বরেন্দ্র বিদ্রোহ


বরেন্দ্র বিদ্রোহ পালরাজা দ্বিতীয় মহীপালের (আনু. ১০৭৫-১০৮০ খ্রি.) রাজত্বকালে সংঘটিত হয়। এ বিদ্রোহের ফলে দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যু ঘটে এবং কৈবর্ত প্রধান দিব্যের হাতে বরেন্দ্রের (উত্তর বাংলা) অধিকার চলে যায়। বরেন্দ্র বিদ্রোহ সম্পর্কে জানার একমাত্র উৎস হচ্ছে সন্ধ্যাকর নন্দীর বিখ্যাত কাব্য রামচরিতম্। এ কাব্যের প্রধান বিষয় হলো বরেন্দ্রের পতন এবং রামপাল কর্তৃক তা পুনরুদ্ধার।

দ্বিতীয় মহীপাল তাঁর দুই ভাই শূরপাল ও রামপালকে কারারুদ্ধ করেছিলেন বলে শোনা যায়। মহীপাল সন্দেহ পোষণ করেন যে, রামপাল রাজক্ষমতা দখল করে নিতে পারেন। অবশ্য একজন সক্ষম কনিষ্ঠ ভ্রাতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্ট উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সংকটের সম্ভাবনাকেও এক্ষেত্রে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং রামপালকে কারারুদ্ধ করার বিষয়ে সন্ধ্যাকর নন্দীর বর্ণনায় যদি কোন সত্যতা থেকেও থাকে তবে তা হয়ত রামপাল এবং দ্বিতীয় মহীপালের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতেরই পরিণতি। সম্ভবত এরই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে বরেন্দ্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। আলোচ্য বিদ্রোহের ঘটনা রামচরিতম্ ছাড়াও অপর ৩টি লিপিতাত্ত্বিক উৎসে উল্লিখিত হয়েছে।

বরেন্দ্র বিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি নির্ধারণ করা কঠিন। কোন কোন পন্ডিত মনে করেন যে, বরেন্দ্র বিদ্রোহ ছিল দ্বিতীয় মহীপালের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দিব্য এবং কৈবর্ত সম্প্রদায়ের বিদ্রোহ। এটিও বলা হয়ে থাকে যে, মাছ ধরা পেশার বিরুদ্ধচারণকারী বৌদ্ধ শাসকগণের অধীনে কৈবর্তরা বেশ কষ্টে দিনাতিপাত করছিল। বিদ্রোহিগণ ছিলেন রামপালের সমর্থক এমন ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু এরূপ ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বিদ্রোহের ফলে বরেন্দ্রের পতন ঘটে এবং রামপাল এ থেকে কোনক্রমেই লাভবান হন নি।

রামচরিতম্  কাব্যগ্রন্থে বরেন্দ্র বিদ্রোহ বর্ণিত হয়েছে ‘অনীকম্ ধর্ম্মবিপ্লবম্’ হিসেবে। গ্রন্থের টীকাকার ‘অনীকম্’ শব্দের ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘অলক্ষ্মীকম্’ (অপবিত্র বা অশুভ) হিসেবে, কিন্তু ‘ধর্ম্মবিপ্লবম্’ শব্দের কোন অর্থ তিনি দেন নি। ‘অনীকম্ ধর্ম্মবিপ্লবম্’-এর অর্থ করা হয়েছে ‘বেসামরিক বিদ্রোহ’ এবং একই সঙ্গে ‘কর্তব্য বা নীতি থেকে বিচ্যুতি’ হিসেবে। রামচরিতম্-এর ১/৩১ নং শ্লোকের টীকায় ব্যাখ্যাত হয়েছে মহীপাল কিভাবে তার জীবন হারান। বলা হয়ে থাকে যে, রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ষড়গুণে গুণান্বিত তাঁর মন্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে মহীপাল পাপাদিতে পূর্ণ হয়ে পড়েছিলেন এবং একটি অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ঐক্যবদ্ধ অসংখ্য সামন্ত প্রধানের (‘মিলিতানন্তসামন্তচক্র’) বিপুল সংখ্যক সৈন্যের সমাবেশ দেখে মহীপালের সৈন্যগণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধে তিনি প্রাণ হারান। রামচরিতম্ কাব্যের আলোচ্য অংশ থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, মহীপালের বিরোধীরা ছিল সামন্ত প্রধানদের একটি ‘চক্র’। রামচরিতম্-এর ১/৩৮ নং শ্লোক থেকে জানা যায় দিব্য মহীপালের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিয়োজিত ছিলেন এবং পরবর্তীকালে মহীপালের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে বরেন্দ্র অধিকার করেন। একই শ্লোকে দিব্যকে ‘উপধিব্রতী’ বলা হয়েছে এবং টীকাকার উপধিব্রতীর ব্যাখ্যা করেছেন ‘অবশ্য কর্তব্য পালন করার ভানকারী’ (অবশ্যকর্তব্যতয়া আরব্ধম্ কর্মব্রতম্ ছদ্মনি ব্রতী) হিসেবে। এই ব্যাখায় যে ইঙ্গিত রয়েছে তাতে মনে হয় যে, দিব্য রাজকর্মচারী হিসেবে বরেন্দ্র অধিকার করেছিলেন এই ভান করে যে, কর্তব্যবশে তিনি রাজার পক্ষেই বরেন্দ্র অধিকার করছেন। কিন্তু পরে তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণায় বিদ্রোহকারী সামন্তচক্রের সাথে তাঁর যে গোপন সম্পর্ক ছিল তাই প্রকাশ পায়। মহীপালের রাজত্বকালের শেষ সময় পর্যন্ত দিব্য ছিলেন রাজার পক্ষে এবং তাঁর মৃত্যুর পর তিনি বরেন্দ্রের অধিকার গ্রহণ করেন। ক্ষমতার রাজনীতির এই জটিল খেলা স্বভাবতই সন্ধ্যাকর নন্দীর কাছে ‘কুৎসিত’ ও ‘নিন্দনীয়’ বলে মনে হয়েছে এবং এ ঘটনাকেই তিনি ‘ধর্মবিপ্লব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

উপরের আলোচনা হতে এটি প্রতীয়মান হয় যে, দ্বিতীয় মহীপাল সামন্তদের মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে যেহেতু বরেন্দ্রের পতন ঘটে, সেহেতু মনে হয় সামন্তগণ উত্তর বাংলা অধিকার করেছিলেন। সে যুগে সামন্তদের বিদ্রোহ মোটেই কোন অসম্ভব ঘটনা নয়। সার্বভৌম রাজশক্তি এবং সামন্তদের মধ্যে সম্পর্কের প্রকৃতি নির্ভর করত মূলত উভয়ের তুলনামূলক শক্তির ওপর। একজন সামন্ত ততক্ষণই তাঁর অধিরাজের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করতেন যতক্ষণ তিনি (অধিরাজ) শক্তিশালী থাকতেন। সাম্রাজ্যে দুর্বলতার চিহ্ন দেখা দেওয়া মাত্র সামন্তগণ আনুগত্য অস্বীকার করতেন।

আলোচ্য দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে বরেন্দ্র বিদ্রোহকে কেবল কৈবর্তদের বিদ্রোহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা চলে না; বরং এটি ছিল উত্তর বাংলার কয়েকজন শক্তিশালী সামন্তপ্রধান কর্তৃক দুর্বল পাল রাজাকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উদ্যোগ। ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব এবং মহীপাল কর্তৃক দুই ভাইকে কারারুদ্ধ করার ঘটনা খুব সম্ভবত পালদের দুর্বলতারই ইঙ্গিত প্রদান করে এবং বিদ্রোহী সামন্তগণ দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে একটি চক্র গড়ে তোলেন। কৈবর্ত সম্প্রদায়ের প্রধান এবং রাজকীয় কর্মচারী দিব্য খুব সম্ভবত এই চক্র গড়ে তুলতে সহায়তা করেন এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাঁর পূর্বসম্বন্ধের বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যখন দিব্য বরেন্দ্রে স্বাধীন রাজত্বের সূচনা করেন।

এরপর বরেন্দ্রে একে একে দিব্য, তাঁর ভাই রুদক এবং রুদকের পুত্র ভীম শাসন পরিচালনা করেন। শেষ গুরুত্বপূর্ণ পালরাজা রামপাল (আনু. ১০৮২-১১২৪ খ্রি.) উত্তর বাংলায় পাল কর্তৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]