নিমতলী প্যালেস


নিমতলী প্যালেস  ঢাকায় মুগল শাসনের শেষ দিকে ১৭৬৫-৬৬ সালে নায়েব নাজিম অর্থাৎ ঢাকা-নিয়াবত অথবা ঢাকা প্রদেশের ডেপুটি-গভর্নরের বাসস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু এটি ঢাকা নগরের নিমতলী মহল্লায় অবস্থিত ছিল, তাই এটি জনসাধারণ্যে নিমতলী কুঠি অথবা নিমতলী প্যালেস নামে পরিচিত ছিল। নিমতলী দেউড়ি বাদে প্যালেসের বাকি সব অংশ বর্তমানে বিলীন হয়ে গেছে।

১৭১৪-১৫ সালের দিকে যখন সুবাহ বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করা হয় তখন নগরটিকে উপ-প্রদেশের, যা বর্তমান বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ নিয়ে গঠিত ছিল, ডেপুটি-গভর্নরের অবস্থানস্থল করা হয়। ডেপুটি-গভর্নর, যিনি সাধারণত নওয়াবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হতেন, ঢাকার অনেকগুলি পরিত্যক্ত প্রাসাদ অথবা দুর্গের একটিতে বসবাস করতেন। ১৭৬৩ সালে যখন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অফিসার লে. সুইনটন নগরটিতে প্রচন্ড আক্রমণ চালান, তখন নায়েব নাজিম নওয়াব জসরত খান, যিনি ঢাকার প্রধান দুর্গে (বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগার) বসবাস করতেন, ঢাকায় ছিলেন না। তিনি তখন বিহারে নওয়াব মীর কাসিমএর কারাবন্দি ছিলেন।

ব্রিটিশদের সাথে তাঁর বিরোধের সময় নওয়াব মীর কাসিম জানতে পারেন যে, নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার আদেশ অমান্য করে ঢাকায় ব্রিটিশদের রক্ষা করতে জসরত খান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তাই তিনি জসরত খানকে বন্দি করতে দীউয়ান মুহম্মদ বেগকে আদেশ দেন। জসরত খান ঢাকা থেকে পালিয়ে যান কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েন এবং তাঁকে বিহারের মুঙ্গেরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয়। লে. সুইনটনের ঢাকা আক্রমণ বস্ত্তত পরিচালিত হয়েছিল বন্ধুভাবাপন্ন ডেপুটি-গভর্নরকে রক্ষা করার জন্য। সুইনটন পুরাতন দুর্গে বসবাস করতে থাকেন।

জসরত খানের অতীতের সাহায্যকারী ভূমিকার কথা স্মরণ করে ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ কলকাতা কাউন্সিলের অনুমতি নিয়ে নওয়াব নাজমুদ্দৌলার নিকট জসরত খানকে ঢাকার নায়েব-নাজিম হিসেবে পুনর্নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। খান এরপর ঢাকা ফিরে আসেন। ঢাকা পৌঁছে তিনি দেখেন যে তাঁর বাসভবন ব্রিটিশরা দখল করে নিয়েছে এবং তাই তিনি মুগলদের আরেকটি পুরাতন প্রাসাদ বড় কাটরায় অবস্থান করেন। কলকাতা পরিষদ শীঘ্রই নায়েব-নাজিমের জন্য নতুন বাসস্থান তৈরি করতে সুইনটনকে নির্দেশ দেয়। নিমতলীতে নতুন প্রাসাদ নির্মাণের কাজ তাড়াহুড়া করে ১৭৬৬ সাল নাগাদ সম্পূর্ণ করা হয়।

নগরের উত্তর দিকে আধুনিক নিমতলী মহল্লা ও হাইকোর্ট ভবনের মধ্যবর্তী স্থানে নিমতলি প্রাসাদ অনেকটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বেশ কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ইমারতের সমবায়ে গঠিত ছিল। এর অবস্থান ছিল তৎকালীন শহর এলাকার ঠিক প্রান্তে, যার অধিকাংশ বনভূমিবেষ্টিত ছিল। এ কাঠামোগুলির কোনো সঠিক অথবা বিস্তারিত বিবরণ প্রদান করা সম্ভব নয়। কারণ এর অবস্থানের কোনো সমকালীন আখ্যান অথবা নকশা এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় নি। বর্তমানে বিদ্যমান একমাত্র গেট নিমতলী দেউড়ি বিচার করে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, এটি মুগলদের সচরাচর প্রাসাদের নকশা অনুসরণ করেই নির্মিত হয়েছিল, যেখানে অনেকগুলি গেট, অভ্যন্তরীণ অঙ্গন, নিভৃত বাসস্থান, প্রার্থনার জন্য নির্দিষ্ট স্থান, পুকুর অথবা পানির চৌবাচ্চা, সৈন্যদের ব্যারাক ও কর্মচারীদের আবাস, বাগান ও এ ধরনের অন্যান্য অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

উত্তর দিক থেকে শুরু হওয়া একটি সরু খাল, যেটি পূর্বদিকে অবস্থিত কমলাপুর নদী থেকে পানি পেত, প্রাসাদটিতে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করত। নওয়াবী দিঘি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ও শহীদুল্লাহ হলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত) নামে অভিহিত একটি বৃহৎ পুকুর এবং বর্তমান এশিয়াটিক সোসাইটি কমপ্লেক্সের দক্ষিণে অবস্থিত এক গম্বুজবিশিষ্ট নওয়াবী মসজিদটি এখনও বিদ্যমান।

যতদিন পর্যন্ত প্রাসাদটি নায়েব-নাজিমের বাসভবন ছিল, ততদিন এটি ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও নৃত্য, চিত্রাঙ্কন এবং চারু ও কারুকলার অন্যান্য বিষয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করে ঢাকায় মুগল সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করেছে এ প্রাসাদ। এখানে নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতো এমন একটি আনন্দময় অনুষ্ঠান ছিল ঈদ শোভাযাত্রা যা ঈদুল ফিতর উদ্যাপন উপলক্ষে বের করা হতো। এটি নিমতলী দেউড়ি থেকে শুরু হয়ে নগরের বিভিন্ন অংশ প্রদক্ষিণ করে আবার এখানে এসে শেষ হতো।

যদিও প্রাসাদ কমপ্লেক্সের অধিকাংশই তখন ছিল ধ্বংসাবশেষ, তবুও বিশপ হেবর, ১৮২৪ সালে নগরটি সফরে এসে এর একটি ভৌগোলিক বিবরণ রেখে গেছেন। তিনি একটি ‘যথার্থই নয়নাভিরাম গেটের (নিমতলী দেউড়ি)’ কথা উল্লেখ করেছেন। এটির ছিল ‘একটি উন্মুক্ত গ্যালারি যেখানে নওবুত অথবা সান্ধ্যকালীন রণসঙ্গীত বাজান হত; নবাবের কখনও ন্যায্য দাবি না হলেও সরকার তাঁকে প্রশ্রয় দেয়া চালিয়ে যেতে থাকে এ রকম সার্বভৌম মর্যাদার নিদর্শন ছিল...।’ তিনি ‘একটি অত্যন্ত সুদর্শন হলের, যেটি ছিল গথিক খিলান দ্বারা ভারবহনকারী, চতুর্দিকে বারান্দাবেষ্টিত এবং উচ্চ খিলানযুক্ত জানালাসহ অষ্টভুজাকৃতির,’ কথাও উল্লেখ করেছেন।

হেবরের উল্লিখিত ইমারতাদি ছাড়াও ছিল বারোটি দরজাবিশিষ্ট একটি কামরা যেটি বারোদুয়ারী নামে পরিচিত ছিল। বলা হয়ে থাকে যে, কক্ষটি বারোজন সর্দার অথবা নগরের মহল্লা নেতৃবৃন্দের আবেদনাদি শোনার নিমিত্ত দর্শনদানের জন্য পৃথক করে রাখা ছিল। তাঁরা দর্শনদানের সময় বারোটি দরজা দিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে হলে প্রবেশ করতেন। এ আবেদনাদি শোনার জন্য নির্দিষ্ট হলটি, যা ১৯১৪ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এক সময় ঢাকা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক এলাকাসমূহের অংশ আনোয়ার পাশা ভবনের অংশবিশেষ।

১৮৪৩ সাল পর্যন্ত নিমতলী প্রাসাদ নায়েব-নাজিমদের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে, যদিও ১৮২২ সালে সরকারিভাবে তাঁদের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। নওয়াবদের ভাগ্যের মতো প্রাসাদের ভাগ্য শুরু থেকে সর্বনেশে বলে নির্দেশিত ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক ক্ষমতা সংহতকরণের সঙ্গে সঙ্গে নায়েব-নাজিমগণ ক্রমান্বয়ে সকল সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যাবলি ও সেই সঙ্গে কর্তৃত্ব হারান। বস্ত্তত, ১৭৬৫ সালে কোম্পানি ‘দীউয়ানি’ লাভ করলে নায়েব-নাজিমের ভূমিকা পেনশনভোগীর পর্যায়ে নেমে আসে। নওয়াবকে পরবর্তীকালে মাসিক পেনশন হিসেবে নগণ্য ৬০০০/- টাকা দেওয়া হয়। এতে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই যে সকল ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা ও তহবিল সপূর্ণরূপে খোয়ানোর ফলে তাঁর পক্ষে এ বৃহৎ প্রাসাদ কমপ্লেক্সটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যা দরকার তা সরবরাহ করা সম্ভব হয় নি।

এ প্রাসাদের বাসিন্দাদের মধ্যে যারা সুবিখ্যাত তাঁদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন হলেন জসরত খানের পৌত্র ও উত্তরাধিকারী নওয়াব হাসমত জং ও নওয়াব নুসরত জং। শেষোক্ত জনের লেখক হিসেবে কিছুটা সুখ্যাতি ছিল। কুখ্যাত বসবাসকারী ছিলেন সর্বশেষ নায়েব-নাজিম নওয়াব গাজীউদ্দীন, যিনি পাগলা নওয়াব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি পারিবারিক দখলে থাকা সকল সম্পদ উড়িয়ে দেন, অত্যন্ত অসচ্চরিত্র জীবনযাপন করেন এবং ১৮৪৩ সালে মারা যান। তখন থেকে প্রাসাদটির মালিকানা অনেকবার বদল হয়েছে। কিছু সময়ের জন্য কমপ্লেক্সটির মালিকানা কোম্পানি নিজেদের হাতে রাখে এবং তারপর নিলামের মাধ্যমে সেখানকার দালানকোঠাসমূহ ও জমি বিক্রি করা শুরু করে। দুঃখজনকভাবে নতুন মালিকগণ কমপ্লেক্সের প্রায় সকল দালানকোঠা ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে ফেলেন। বারোদুয়ারী অনেকবার হাতবদল হয় এবং এক সময় জনৈক মৌলভী মঈনুদ্দীন এবং তার নিকট থেকে রূপলাল দাস এটি কিনে নেন। তারা দুজন ছিলেন যথাক্রমে ঢাকার বিখ্যাত জমিদার ও ব্যাংকার। উনিশ শতকের আশির দশকে ব্রাহ্মদের নববিধান সম্প্রদায় নিমতলী প্যালেস অঞ্চলে তাদের সদর দফতর স্থাপন করে এবং এর নাম দেয় বিধান পল্লী। এভাবে এ এলাকায় নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় বাতাবরণের সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে বিশ শতকের প্রথম দিকে যখন ঢাকায় নতুন রাজধানী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছিল তখন সরকার পুরো নিমতলী এলাকা হুকুম-দখল করে।

এভাবে ঢাকার নায়েব-নাজিমদের প্রাসাদ ও এর আশপাশের ভূমি অনেক উত্থান-পতন ও মালিকানার হাতবদলের পর শেষ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদে পরিণত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ভবন সংলগ্ন টিকে থাকা একমাত্র প্রবেশকক্ষটি নিমতলী প্রাসাদের অস্তিত্বের নিঃসঙ্গ সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।  [শরীফ উদ্দিন আহমেদ]