিল। এভাবে আন্দোলনগুলির মধ্যে যুগ যুগ ধরে প্রশংসিত ‘ধর্মীয় সহনশীলতার’ ভিত্তিতে ইসলাম বা মুগলদের প্রতিষ্ঠিত শান্তিকে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড করার প্রবণতা দেখা দেয় এবং এরা নতুনভাবে হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াতে শুরু করে।

স্থানীয় ইসলামি পরিপ্রেক্ষিত  বাংলার মুসলিম সমাজের প্রতি তাকালে এটা লক্ষণীয় যে, বাংলায় মুসলিম বিজয় (১২০৫) থেকে শুরু করে পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) পর্যন্ত এখানকার মুসলিম সমাজের অবস্থান যথেষ্ট নিরাপদ ছিল এবং এ নিরাপত্তা-বেষ্টনী ছিল বিশ্বমুসলিম সমাজের জন্য একটি দুর্জয় দুর্গস্বরূপ। রাজনৈতিকভাবেও এটি ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের একটি শক্তিশালী দুর্গ হিসেবে বিরাজিত ছিল। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধ ইংরেজদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে এবং ফলস্বরূপ মুসলিম সমাজ অবিরাম রাজনৈতিক বিপর্যয় ও টানাপোড়েনে বিক্ষত ও সঙ্কুচিত  হতে থাকে। ব্রিটিশের অধীনে পরাধীনতার যুগকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়; প্রথমটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে ১০০ বছরের পূর্ণ দাসত্বের যুগ এবং দ্বিতীয়টি ব্রিটিশ রাজত্বে ৯০ বছরের পরাধীনতার যুগ। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব দুটি যুগের মধ্যে বিভাজন রেখা টেনে দিয়েছে।

প্রথম যুগে মুসলিম সমাজ আলো থেকে অন্ধকারে, আশা থেকে নিরাশায়, ‘দারুল ইসলাম’ থেকে ‘দারুল হারবে’ অর্থাৎ শান্তির নিবাস থেকে অশান্তির নিবাসে নিক্ষিপ্ত হয়। মুসলমানগণ মুসলিম সমাজ ও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিরামহীন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এ ছিল মরণপণ যুদ্ধ, জিহাদ অথবা হিজরত, এবং এরই ফলে পরবর্তীকালে রূপলাভ করে হাজী শরীয়তউল্লাহ ও দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন, সৈয়দ আহমদ শহীদ, তিতুমীর, মওলানা বিলায়েৎ আলী ও মওলানা ইনায়েত আলীর তরিকা-ই-মুহম্মদীয়া আন্দোলন তথা ভারতীয় ওহাবী আন্দোলন, শাহ ইসমাইল শহীদ ও মওলানা নাজির হোসেনের আহলে-হাদিস আন্দোলন এবং জৌনপুরের মওলানা  কারামাত আলীর তাইয়ুনী আন্দোলন।

দ্বিতীয় যুগে, ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পর মুসলমানগণ সম্প্রদায় হিসেবে নয়, ব্যক্তিগতভাবে বিদেশী রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তারা পাশ্চাত্যের আধুনিক সভ্যতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য নিজেদের উপযোগী করে তোলা, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সুখী ও সুসভ্য জীবনের উপকরণ লাভের উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যের অপরাপর অধীনস্থ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া এবং জিহাদের পরিবর্তে ব্রিটিশ আইনের আশ্রয় (আমান) গ্রহণের প্রয়াস চালান। এক কথায় তারা রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ করে প্রশাসনিক শান্তি ও আইনের শাসনকে সুখসমৃদ্ধ আধুনিক জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে সর্বান্তঃকরণে গ্রহণ করে জিহাদের ক্ষেত্র (দারুল হারব) থেকে নিরাপত্তার পরিবেশে (দারুল আমান) উত্তরণের চেষ্টা করে। এসব চিন্তাধারা এবং এদের সহগামী অনুভূতি ও আবেগ একটিমাত্র কথায় রূপ লাভ করে, এবং তা হচ্ছে রাজভক্তিবাদ।

প্রায় ১৮২০ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত বাংলায় ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনগুলি গভীর আবেগময় উদ্দীপনায় বিকাশ লাভ করে। ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে এদের ধ্বংসসাধন বা অরাজনৈতিক ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে রূপান্তরিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এ আন্দোলনগুলি অধিকাংশ সময় ছিল উগ্র আবেগময় পর্যায়ে। এভাবে বিবেচনা করলে আন্দোলনগুলি পরাধীনতার পর্যায় থেকে আশ্রিতের পর্যায়ে উত্তীর্ণ হওয়ার ‘লম্ফন-মঞ্চ’ বা ‘উত্তরণ-সেতু’ গড়ে তুলেছিল বলে উল্লেখ করা যায়। তাদের সংগ্রামের আগুন নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত ‘দারুল আমান’ শ্লোগান এবং আশ্রিত রাজ্যের ধারণা মুসলিম সমাজে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। পুনর্জাগরণ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর রেনেসাঁ ধরনের মুসলিম আধুনিকতাবাদ প্রকাশ্য বা গোপনভাবে ‘রাজভক্তিবাদ’-এর শ্লোগান তুলে মাঠে নামে এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে ইংরেজ শাসকদের আরও সান্নিধ্যে নিয়ে আসার ও শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতির পথে পরিচালিত করার দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

কার্যক্রম  সাম্রাজ্যবাদের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সামাজিক-ইসলামি ভাবাপন্ন জিহাদ আন্দোলন হিসেবে এবং স্থানীয় সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতির সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে স্থানীয় মুসলিম সমাজকে পুনর্গঠিত ও পুনঃসংহত করার পদক্ষেপ হিসেবে বাংলার ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ধর্মের মূল শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করা। ব্রাহ্ম সমাজ ও আর্য সমাজের ন্যায় হিন্দু সংস্কার আন্দোলনের ক্ষেত্রেও এটাই ছিল করণীয় প্রধান কাজ। তাদের সমাজ সংস্কারমূলক প্রচেষ্টায় উভয় দলই স্বদেশে স্ব স্ব সমাজ শুদ্ধিকরণের দাবি জানায়, এবং প্রাদেশিক সীমানার বাইরে নিজেদের ও সমমনা স্বধর্মীদের মধ্যে নতুনভাবে সম্প্রদায়ব্যাপী যোগাযোগের ক্ষেত্র প্রস্ত্তত করে।

পূর্ববর্তী শতকে মুগল আধিপত্য সঙ্কুচিত হওয়ার ফলে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে মুসলমানদের মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হয় তা নিরসন করাই ছিল ইসলামি পুনর্জাগরণবাদের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল এমন ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের সংখ্যা ছিল মোট চারটি। সেগুলির মধ্যে ফরায়েজী, তরিকাই-ই-মুহম্মদিয়া ও আহলে-হাদিসের লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পুনরুজ্জীবন এবং মুসলিম সমাজকে স্থানীয় অনৈসলামি রীতিনীতির অনুপ্রবেশ থেকে মুক্ত করা। চতুর্থটি ছিল মওলানা কেরামত আলী জৌনপুরি পরিচালিত তাইয়ুনী আন্দোলন এবং এটি ছিল তরিকাই-ই-মুহম্মদিয়ার একটি খন্ডিত আন্দোলন। তাইয়ুনী আন্দোলন মুসলিম সমাজে প্রচলিত এবং অপর তিনটি আন্দোলন কর্তৃক বাতিল ঘোষিত ফাতিহা, মীলাদ ও উরসের ন্যায় কিছুসংখ্যক ঐতিহ্যবাহী প্রথাকে বহাল রাখতে চেয়েছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরে তাইয়ুনী আন্দোলন মুসলিম আধুনিকতাবাদীদের সঙ্গে হাত মিলায় এবং ব্রিটিশ রাজত্বের অধীন ভারতবর্ষকে দারুল আমান বা নিরাপদ আবাসভূমি হিসেবে ঘোষণা করে। মওলানা কেরামত আলীর মতে এই ঘোষণা মুসলমানগণকে জিহাদ অর্থাৎ মুসলিম রাজ্যকে মুক্ত করার জন্য আমরণ যুদ্ধ করা এবং হিজরত অর্থাৎ আশ্রয় গ্রহণের জন্য কোন ইসলামি রাজ্যে গমন করার ধর্মীয় দায়দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি প্রদান করে। তদুপরি দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহর সংস্কার কর্মসূচি আহলে হাদিস আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল।

আরবের ওহাবী মতবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ফরায়েজী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে এবং শাহ ওয়ালিউল্লার আন্দোলন বা দিল্লির তরিকাই-ই-মুহম্মদিয়ার সঙ্গে এর কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। অপর পক্ষে তিতুমীরের আন্দোলন ছিল তরিকাই-ই-মুহম্মদিয়া একটি সরাসরি সম্প্রসারণ।

ইসলামি পুনর্জাগরণবাদের বিশ্বজনীন রূপ প্রচারের ফলে এই সকল সংস্কার আন্দোলন ইসলামের সামাজিক সমতাবাদ, এক আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সকল মানুষের সাম্য, মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য এবং বিধর্মীদের কবল হতে মুসলিম দেশগুলি মুক্ত করার জন্য জিহাদ করার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করত। এতদুদ্দেশ্যে এসব আন্দোলনের প্রবক্তারা ইসলামি উম্মাহকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাও করত এবং কালক্রমে এটি তাদের সংস্কার কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। এ কারণে বিশ্বের সর্বত্র ইসলামি পুনরুজ্জীবনমূলক আন্দোলনগুলি সমাজে ইসলামি বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা ও দেশে একটি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে প্রকাশ্যে বা গোপনে কাজ করতে থাকে এবং এ লক্ষ্যে তারা প্রত্যক্ষ গণসংযোগের নীতি গ্রহণ করে। ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ছিল এভাবে মুসলমানদের চিন্তাধারায় উম্মাহর গঠনতান্ত্রিক ঐক্য এবং ইসলামি সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধের গভীর অনুভূতি পুনঃসঞ্চারিত করা।

তদুপরি তাদের গণসংযোগের কৌশল এবং মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও বিদেশী শাসকদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উদ্দীপনা জাগানোর জন্য মসজিদের মিম্বরে বা মুক্ত বক্তৃতা-মঞ্চে সোৎসাহে প্রদত্ত অগ্নিগর্ভ বক্তৃতামালা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের শোচনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতি গণসচেতনতা জাগাতে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করে।

বাংলায় ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল এভাবে গণ-সতর্কতা ও মানসিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সংস্কার ও পুনর্গঠন। ঊনিশ শতকের বিশের দশকের প্রথম দিকে যখন সৈয়দ আহমদ শহীদ কলকাতা শহরে আগমন করেন তখন দৃশ্যত তিনি মুসলমান, হিন্দু বা সরকারি প্রশাসনের দিক থেকে কোন বিরোধিতার সম্মুখীন হননি। কিন্তু প্রায় ১৮২৭ থেকে ১৮৩১ সালে মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীরের নেতৃত্বে গ্রাম-বাংলায় বিশেষত ২৪ পরগনা ও নদীয়ার অংশবিশেষে আন্দোলনের জনপ্রিয়তার প্রথম প্রকাশেই এটি নতুন হিন্দু জমিদারশ্রেণি ও গোমস্তাদের গভীর ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয় এবং এ ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে ইউরোপীয় নীলকরগণও হাত মিলায়।

হাজী শরীয়তউল্লাহ ১৭৯৯ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত মক্কায় বসবাস করেন। তিনি ছাত্রাবস্থায় উসমানীয় রাজশক্তির সঙ্গে আরবের ওহাবীদের দ্বন্দ্ব নিকট থেকে প্রত্যক্ষ করেন এবং লক্ষ্য করেন কিভাবে তারা উল্লিখিত সময়ের শেষভাগে উসমানীয় সুলতানের আদেশে খেদিভ মুহম্মদ আলী কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। হাজী শরীয়তউল্লাহ ধৈর্য ও সংযম অবলম্বন করেন এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে সম্পূর্ণরূপে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তন করে তাঁর আন্দোলন রক্ষা করেন।  [মঈন-উদ-দীন আহমদ খান]

গ্রন্থপঞ্জি  ww hunter The Indian Musalmans, Calcutta, 1936; Azizur Rahman mallick, British Policy and the Muslims of Bengal, 1757-1856, Dhaka, 1961; Muin-ud-Din Ahmad Khan, History of the Fara’idi Movement in Bengal, Karachi, 1965, Dhaka, 1984; Social History of the Muslims of Bangladesh under the British Rule, Dhaka, 1992.