বোধিসত্ত্ব


বোধিসত্ত্ব আধ্যাত্মিক মুক্তিকামী ব্যক্তি। ‘বোধি’ অর্থ জ্ঞান এবং ‘সত্ত্ব’ অর্থ প্রাণী বা জীব। এখানে বোধি বলতে সেই জ্ঞানকে বোঝায় যার অনুশীলনে জীবের দুঃখনিবৃত্তি ঘটে। এ জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে বারবার জন্মগ্রহণ করতে হয় এবং প্রতিজন্মেই অপরের দুঃখনিবৃত্তির জন্য কাজ করতে হয়। কথিত হয় যে, সিদ্ধার্থ গৌতম ৫৫০ বার জন্মগ্রহণ করে জগতের সকল জীবের মুক্তি কামনা করেন। এ পূর্বজন্মসমূহে তাঁকে বোধিসত্ত্ব বিশেষণে ভূষিত করা হয়। এভাবে বোধিসত্ত্ব হিসেবে সাধনা করে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে (৫২৮ খ্রি.পূ) তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। তাঁর বুদ্ধত্ব লাভের সময়টি ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। এ সময় তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে অতীত জীবনের সকল কথা স্মরণ করেন, যা জাতকের গল্প হিসেবে সংরক্ষিত হয়েছে।  মহাযান বৌদ্ধধর্মে বোধিসত্ত্বের আদর্শকে সর্বোচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে।

মহাযানী বৌদ্ধরা নিজেদের বোধিসত্ত্ব বলে মনে করেন, তাই মহাযানকে বোধিসত্ত্বযানও বলা হয়। বোধিসত্ত্ব সকল জীবের জন্য অসীম করুণা ও মৈত্রী অনুভব করেন। তিনি দুঃখজর্জরিত প্রাণীদের উদ্ধারে বিগলিতপ্রাণ। জগতের কল্যাণ সাধনেই বোধিসত্ত্বজীবনের সার্থকতা। বিশ্বের একটি প্রাণীও যদি দুঃখানুভব করে, অমুক্ত থাকে তবে তিনি নিজের মুক্তিকে তৃণবৎ ত্যাগ করেন। বোধিসত্ত্বের এ কল্যাণচেতনাই বোধিচিত্ত। বোধিচিত্ত অর্জিত হলেই সর্বার্থ সিদ্ধ হয়, ভবসাগর থেকে উত্তীর্ণ হয়ে নির্বাণমার্গে উপনীত হওয়া যায়। জগতের সকল প্রাণীর জন্য বোধিসত্ত্ব এরূপ করুণা অনুভব করেন বলে তিনি পরমকরুণাময়। ক্ষেমেন্দ্রের বোধিসত্ত্বাবদানকল্পলতা গ্রন্থে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

জন্মের ক্রমানুসারে বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন রূপ কল্পনা করা হয়। তাঁর প্রথম রূপ হচ্ছে অবলোকিতেশ্বর। অবলোকিতেশ্বর করুণার আধার। মঞ্জুশ্রী বোধিসত্ত প্রজ্ঞার আধার। বজ্রপাণি, বজ্রগর্ভ, জ্ঞানগর্ভ, ক্ষিতিগর্ভ, রত্নগর্ভ, আকাশগর্ভ, সূর্যগর্ভ, মৈত্রেয় প্রভৃতি বোধিসত্ত্বের কল্পনা করা হয়। বোধিসত্ত্বের এরূপ রূপকল্পনা মূলত গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মসমূহের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। বোধিসত্ত্বের এ ধারণা ভারতবর্ষ থেকে এশিয়ার সমগ্র অঞ্চলে (চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, নেপাল, তিববত, ভুটান, সিকিম প্রভৃতি) ছড়িয়ে পড়ে। ওইসব অঞ্চলের মানুষ আজও বোধিসত্ত্বের আদর্শে নিজেদের উৎসর্গ করে চলেছেন।  [রেবতপ্রিয় বড়ুয়া]