পাকিস্তান লেখক সংঘ


পাকিস্তান লেখক সংঘ  সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জাতীয় আদর্শ সমন্বিতকরণ ও বিকাশের লক্ষ্যে গঠিত একটি সংগঠন। ১৯৫৯ সালের ২৯-৩১ জানুয়ারি করাচির গোয়ানিজ হলে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান লেখক সম্মেলনে এটি গঠিত হয়। এ সম্মেলনের ঘোষণা ছিল পাকিস্তানের জনসাধারণের জন্য একটি উন্নততর, সৃজনশীল ও সুনির্দিষ্ট জীবনধারা অর্জন করা। তৎকালীন শিক্ষাসচিব বিশিষ্ট  উর্দু ছোটগল্পকার কুদরতুল্লাহ শাহাবসহ কতিপয় উর্দু লেখকের উদ্যোগে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ আহমদ দেহলভী ছিলেন সম্মেলনের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি এবং ঢাকার লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী হিসেবে ছিলেন তৎকালীন বাংলা একাডেমীর পরিচালক  মুহম্মদ এনামুল হক

উক্ত সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৪৭জন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১৬৫জন লেখক এই সম্মেলনে যোগদান করেন। তাঁদের সবাইকে প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যরূপে গ্রহণ করে ওই বছর ৩১ জানুয়ারি পাকিস্তান লেখক সংঘ (Pakistan Writers’ Guild) গঠিত হয়। এর প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কুদরতুল্লাহ শাহাব এবং কার্যকরী সম্পাদক জমিলউদ্দীন আলী। লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিল মোট ২৫জন: বাংলা ১১, উর্দু ১১, পাঞ্জাবি ১, পশতু ১ এবং সিন্ধি ১জন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রথম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ইব্রাহিম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, সৈয়দ সাজ্জাদ হুসেন, বেগম শামসুন্নাহর মাহমুদ, আবদুল কাদির, দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, আসকার ইবনে শাইখ, আবুল হোসেন, মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ।

১৯৬০ সালের ২৪ এপ্রিল লেখক সংঘের প্রথম বার্ষিক সাধারণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সংঘের নিয়মাবলির কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করা হয়। সে অনুযায়ী ১১জন সদস্যের মধ্যে ৯জন নির্বাচিত হবেন এবং ২জন হবেন মনোনীত। কেন্দ্রীয় কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে ৯জন সদস্য নির্বাচিত হন তাঁরা হলেন বেগম ইউসুফ জামাল হোসেন, বেনজীর আহমদ, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা, আবদুল কাদির, ইব্রাহিম খাঁ, মতিনউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ সাজ্জাদ হুসেন ও আবুল হোসেন; মুনীর চৌধুরী ও রশীদ করিম মনোনীত সদস্য। উর্দুভাষী হিসেবে ঢাকার আহসান আহমদ আশক কেন্দ্রীয় কমিটিতে মনোনীত হন।

লেখক সংঘের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠা বছরই করাচি, লাহোর ও ঢাকায় এর তিনটি আঞ্চলিক শাখা গঠিত হয়। ঢাকা শাখার সদস্য সংখ্যা ছিল ২৫৩জন। শুরুতে এই আঞ্চলিক কেন্দ্রের কার্যকরী কমিটিতে ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবদুর রহমান খান, মতিনউদ্দীন আহমদ, আবদুল কাদির, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ নুরুদ্দীন, নুরুল মোমেন, বেনজীর আহমদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, তালিম হোসেন, আবদুর রশিদ খান, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ এবং এ.কে.এম আমিনুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে মতিনউদ্দীন আহমদ ছিলেন সেক্রেটারি এবং আবদুল কাদির কোষাধ্যক্ষ; পরের বছর সেক্রেটারি ছিলেন মুহম্মদ এনামুল হক ও কোষাধ্যক্ষ আশরাফুজ্জামান খান।

পাকিস্তান লেখক সংঘের পূর্বাঞ্চল শাখার নিজস্ব কোনো বাড়ি না থাকায় বাংলা একাডেমীর একটি কক্ষে এর অফিস খোলা হয়। সংঘের মুখপত্র হিসেবে পূরবী নামে একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়; এর সম্পাদক ছিলেন গোলাম মোস্তফা ও মুহম্মদ আবদুল হাই। মাত্র একটি সংখ্যা প্রকাশের পর এর নাম পরিবর্তন করে লেখক সংঘ পত্রিকা রাখা হয়। প্রথম বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে বেগম সুফিয়া কামালের নামটিও যুক্ত হয়। লেখক সংঘ পত্রিকা প্রথম বর্ষে এগারোটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর পুনরায় এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পরিক্রম; এ সময় সম্পাদক হন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও রফিকুল ইসলাম। ১৯৬৫ সালের অক্টোবর সংখ্যা থেকে পরিক্রমের সম্পাদক হন আবদুল গণি হাজারী, যুগ্ম সম্পাদক জাহানারা আরজু ও সহযোগী সম্পাদক শাহাবুদ্দীন আহমদ; পরে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তান লেখক সংঘ, পূর্বাঞ্চল শাখা থেকে কয়েকটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়, যেমন: নৌফেল ও হাতেম (ফররুখ আহমদ), আরো দু’টি মৃত্যু (হাসান হাফিজুর রহমান), মুখরা রমণী বশীকরণ (মুনীর চৌধুরী অনূদিত), বুলগেরিয়ার ছোট গল্প সংকলন (অনুবাদ ও সম্পাদনা: আবু কায়সার), হযরত মোহাম্মদের (দ.) জীবনী (মাওলানা মোস্তাফিজুর রহমান), মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য (আনিসুজ্জামান) ইত্যাদি। লেখক সংঘের পক্ষ থেকে আলাওল, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ কবির জন্মজয়ন্তী পালন করা হয়।

লেখক সংঘ লেখকদের শ্রেষ্ঠ কর্মের মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, দাউদ পুরস্কার (১৯৬৩), ন্যাশনাল ব্যাংক পুরস্কার (১৯৬৮), President’s Award for Pride and Performances ইত্যাদি প্রবর্তন করে। ১৯৬১ সালে রশীদ করিম উত্তম পুরুষ এবং আবদুর রাজ্জাক কন্যাকুমারী উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার লাভ করেন।

ষাটের দশকের শেষদিকে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে এক পর্যায়ে পাকিস্তান লেখক সংঘের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের সদস্যবৃন্দ ক্রমশ সংঘ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন; ফলে ১৯৭০ সালের পর এর কর্মকান্ড থেমে যায়। ওই বছর পরিক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।  [আবুল হাসনাত]

পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ (১৯৫২)  পাকিস্তান আমলে প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের প্রথম সংগঠন। প্রগতি লেখক সংঘের ধারায় সাম্যবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ ধ্যান-ধারণার বশবর্তী হয়ে কয়েকজন  লেখক পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠন করেন।  কাজী মোতাহার হোসেন সভাপতি এবং ফয়েজ আহমদ এর সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে আতোয়ার রহমান ও  হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আবদুল গনি হাজারী, কামরুল হাসান, অজিত কুমার গুহ, ফজলে লোহানী, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, মোস্তাফা নূরউল ইসলাম, আনিসুজ্জামান প্রমুখ এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের অবস্থান ছিল মৌলবাদী চেতনার বিপরীত। এর সংকল্প ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা। পাটুয়াটুলির  সওগাত পত্রিকার অফিসে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের নিয়মিত পাক্ষিক সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হতো। তাতে কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধপাঠ এবং এসব সম্পর্কে প্রাণবন্ত আলোচনা করা হতো। সাহিত্য সংসদের বিশেষ সভারও ব্যবস্থা ছিল। তাতে ম্যাক্সিম গোর্কি (১৯৫২),  বঙ্কিমচন্দ্র (১৯৫৩) ও রবীন্দ্রনাথকে (১৯৫৫) নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এ ছাড়াও ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ, কাজী আবদুল ওদুদ, মোহাম্মদ আকরম খাঁ-কে নিয়েও স্মৃতিচারণমূলক অনুষ্ঠান করা হয়েছে। হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রথম যে ঐতিহাসিক সাহিত্য সংকলন (১৯৫৩) প্রকাশিত হয়, তা এই সাহিত্য সংসদের উদ্যোগেই সম্পন্ন হয়। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সাহিত্য সম্মেলন এর আরো একটি সফল পদক্ষেপ ছিল। সম্মেলনে ১০৮ জন সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী যুক্ত প্রচারপত্রে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য ঐক্য গড়ে তোলার সংকল্প ব্যক্ত করেন; সেই সঙ্গে বিশ্বশান্তি ও মানবকল্যাণের জন্য সাহিত্যকর্ম রচনা করারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ-এর কার্যক্রম চালু ছিল। তখন পর্যন্ত এটি পূর্ব বাংলার নবীন ও প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের মুখ্য সংগঠন ছিল। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর এর বিলুপ্তি ঘটে। তখন এখানকার লেখক-বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তান লেখক সংঘ ও পাকিস্তান লেখক সংঘ পূর্বাঞ্চল শাখায় ব্যাপকভাবে যোগদান করেন। [ওয়াকিল আহমদ]