মতুয়া

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২২:৩৯, ৪ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)

মতুয়া হিন্দুধর্মীয় একটি লোকসম্প্রদায়। গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারাকে বেগবান করার জন্য যে সহজ সাধনপদ্ধতি প্রবর্তন করেন, তাকে বলা হয় ‘মতুয়াবাদ’। এই মতবাদের অনুসারীরাই ‘মতুয়া’ নামে পরিচিত।

মতুয়া শব্দের অর্থ মেতে থাকা বা মাতোয়ারা হওয়া। হরিনামে যিনি মেতে থাকেন বা মাতোয়ারা হন তিনিই মতুয়া। মতান্তরে ধর্মে যার মত আছে সেই মতুয়া; অর্থাৎ ঈশ্বরে বিশ্বাস, গুরু-দেবতা-ব্রাহ্মণে ভক্তি-শ্রদ্ধা, নামে রুচি ও প্রেমে নিষ্ঠা আছে যার, সে-ই মতুয়া।

মতুয়া সম্প্রদায় একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী; তারা বৈদিক ক্রিয়া-কর্মে আস্থাশীল নয়। তাদের ভজন-সাধনের মাধ্যম হচ্ছে নাম সংকীর্তন; তাদের বিশ্বাস ভক্তিতেই মুক্তি। এই সাধনপদ্ধতির মাধ্যমে সত্যদর্শন অর্থাৎ ঈশ্বরলাভই তাদের মূল লক্ষ্য। প্রেম ঈশ্বর লাভের অন্যতম উপায়। পবিত্রতা শরীর-মনে প্রেম জাগ্রত করে; ফলে প্রেমময় হরি ভক্তের হূদয়ে আবির্ভূত হন। এখানে কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদ নেই, ধনী-দরিদ্র নেই; সকলেই ঈশ্বরের সন্তান এই মনোভাব নিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্যে সকলে মিলিত হয়।

আদর্শ গার্হস্থ্য জীবনযাপনের মধ্য দিয়েই মতুয়া ধর্মের চর্চা করা যায়। মতুয়াদের বারোটি নিয়ম পালন করতে হয়, যা ‘দ্বাদশ আজ্ঞা’ নামে পরিচিত।

মতুয়া উৎসব

এই ধর্মে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত এবং এতে বিধবা-বিবাহকে উৎসাহিত ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করা হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই ধর্মের প্রচার করতে পারে; ধর্মপ্রচারককে বলা হয় ‘গোঁসাই’।

মতুয়ারা প্রতি বুধবার একত্রিত হয়ে হরিস্মরণ করে; একে বলা হয় ‘হরিসভা’। তারা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নাম-কীর্তন করে এবং ভাবের আবেগে অনেক সময়  কীর্তন করতে করতে বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে পড়ে। কীর্তনের সময় তারা জয়ডঙ্কা, কাঁসর, শঙ্খ, শিঙ্গা ইত্যাদি  বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে।

গোঁসাইদের হাতে থাকে সওয়া হাত দীর্ঘ একটি দন্ড, যার নাম ‘ছোটা’। এই ছোটা নিয়ে তাঁরা আগে আগে যান এবং ভক্তরা তাঁদের অনুসরণ করে। তাঁরা সাদা রঙে বেষ্টিত লাল নিশান ও গলায় করঙ্গের মালা ধারণ করেন। মতুয়াদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত। মতুয়া ধর্মের কয়েকটি মূল বাণী হলো: ‘হরি ধ্যান হরি জ্ঞান হরি নাম সার। প্রেমেতে মাতোয়ারা মতুয়া নাম যার\; জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা। ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা\; কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলে খাই। বেদ-বিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই\

বাংলাদেশের সর্বত্রই মতুয়ারা বাস করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, আন্দামান প্রভৃতি স্থানেও মতুয়ারা রয়েছে। গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের ত্রয়োদশী তিথিতে হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিন উপলক্ষে সেখানে মেলা বসে। তাতে সমগ্র দেশ থেকে হাজার হাজার ভক্ত প্রণামী হিসেবে ধান-চাল-ডাল, তরি-তরকারি ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হয়।  [মনোরঞ্জন ঘোষ]

আরও দেখুন লোকসম্প্রদায়।