ভরত ভায়না


ভরত ভায়না  বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রকটি প্রত্নস্থল। যশোর জেলা এবং কেশবপুর উপজেলার অন্তর্গত ভরত ভায়না গ্রামে বুড়ীভদ্রা নদীর পশ্চিম তীরে প্রত্নস্থলটি অবস্থিত। দৌলতপুর থেকে ২০ কিমি দক্ষিণ-পূর্ব এবং কেশবপুর থেকে ১৮ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এর অবস্থান। পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে ১২.২০ মি উঁচু এই প্রত্নতাত্ত্বিক ঢিবিকে সমভূমির মাঝে একটি অনুচ্চ পাহাড়ের মতো দেখায়। স্থানীয় জনসাধারণের মতে ১৮৯৭-এর ভূমিকম্পের পূর্বে এই ঢিবি আরো উঁচু ছিল। সম্পূর্ণ মোচাকৃতি এই ঢিবির গোড়ার দিকের পরিধি প্রায় ২৫০ মি। জানা যায় যে, এই ঢিবি থেকে প্রচুর পরিমাণ ইট উঠিয়ে নিয়ে কাছেই একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। ঢিবির শীর্ষভাগের কাছাকাছি কয়েকটি অনিয়মিত গর্ত উক্ত ধ্বংস প্রক্রিয়ার স্বাক্ষর বহন করে।

১৯২২ সালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ ঢিবিটি সংরক্ষণ করে। কে.এন দীক্ষিত এই ঢিবিতে জরিপ পরিচালনা করেন এবং মন্তব্য করেন যে, ঢিবির নিচে পাঁচ শতকের প্রাচীন একটি বৌদ্ধ মন্দির আছে এবং এটি সম্ভবত হিউয়েন-সাং বর্ণিত সমতট এর ৩০টি সংঘারামের একটি। অতীতে ঢিবিটি কয়েক বারই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সম্প্রতি জমির মালিকরা চাষের জমি সম্প্রসারণের জন্য ঢিবির ঢাল থেকে উল্লেখযোগ্য অংশ কেটে সমতল করেছে। সতীশ চন্দ্র মিত্র বলেন সংঘারাম রক্ষার জন্য এ স্থানে একটি পরিখা ছিল।

ভরত ভায়না, যশোর

অবশ্য ঢিবির চতুর্দিকের বর্তমান ভূভাগ দেখে ধারণা করার কোন উপায় নেই যে, দীক্ষিত এবং মিত্রের অনুমান অনুযায়ী এখানে পরিখা পরিবেষ্টিত কোন সংঘারাম ছিল। অনুমানকৃত প্রাচীন মন্দিরটি ভরত নামধারী এক পৌরাণিক রাজা কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে প্রচলিত আছে। এ ঢিবি থেকে ২ কিমি দক্ষিণে গৌরীঘোনা নামক এক গ্রামে ভরত রাজার বাড়ি বলে কথিত এক প্রাচীন প্রত্নস্থলের ধ্বংসাবশেও আছে। পার্শ্ববর্তী গ্রাম কাশিমপুরে ডালিঝাড়া নামে অপর একটি ঢিবি আছে। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, এ স্থান ভরত রাজার একজন অমাত্যের বাসভূমি।

বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৫ সালে প্রথম এই ঢিবি খনন করে। এক দশক পর ১৯৯৫-৯৬ সালে পুনরায় এখানে খনন করা হয়। তখন থেকে ১৯৯৬-৯৭ বাদে ২০০০-০১ পর্যন্ত প্রতি মৌসুমে এখানে খনন কাজ অব্যাহত থাকে। অবশ্য খনন এখনও শেষ হয় নি।

খননের ফলে একটি স্থাপনার ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে, যা থেকে অনুমান করা যায় যে, স্থাপনাটির উপরিকাঠামো সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়ে গেছে। বিদ্যমান অংশ সম্ভবত উপরে স্থাপিত মনোরম অট্টালিকার ভিত্তি বা উঁচু মঞ্চ। এই অট্টালিকা এখন টিকে নেই। ভিত্তি অংশটুকু ক্রুশাকৃতির। এই ভিত্তি বিভিন্ন আকার (বর্গাকার এবং এক বা দুই পাশে উদ্গত অংশসহ আয়তকার) ও আয়তনের বদ্ধ প্রকোষ্ঠের সারির সমন্বয়ে গঠিত। প্রধান অট্টালিকাটি ছিল একটি মন্দির বা  স্তূপ। এ অট্টালিকা ভূপৃষ্ঠ থেকে ১১.৮৮ মি উঁচুতে একটি ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হয়। এই ভিত্তি বিভিন্ন আয়তন এবং বিভিন্ন দিকে (উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম) বিন্যস্ত প্রচুর সংখ্যক আড়াআড়ি দেয়াল ক্রমশ উপরের দিকে উন্নীত করে নির্মিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষবিশিষ্ট একটি কাঠামো। আড়াআড়ি স্থাপিত দেয়ালগুলির মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানসমূহে মাটি দ্বারা ভরাটের ফলে অসংখ্য বদ্ধ প্রকোষ্ঠের সৃষ্টি হয়। খননে বেশ কিছু বদ্ধ প্রকোষ্ঠ উন্মোচিত হয়। উন্মোচিত ধ্বংসাবশেষ দেখে মনে হয় মূল অট্টালিকার প্রধান কক্ষটি ঢিবির মধ্যস্থলে অবস্থিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষ বিশিষ্ট কাঠামোর বর্গাকার কেন্দ্রীয় ব্লকের উপর নির্মাণ করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্লক-এর বর্হিভাগের পরিমাপ ১১.৩০ মি × ১১.৩০ মি এবং চারটি বদ্ধ কক্ষ দ্বারা এটি গঠিত। এই কক্ষগুলির দেয়াল ভিত্তি কাঠামোর অন্যান্য কক্ষের দেয়ালের তুলনায় বেশ পুরু (২.৮০ মি)। কেন্দ্রীয় ব্লকের চারদিকে আরো তিন সারি করে বদ্ধ কক্ষ নির্মাণ করায় কাঠামোটি আয়তকার রূপ লাভ করে। এই বৃহৎ আয়তাকার কাঠামো পূর্ব-পশ্চিমে ৪৭.১০ মি এবং উত্তর-দক্ষিণে ৪২.১০ মি। বদ্ধ প্রকোষ্ঠের এই আয়তাকার ব্লকটির প্রতি দিকের মধ্যস্থল বরাবর একটি করে উদ্গত বাহু যোগ করা হয়েছে। প্রতিটি উদ্গত বাহু তিন-চারটি বদ্ধ কক্ষ দ্বারা গঠিত। এই উদ্গত অংশ আয়তাকার ব্লকটিকে ক্রুশের আকৃতি প্রদান করেছে। ক্রুশাকৃতির কাঠামোর গোড়ায় চারদিকে ৩ মি প্রশস্ত প্রদক্ষিণ পথ রয়েছে। ইমারতে বৃহদায়তনের ইট (৩৪ × ২২.৪ × ৫.৫ সেমি এবং ৩৫ × ২৩ × ৬ সেমি) ব্যবহূত হয়েছে।

স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ ছাড়া মাত্র কয়েকটি প্রত্নবস্ত্ত মূল্যবান যেমন গুপ্তযুগের একটি পোড়ামাটির মাথা, পোড়ামাটির মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরা, কয়েকটি মাটির প্রদীপ, অলংকৃত ইটের টুকরা, পদচিহ্ন সম্বলিত দুটি ইটের টুকরা এবং একটি মাটির ক্ষুদ্র পাত্র সংগৃহীত হয়েছে। স্বল্প সংখ্যক এসব প্রত্নবস্ত্তর মধ্যে দ’ুটি পোড়ামাটির ফলক বৃহদাকৃতির জন্য বিশেষ উল্লেখের দাবীদার। তন্মধ্যে একটি হলো সম্ভবত দন্ডায়মান নারীমূর্তি ও তার ডানপাশে সম্ভবত নরমূর্তি এবং বামপাশে একজন বাদক। নারী প্রধান ও নর মূর্তিদ্বয়ের যথাক্রমে কেবল পদদ্বয়ের নিম্নাংশ, নর ও বাম পায়ের নিম্নাংশ এবং বাদকের নিচ থেকে গলা পর্যন্ত বিদ্যমান। এ ছাড়া আরো কিছু বিচ্ছিন্ন টুকরা আছে। প্রধান মূর্তি দুটি বিদ্যমান অংশের পরিমাপ (৫৫ × ৪০ সেমি) থেকে অনুমান করা যায় যে, পোড়ামাটির ফলকটির পরিমাপ ছিল সম্ভবত ১.৪০ × ৭৫ মিটার।

অপর একটি পোড়ামাটির ফলক পোষাক পরিহিত একটি নর মূর্তির কেবল মধ্যবর্তী অংশ বিদ্যমান। এ অংশের (৩৪ × ২৭ সেমি) পরিমাপ থেকে মনে হয় অখন্ড ফলকটি প্রায় ১.৫০ মিটার দীর্ঘ ছিল। এ থেকে বলা যায় যে ভরত ভায়নায় আবিষৃকত এই পোড়ামাটির ফলক দুটি কেবল বাংলায় নয় বরং সমগ্র পূর্ব ভারতের বৃহত্তম ফলক। ফলক দুটির অধিকাংশ ভগ্ন ও বিলুপ্ত বিধায় মূর্তি দুটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। সংগৃহীত মৃৎপাত্রের টুকরাগুলি হলো বিভিন্ন গৃহস্থালি জিনিস যেমন কলসী, বাটি, পিরিচ, ঢাকনী, প্রদীপ, গোলাপদানীর উপরের অংশের গলা, কান্দা ও তলা। টুকরাগুলির বর্ণ ও বয়নে পার্থক্য রয়েছে। অধিকাংশ ঈষৎ লালাভ বর্ণের, সামান্য কিছু গাড় ছাই এবং ঈষৎ পীতাভ রঙের। প্রায় সব টুকরাই মোটা, সামান্য কিছু মধ্যম বয়নের। কিছু টুকরায় মাছের কাটা, সমান্তরাল রেখা, জাল ইত্যাদির নকশা রয়েছে। [শফিকুল আলম]

গ্রন্থপঞ্জি  Annual Report of the Archaeological Survey of India, 1921-22; SC Mitra, Yashohar Khulnar Itihas (Bangla), Calcutta, 1936; Md Shafiqul Alam, ‘Excavation at Bharat Bhayna Mound, Bangladesh: A Preliminary Report’, Man and Environment, XIII, 1989; Shihab Uddin Md. Akbar, ‘Bharat Bhaynay Pratnatattik Abishkar’ (Bangla), Pratnacarca-2, 2008