প্রজ্ঞাপারমিতা


প্রজ্ঞাপারমিতা  মহাযান পন্থায় বোধিসত্ত্বের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। একে অবলম্বন করে মহাযানী বৌদ্ধদের পবিত্র গ্রন্থ প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র রচিত হয়েছে। এ নামে মহাযানী বৌদ্ধদের একজন দেবীও রয়েছেন। ‘প্রজ্ঞা’ শব্দের অর্থ এখানে পারমার্থিক জ্ঞান এবং ‘পারমিতা’ অর্থ পরিপূর্ণতা। ভাবী বুদ্ধ বোধিসত্ত্বের পক্ষে এ জ্ঞানের পূর্ণতা অর্জন একান্ত অপরিহার্য। মহাযানে পারমিতা ছয়টি: দান, শীল, ক্ষান্তি, বীর্য, ধ্যান ও প্রজ্ঞা।  হীনযান অনুসারে পারমিতা দশটি: দান, শীল, নৈষ্ক্রম্য, প্রজ্ঞা, বীর্য, ক্ষান্তি, সত্য, অধিষ্ঠান, মৈত্রী ও উপেক্ষা।  মহাযান মতে প্রথম পঞ্চ পারমিতা (বা পারমী) পূর্ণ হলে পুণ্যসম্ভার অর্জিত হয় এবং প্রজ্ঞা দ্বারা সে পুণ্যসম্ভার পরিশোধিত হলে জ্ঞানসম্ভার লাভ হয়। এ জ্ঞানসম্ভারের দ্বারাই  বোধিসত্ত্ব বুদ্ধত্ব লাভে সমর্থ হন।

মহাযান মতে ছয়টি পারমিতার মধ্যে দান হচ্ছে বোধিসত্ত্ব কর্তৃক সব জীবের হিতার্থে নিঃশেষে দান করা। এতে জাগতিক বিষয়ের প্রতি তাঁর স্বত্ববোধ বিলুপ্ত হয়। শীল হচ্ছে কায়িক, বাচনিক ও মানসিকভাবে সব গর্হিত কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতে আত্মসংযম অর্জিত হয়। ক্ষান্তি মানে ক্ষমা। অপরের দোষ, অপকার, তিরস্কার, দুর্ব্যবহার, অপমান ইত্যাদি সানন্দ চিত্তে মার্জনা করাই ক্ষান্তি। এর ফলে চিত্তবিকার দেখা দেয় না এবং লক্ষ্যচ্যুতি ঘটারও সম্ভাবনা থাকে না। বীর্য হচ্ছে যেকোনো ভাল কাজে উৎসাহ। এর ফলে বোধিসত্ত্ব জগতের সব প্রাণীর দুঃখভার গ্রহণে সমর্থ হন। ধ্যান হচ্ছে পারমার্থিক জ্ঞানার্জনের পূর্ববর্তী সহায়ক কর্ম। এর মাধ্যমে বোধিসত্ত্ব লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিত্তের একাগ্রতা অর্জন করেন। প্রজ্ঞা হচ্ছে সেই জ্ঞান যার উদয়ে বোধিসত্ত্ব জগতের অনিত্যতা, প্রকৃত সত্যাসত্য ইত্যাদি অনুভব করতে পারেন। এর প্রভাবেই জীবের দুঃখরাশির উপশম হয়। হীনযান, মহাযান উভয় মতবাদেই প্রজ্ঞাপারমিতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনাও করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপারমিতার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র বা অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতাসূত্র। গ্রন্থটিতে ছয়টি পারমিতার মধ্যে প্রজ্ঞাপারমিতা সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে সংস্কৃতে রচিত এ বৃহদাকার গ্রন্থের রচয়িতা অজ্ঞাত। এর শ্লোকগুলি প্রশ্নোত্তর আকারে কথোপকথনরূপে রচিত। প্রধান বক্তা বুদ্ধ এবং তাঁর শিষ্য সারিপুত্র ও সুভূতি প্রশ্নকর্তা। এতে প্রধানত মহাযানী দার্শনিক তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিখ্যাত দার্শনিক নাগার্জুনের শূন্যবাদ দর্শন এর ওপর ভিত্তি করেই প্রবর্তিত। ১৫৯ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি চীনা ভাষায় অনূদিত হয়।  [রেবতপ্রিয় বড়ুয়া]