রামচরিতম্


রামচরিতম্  সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত একটি সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থটির গুরুত্ব এই যে, এটি এগারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে বারো শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলার অবস্থার ওপর আলোকপাত করে। রামচরিতম্ বরেন্দ্রের (উত্তর বাংলা) একজন কবি কর্তৃক বাংলায় বসে রচিত একমাত্র সংস্কৃত গ্রন্থ, যার মূল বিষয়বস্ত্ত সমকালীন ঐতিহাসিক ঘটনা। একারণে গ্রন্থটি পরবর্তী পালযুগের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।

লেখক পাল বংশের শেষ রাজা মদনপালের (১১৪৩-১১৬২ খ্রি) পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তিনি এই রাজার দীর্ঘায়ু কামনা করে কাব্যের সমাপ্তি টানেন। তাঁর পিতা প্রজাপতি নন্দী ছিলেন রামপালের (আনু. ১০৮২-১১২৪ খ্রি) ‘সান্ধিবিগ্রÖ্রহক’ (শান্তি ও যুদ্ধ মন্ত্রী)। পুন্ড্রবর্ধনপুর শহরের (সম্ভবত পুন্ড্রনগরের সাথে অভিন্ন) নিকটবর্তী বৃহদ্বটু গ্রামে ছিল তাঁর আদি নিবাস।

রামচরিতম্ ‘কবি প্রশস্তি’ শিরোনামে ২০ শ্লোকের পরিশিষ্টসহ ২১৫টি (যদিও বৌদ্ধ অনুলিপিকার শীলচন্দ্র ২২০টি শ্লোকের উল্লেখ করেছেন) শ্লোক রয়েছে। শ্লোকগুলি অসামান্য সংস্কৃত শব্দালঙ্কার ‘শ্লেষ’ (দ্ব্যর্থবোধক) রীতিতে রচিত। এগুলিতে শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে একই সাথে দুটি ভিন্ন অর্থ প্রকাশ পেয়েছে। দ্ব্যর্থবোধক এই কাব্যটি এক অর্থে সুপরিচিত রামায়ণ এর কাহিনী এবং অন্য অর্থে বাংলার পালবংশের রাজা রামপালের ইতিহাস পাওয়া যায়। শ্লোকগুলির দ্বিতীয় অর্থ বোঝা যায় প্রাপ্ত দুটি পান্ডুলিপির একটিতে উল্লিখিত ‘টীকা’ অংশ থেকে, যা দ্বিতীয় সর্গের ৩৫তম শ্লোকে সমাপ্ত হয়েছে। ফলে কাব্যটির দ্বিতীয় সর্গের শেষ ১৪টি এবং তৃতীয় ও চতুর্থ সর্গের প্রত্যেকটির ৪৮টি শ্লোকের দ্বিতীয় অর্থ পুনর্গঠন করা কঠিন।

সন্ধ্যাকর নন্দী মাত্র ১০টি শ্লোকে পালদের প্রাথমিক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন এবং গ্রন্থের অবশিষ্ট অংশে রয়েছে তাঁর মূল বিষয়ের ওপর আলোচনা। তিনি রামপালের কাহিনীকে মহাকাব্যিক ব্যক্তিত্ব রামের কাহিনীর সাথে মিলিয়ে এক করে বর্ণনা করেছেন। কৈবর্ত্য প্রধান দিব্য কর্তৃক বরেন্দ্র জয়কে তিনি রাবণ কর্তৃক সীতা অপহরণের সাথে এক করেছেন; আর রাম কর্তৃক সীতা উদ্ধারের ঘটনাকে রামপাল কর্তৃক বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের সাথে এক করেছেন। তারপর তিনি গ্রন্থের শেষ দুটি সর্গে মদনপালের শাসন পর্যন্ত পালরাজাদের ইতিহাস বর্ণনা অব্যাহত রাখেন। ‘কবিপ্রশস্তি’ শিরোনামে একটি পরিশিষ্ট সংযোজন করে তিনি তাঁর বংশবৃত্তান্তসহ নিজেকে কলিকালের ‘বাল্মীকি’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর রচনার প্রকৃতি ও রীতি সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করেছেন।

ঐতিহাসিকগণ মূলত দ্বিতীয় মহীপালের সময়ের ‘বরেন্দ্র বিদ্রোহ’ তথা কৈবর্ত প্রধান দিব্য কর্তৃক বরেন্দ্র অধিকার এবং রামপাল কর্তৃক তা পুনরুদ্ধারের ইতিহাসের জন্য গ্রন্থটির কাছে ঋণী। রামপাল সম্পর্কে জানার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস। কাব্যগ্রন্থটিতে এর কেন্দ্রীয় চরিত্র রামপাল সম্পর্কে রয়েছে বিস্তৃত বর্ণনা। মদনপালের রাজত্বের প্রাথমিক সময় পর্যন্ত নন্দী তাঁর বিবরণ অব্যাহত রাখেন। তথাপি কাব্যের মূল চরিত্র রামপালের প্রতি নন্দীর পক্ষপাতিত্ব স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়। এক্ষেত্রে কাব্যের প্রশস্তিমূলক বর্ণনা থেকে সঠিক ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

তৃতীয় সর্গের প্রথম ১৮টি শ্লোকে বরেন্দ্রের বিস্তৃত বিবরণের জন্যও রামচরিতম্ মূল্যবান। গঙ্গা (পশ্চিমে) এবং করতোয়ার (পূর্বে) মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত বরেন্দ্রের উদ্ভিদ ও প্রাণিকূল, প্রাসাদ ও বাগান, ধর্মীয় স্থান, নগর (বিশেষত রামাবতী) এবং প্রতিষ্ঠানাদির (বিশেষ করে জগদ্দল মহাবিহার) বিবরণ এ কাব্যে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যদিও অতিরঞ্জিত শব্দচয়নের মাধ্যমে।

এটি প্রাচীন অথবা মধ্যযুগের প্রাথমিককালের ইতিহাসের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক উপাদান। এ কাব্যগ্রন্থে যেসময়ের বর্ণনা রয়েছে সেসময়ের ইতিহাস পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সমসাময়িক রচনা হিসেবে এর মূল্য অপরিসীম।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ কাব্যের একটি তালপাতার পান্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং ১৯১০ সালে তা প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে ১৯৩৯ এবং ১৯৫৩ সালে যথাক্রমে ইংরেজি ও বাংলায় অনূদিত এ গ্রন্থের আরও দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]

গ্রন্থপঞ্জি  RC Majumdar et al (ed), Ramacarita, Rajshahi, 1939; Radhagovinda Basak (Rev. edn), Ramacaritam of Sandhyakaranandin, Calcutta, 1969.