প্রাকৃত


প্রাকৃত  মধ্যভারতীয় আর্যভাষা। প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা বৈদিক বা  সংস্কৃত থেকে এর উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। সংস্কৃত ভাষার যে রূপটি ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, তা এক সময় শিথিল ও সরল হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ ধারণ করে। কালক্রমে এগুলিকেই বলা হয় প্রাকৃত ভাষা।

প্রাকৃত ভাষার নামকরণ প্রসঙ্গে কেউ কেউ বলেন যে, এর প্রকৃতি বা মূল হচ্ছে ‘সংস্কৃত’, তাই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত বলে এর নাম হয়েছে প্রাকৃত। আবার কেউ কেউ বলেন, ‘প্রকৃতি’ অর্থ সাধারণ জনগণ এবং তাদের ব্যবহূত ভাষাই প্রাকৃত ভাষা, অর্থাৎ প্রাকৃত জনের ভাষা প্রাকৃত ভাষা। তাই সংস্কৃত নাটকে দেখা যায় নীচ শ্রেণীর অশিক্ষিত পাত্র-পাত্রীর ভাষা প্রাকৃত। তবে প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার শুধু এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এ ভাষায় অনেক মূল্যবান গ্রন্থও রচিত হয়েছে, যথা: গুণাঢ্যের বড্ডকহা বা বৃহৎকথা (আনু. ১ম শতক), হালের গাহাসত্তসঈ বা গাথাসপ্তশতী (আনু. ২য়-৩য় শতক), বাক্পতিরাজের গউডবহো বা গৌড়বধ (৮ম শতক) প্রভৃতি। হয়তো বিদ্বানদের ভাষা সংস্কৃত ছিল বলে সাহিত্যে এ ভাষাই প্রাধান্য পায়, আর প্রাকৃত হয়ে যায় কেবল সাধারণ লোকের ভাষা। প্রাকৃত ভাষার উৎপত্তি ও স্থিতিকাল মোটামুটিভাবে খ্রিস্টপূর্ব ৫ম/৬ষ্ঠ থেকে খ্রিস্টীয় ১০ম/১১শ শতক পর্যন্ত ধরা হয়।

প্রাকৃত ভাষা প্রধানত পাঁচ প্রকার মহারাষ্ট্রী, শৌরসেনী, মাগধী, অর্ধমাগধী ও পৈশাচী। গুরুত্ব বিচারে মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতই শ্রেষ্ঠ। এর আদি নাম ছিল ‘দাক্ষিণাত্যা’, কিন্তু মহারাষ্ট্র অঞ্চলের ভাষা বলে স্থান-নামের প্রভাবে এর নতুন নাম হয় ‘মহারাষ্ট্রী’। হালের গাহাসত্তসঈ, বাক্পতিরাজের গউডবহো, সংস্কৃত নাট্যে নীচ শ্রেণীর পাত্র-পাত্রীর সংলাপ ও সঙ্গীতে এ ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। মহারাষ্ট্রী প্রাকৃতের প্রধান কয়েকটি লক্ষণ হলো: ব্যঞ্জনবর্ণের লোপ, সংস্কৃত স-স্থানে হ ইত্যাদি।

মহারাষ্ট্রীর পরে শৌরসেনীর অবস্থান। এটি মথুরা অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। মথুরার রাজা শূরসেনের নামানুসারে এর নাম হয় ‘শৌরসেনী’। এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি লক্ষণ হলো: সংস্কৃত ত-স্থানে দ, থ ও হ-স্থানে ধ ইত্যাদি। সংস্কৃত নাটকে সাধারণ নারী ও অশিক্ষিত পুরুষ এ ভাষায় কথা বলত।

মাগধী প্রাকৃত ছিল পূর্বভারতীয় মগধের ভাষা, তাই এর নাম হয়েছে ‘মাগধী’। সংস্কৃত নাট্যে নীচ শ্রেণীর পাত্র-পাত্রীর সংলাপে এ ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। অশ্বঘোষের নাটক, কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম্, শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকম্ প্রভৃতি গ্রন্থে এ ভাষার প্রাচীনতম রূপটি দেখা যায়। এ ভাষার বিশেষ কয়েকটি লক্ষণ হলো: কেবল শ-র ব্যবহার, র-স্থানে ল, জ-স্থানে য, ত-স্থানে দ/ড, ব্যঞ্জনবর্ণের লোপ ইত্যাদি। এই মাগধী প্রাকৃত থেকেই বাংলাসহ পূর্বভারতীয় আধুনিক ভাষাসমূহের উৎপত্তি হয়েছে।

অর্ধমাগধীর ব্যবহার জৈনদের মধ্যে বেশি প্রচলিত ছিল। জৈনশাস্ত্রসমূহ এ ভাষায়ই রচিত। তাই একে জৈনপ্রাকৃতও বলা হয়। অশ্বঘোষ ও ভাসের নাটক ছাড়া আর কোথাও এর ব্যবহার নেই। অর্ধমাগধী প্রাকৃতের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো: পদান্ত অ-স্থানে এ/ও, কেবল স-এর ব্যবহার, ব্যঞ্জনবর্ণের লোপ ইত্যাদি।

পৈশাচী প্রাকৃত পিশাচদের ভাষা এরূপ একটি মতবাদ প্রচলিত আছে। এর মূল কেন্দ্র ছিল ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল। গুণাঢ্যের বৃহৎকথা এ ভাষায় রচিত। পৈশাচী প্রাকৃতের প্রধান কয়েকটি লক্ষণ হলো: ণ-স্থানে ন, গ-স্থানে ক, ঘ-স্থানে খ, জ-স্থানে চ ইত্যাদি। এ ছাড়া প্রাকৃতের আরও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো পদান্তে ম-স্থলে ং, যুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি শব্দের আদিতে ছাড়া অন্যত্র যুগ্মধ্বনিতে পরিণত হওয়া, শব্দরূপ ও ধাতুরূপে দ্বিবচন বিলুপ্ত হওয়া ইত্যাদি।

প্রাকৃত ভাষার ক্রমবিবর্তনে তিনটি স্তর লক্ষ্য করা যায় আদি বা মৌখিক প্রাকৃত, সাহিত্যিক প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ-অবহট্ঠ। প্রথম স্তরের স্থিতিকাল ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫ম/৬ষ্ঠ থেকে খ্রিস্টীয় ১ম শতক। এ সময় প্রাকৃতের শুধু মৌখিক ব্যবহার ছিল, সাহিত্যে এর কোন ব্যবহার ছিল না। বিভিন্ন শিলালেখ, তাম্রলিপি এবং অশোকের অনুশাসনেও এ ভাষা ব্যবহূত হতো।

দ্বিতীয় স্তরের স্থিতিকাল খ্রিস্টীয় ১ম থেকে ৬ষ্ঠ শতক পর্যন্ত। এ সময় বিভিন্ন প্রাকৃতে মূল্যবান গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং সংস্কৃত নাটকে নীচ পাত্র-পাত্রীর সংলাপেও এ ভাষা ব্যবহূত হয়েছে। তৃতীয় স্তরের স্থিতিকাল ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম/১১শ শতক পর্যন্ত। পরে বিভিন্ন আধুনিক ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য সেসব আধুনিক ভাষার পাশাপাশি ১৮শ শতক পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে এ ভাষার ব্যবহার হয়েছে।

প্রাকৃতে যথার্থ সাহিত্যচর্চার নিদর্শন পাওয়া যায় দ্বিতীয় স্তরে অর্থাৎ সাহিত্যিক প্রাকৃতে। এ সময় জৈন ধর্মমূলক এবং ধর্মনিরপেক্ষ এ দুধারায় সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। জৈনদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ আগমশাস্ত্র বা সিদ্ধান্ত (আয়রঙ্গসুত্ত, সূয়কড়ঙ্গসুত্ত ইত্যাদি) খ্রিস্টীয় ৫ম শতকের মধ্যে রচিত। এতে জৈনাচার্য মহাবীরের বাণী লিপিবদ্ধ হয়েছে। এছাড়া আগমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ নিজ্জুত্তি, চুণ্ণী, পউমচরিঅম্ (জৈন রামায়ণ), হরিবংশপুরাণ (জৈন মহাভারত) এবং জৈন আচার্য ও তীর্থঙ্করদের জীবনী অবলম্বনে বিভিন্ন চরিতকাব্যও রচিত হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষ প্রাকৃত সাহিত্য ছিল গণজীবনের একেবারে কাছাকাছি। এতে সামাজিক উপাদান ছিল সবচেয়ে বেশি। এ সাহিত্যকে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়: সংস্কৃত নাটকে সংলাপ ও গীতিকবিতা, মহাকাব্য, নীতিকাব্য, ঐতিহাসিক কাব্য ও কথানক কাব্য। প্রাকৃত ভাষার প্রথম সাহিত্যিক প্রয়োগ দেখা যায় সংস্কৃত নাটকে। নাট্যকাররা নীচ শ্রেণির পাত্র-পাত্রীর মুখে বিভিন্ন প্রাকৃত ভাষা দিয়েছেন। এভাবে চরিত্র অনুযায়ী ভাষা ব্যবহারের ফলে নাট্যকাহিনীর বাস্তবতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাস-কালিদাসসহ বিভিন্ন বাঙালি রচিত সংস্কৃত নাটকেও এ রীতি অনুসৃত হয়েছে। ভরতের নাট্যশাস্ত্রম্, কালিদাসের বিক্রমোর্বশীয়ম্, শূদ্রকের মৃচ্ছকটিকম্ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রেমবিষয়ক অনেক গীতিকবিতা প্রাকৃতে রচিত হয়েছে। এছাড়া স্বতন্ত্রভাবেও অনেক গীতিকবিতা রচিত হয়েছে, যা পরে গাহাসত্তসঈ, বজ্জালবগ্গ (আনু. ১১শ শতক) ইত্যাদি কোষগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।

প্রাকৃত গাথাকাব্যের মতো অপভ্রংশেও এক শ্রেণির কাব্য রচিত হয়েছে, যা দোহা বা দোহাকোষ নামে পরিচিত। এর কবিতাগুলিতে অন্ত্যানুপ্রাস অর্থাৎ চরণান্ত মিল দেখা যায়। পরবর্তীকালে বাংলাসহ অন্যান্য আধুনিক সাহিত্যে অন্তমিলের এই রীতি অনুসৃত হয়েছে। দোহাকোষগুলিতে ধর্মসাধনার সহজ উপদেশ মর্মস্পর্শী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। এই দোহাকোষগুলি বাংলা ভাষার উৎপত্তিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

প্রাকৃত মহাকাব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবর সেনের রাবণবহো বা রাবণবধ (৫ম/৬ষ্ঠ শতক), বাক্পতিরাজের গউড়বহো বা গৌড়বধ (৮ম শতক), পুষ্পদন্তের (১০ম শতক) জসহরচরিউ বা যশোধরচরিত ও নায়কুমারচরিউ বা নাগকুমারচরিত, গুণচন্দ্র গণীর মহাবীরচরিয় বা মহাবীরচরিত (১১শ শতক), কোঊহলের লীলাবঈকহা বা লীলাবতীকথা, হেমচন্দ্রের (১০৮৮-১১৭২) কুমারপালচরিয় বা কুমারপালচরিত প্রভৃতি। প্রথমটিতে রামায়ণের রাবণবধ এবং দ্বিতীয়টিতে গৌড়রাজের নিধন কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থটিতে যথাক্রমে রাজা যশোধর এবং জৈনাচার্য নাগকুমারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। জৈনগুরু মহাবীরের কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে মহাবীরচরিয় এবং সিংহল রাজকন্যা লীলাবতীর প্রণয়কাহিনী অবলম্বনে রচিত হয়েছে লীলাবঈকহা। কুমারপালচরিয়ের কাহিনী অন্হিলবাদের রাজা কুমারপালের জীবনী।

নীতিকাব্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জিনদত্ত সূরির চ্চচরী, উপদেশরসায়নরাস ও কালস্বরূপকুলকম্। এগুলিতে গুরু জিনবল্লভ সূরির বন্দনা এবং নানাবিষয়ক উপদেশমালা লিপিবদ্ধ হয়েছে। প্রাকৃত ঐতিহাসিক কাব্য হিসেবে উপর্যুক্ত গৌড়বহো, লীলাবঈকহা এবং কুমারপালচরিয়ের নাম প্রথমেই উল্লেখ করা যায়। এগুলিতে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য আছে। এছাড়া জিনপ্রভ সূরির তীর্থকল্প গ্রন্থটির নামও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এতে এমন অনেক রাজা ও তীর্থের নাম আছে যা ইতিহাস রচনায় সহায়ক হতে পারে।

প্রাকৃত কথানক কাব্য হচ্ছে আগমগ্রন্থের ভাষ্যান্তর্গত বিভিন্ন উপকথা। এ বিষয়ে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য ভবদেব সূরির কালকাচার্য কথানক। এটি গদ্যে-পদ্যে রচিত। এতে ধর্মব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রচুর সাহিত্যরসের উপাদান আছে। এছাড়া আরও কয়েকটি গ্রন্থ হলো শ্রীচন্দ্রের কথাকোষ (১২শ শতক), সোমচন্দ্রের কথামহাবোধি (১৫শ শতক), গুণাঢ্যের বড্ডকহা প্রভৃতি। বড্ডকহা শুধু প্রাকৃতেই নয়, সংস্কৃত গল্পসাহিত্যেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাই পরবর্তীকালে এটি অবলম্বনে সংস্কৃতে রচিত হয়েছে সোমদেবের কথাসরিৎসাগর, ক্ষেমেন্দ্রের বৃহৎকথামঞ্জরী এবং বুদ্ধস্বামীর বৃহৎকথা।

প্রাকৃত ভাষায় অনেক গদ্যপ্রধান রচনাও রয়েছে। সেসবের মধ্যে আছে কাহিনীমূলক সাহিত্য, নাটক,  ব্যাকরণঅভিধানছন্দজ্যোতিষ ও  দর্শন। কৃষ্ণকথা অবলম্বনে সঙ্ঘদাস ও ধর্মসেন গণী রচিত বসুদেবহিন্ডী এবং হরিভদ্র সূরির সমরাইচ্চকহা (সমরাদিত্যকথা) উল্লেখযোগ্য কাহিনীকাব্য। প্রাকৃত সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো নাট্যশাখা ততটা বিকশিত হয়নি। এক্ষেত্রে রাজশেখরের কর্পূরমঞ্জরী (১০ম শতক), নয়চন্দ্রের রম্ভামঞ্জরী (১৫শ শতক), রুদ্রদাসের চন্দ্রলেখা (১৭শ শতক), বিশ্বেশ্বরের শৃঙ্গারমঞ্জরী (১৮শ শতক) উল্লেখযোগ্য।

প্রাকৃত ব্যাকরণের ইতিহাস খুবই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। ব্যাকরণ রচয়িতা হিসেবে শাকল্য, কোহল, বামনাচার্য, সমন্তভদ্র প্রমুখের নাম জানা গেলেও তাঁদের গ্রন্থ পাওয়া যায় না। এঁদের পরে বররুচির প্রাকৃতপ্রকাশ, হেমচন্দ্রের শব্দানুশাসন, ত্রিবিক্রমের প্রাকৃত ব্যাকরণ, মার্কন্ডেয়ের প্রাকৃতসর্বস্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হেমচন্দ্র প্রাকৃত ব্যাকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছেন। প্রাকৃতে অভিধানও খুব একটা রচিত হয়নি। ধনপালের পাইয়লচ্ছী-নামমালা (১০ম শতক) এবং হেমচন্দ্রের দেশি-নামমালা (১২শ শতক) গ্রন্থদুটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয়টিতে অজ্ঞাতমূল দেশি ও আঞ্চলিক শব্দসমূহ সংকলিত হয়েছে।

প্রাকৃত ছন্দ নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে। ছন্দোবৈচিত্র্য প্রাকৃত কাব্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রাকৃতে অনেক ছন্দোগ্রন্থ রচিত হয়েছে, তবে পিঙ্গলের প্রাকৃতপৈঙ্গল এক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এতে প্রাকৃত ও  অপভ্রংশ উভয় ছন্দ সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। বাংলা ছন্দের উৎপত্তি ও বিকাশে প্রাকৃত ছন্দের প্রভাব সংস্কৃত ছন্দের চেয়েও বেশি।

প্রাকৃতে যেসব দর্শনগ্রন্থ রচিত হয়েছে তার অধিকাংশই জৈনদর্শনবিষয়ক। খ্রিস্টীয় ১ম-২য় শতকের তিনটি বিখ্যাত দর্শনগ্রন্থ হলো প্রবচনসার, নিয়মসার এবং পঞ্চাস্তিকায়সার। বিখ্যাত জৈন দার্শনিক সিদ্ধান্ত চক্রবর্তী নেমিচন্দ্র দ্রব্যসংগ্রহ ইত্যাদি পাঁচটি গ্রন্থ রচনা করেন। পরবর্তীকালে এ বিষয়ে আরও অনেক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। জ্যোতিষ বিষয়ে প্রাকৃতে বেশ কিছু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তার মধ্যে দিগম্বর জৈনাচার্য দুর্গাদেবের রিষ্ট সমুচ্চয় সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি অর্ঘকান্ড ও মন্ত্রমহোদধি নামে আরও দুটি জ্যোতিষগ্রন্থ রচনা করেন।

প্রাকৃত-অপভ্রংশ ভাষায় রচিত যেসব গ্রন্থের কথা এখানে উল্লেখ করা হলো তাতে তৎকালীন সমাজের অনেক চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সে যুগের সাধারণ মানুষের জীবন-যাপন, তৎকালীন ভারতের জ্ঞান ও শিল্পসাধনা, দ্যূতক্রীড়া, ব্যভিচার, পানদোষ, চৌর্যবৃত্তি, প্রকৃতির বর্ণনা ইত্যাদি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। [শাশ্বতী হালদার]