ধাঙড়


ধাঙড় (মেথর, ঝাড়ুদার)  একটি পেশাজীবী সম্প্রদায় যারা শহর, নগর, বন্দর, গঞ্জ বা জনবহুল এলাকায় বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা সাফ করে থাকেন। স্থানীয় হাটবাজারে এরা মেথর, ভূঁইমালি বা ঝাড়ুদার হিসেবেও পরিচিত। ধাঙড় শব্দটির অর্থ পশুপালক বা কৃষক। ধান + গড় এ শব্দদুটি মিলে ধাঙড় হয়েছে। ধাঙড়দের সম্পর্কে ভারতীয় ব্রহ্মপুরাণ-এর কাহিনীতে বলা হয়েছে, মুনি বিশ্বামিত্রের অভিশাপের ফলে তার কয়েকজন পুত্রের অপত্যগণ ‘অন্ধ্র’ শ্রেণির নীচ জাতিতে পরিণত হয়। পরে তাদের স্থান দেওয়া হয় আর্যদেশের বাইরের প্রান্তভাগে দক্ষিণ এলাকায় বিন্ধ্য পর্বতের কাছে। সেখানে তারা কারহা উপত্যকার পাশ ধরে বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে বসবাস করতে থাকে। তাদের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষিকাজ ও পশুপালন। ভূমিহীন ধাঙড়দের কোনো স্থায়ী বাসস্থান ছিল না। ফসল বোনা ও কর্তনের সময় তারা ভূস্বামীদের জমিতে অস্থায়িভাবে ঘর তৈরি করে বসবাস করত। পরে অন্যত্র চলে যেত। এভাবে তারা জীবন ও জীবিকার তাগিদেও দাক্ষিণাত্য ছেড়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে এদের পেশাও বদল হয়। কৃষি ও পশুপালন ছেড়ে তারা গ্রহণ করে ময়লা ও আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ।

প্রাচীন বাংলায় মেথর বা ধাঙড় বৃত্তিধারীদের সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কোনো কিছু জানা না গেলেও বিভিন্ন সূত্রে সমগোত্রীয় বৃত্তিজীবীদের কথা জানা যায়। হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতিভেদ প্রথা অনুযায়ী প্রাচীন ভারত ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কতিপয় পেশাজীবী ছিল, যাদের অস্তিত্ব পরবর্তীকালেও বজায় থাকে। এরা হচ্ছে চামার, কামার, কুমার, জেলে, ব্যাধ, জোলা,  ডোম, যাযাবর। সমাজে এদের স্থান ‘অস্পৃশ্য’ অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রের বাইরে ‘পঞ্চম’ হিসেবে। অভিজাত উঁচু শ্রেণির স্পর্শ থেকে অনেক দূরে ছিল এদের অবস্থান। তাদের ধরা-ছোঁয়া বা খাওয়া কোনো জিনিস ব্যবহার করাও অভিজাত হিন্দুদের কাছে শুধু নিষিদ্ধ নয়, পাপ হিসেবেও গণ্য ছিল। ধাঙড়রা সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও উঁচু বর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে মন্দিরে বসে উপাসনার অধিকার থেকে বঞ্চিত। ভারতবর্ষের মানবতাবাদী নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বিশ শতকের প্রথম দিকে ধাঙড়সহ অন্ত্যজ শ্রেণির লোকদের ‘হরিজন’ হিসেবে আখ্যা দেন।

ঢাকায় পেশাজীবী হিসেবে মেথর বা ধাঙড়দের আবির্ভাব হয় ১৬২৪-২৬ খ্রি.। ঐ সময়  মগ দস্যুরা ঢাকায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়। এ ধ্বংসযজ্ঞের লাশ সরানোর জন্য মেথর নিয়োগ করা হয়। ১৮৩০ সালে ঢাকা কমিটি এবং ১৮৬৪ সালে ঢাকা পৌরসভা গঠনের পর নগর জীবনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটিও পৌর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে ধাঙড়রা বেতনভোগী শ্রমিক বা দিনমজুরির ভিত্তিতে ময়লা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ নেয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হয়। পৌরসভার দায়িত্ব তখন আরও বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে শুরু হয় বাড়তি ধাঙড় সংগ্রহ। পৌর কর্তৃপক্ষ তখন ভারতের কানপুর, মাদ্রাজ ও নাগপুর থেকে দরিদ্র ধাঙড় (নারী ও পুরুষ) আনার ব্যবস্থা করে। পৌরসভায় তাদের চাকরিসহ নির্দিষ্ট এলাকায় (যেমন, টিকাটুলি, আগা সাদেক রোড) বসবাসের স্থান দেওয়া হয়। পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যান্য শহরেও ধাঙড় বা মেথর নিয়োগ করা হয়। ১৯৪০-এর দশকে যুদ্ধ, অভাব, দেশভাগ ইত্যাদি কারণে চরম সংকটের সৃষ্টি হয়। তখন বাধ্য হয়ে অনেক দেশিয় বাঙালি পৌরসভায় ধাঙড়বৃত্তি গ্রহণ করে। তবে তারা প্রাথমিক পর্যায়ে হালকা ধরনের কাজ, যেমন রাস্তাঘাট বা অফিস আদালতে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ নেয়। ১৯৭৪ সালে বন্যাপরবর্তী দুর্ভিক্ষের কারণে আরও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এ পেশায় নিয়োজিত হয়।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থানরত ভারত থেকে আগত ধাঙড়দের মধ্যে মাদ্রাজি, কানপুরি ও নাগপুরিই প্রধান। এদের জীবনাচার ও সমাজ-ব্যবস্থার মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। মাদ্রাজিদের মুখের ভাষা তেলেগু বা তামিল। আর নাগপুরি ও কানপুরিদের মুখের ভাষা হিন্দি বা হিন্দি-উর্দু মিশ্রিত। সব পুরুষই ধুতি, পাগড়ি ও হাতকাটা আচকান পরে থাকে। তবে তারা আজকাল প্যান্ট-শার্টও পরে। মেয়েরা পরিধান করে শাড়ি ও ব্লাউজ, আর অলঙ্কার হিসেবে পরে দুল, গোটা, বিছা, চুড়ি, হাঁসুলি, নাকফুল, হার, কড়া ইত্যাদি। পুরুষ ধাঙড়রা বীরত্বের প্রতীক হিসেবে শরীরে সাপ, ভালুক, সিংহ, বাঘ ও ষাঁড়ের  উল্কি এuঁক থাকে। আর মেয়েরা কোমলতার প্রতীক হিসেবে শরীরে নানা ধরনের ফুলের উল্কি অাঁকে। অনেক ধাঙড়ই উপার্জনমূলক কাজ হিসেবে শূকর পালন করে।

ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে ধাঙড়রা শত শত বছর ধরে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। কিছু দরদি ও সচেতন ব্যক্তির প্রয়াসে এদের উন্নতি ও কল্যাণের জন্য কিছু সংগঠন গঠিত হয়েছে। ১৮৭৩ ভারতের ভারতের মহারাষ্ট্রে গঠিত হয় সত্যসাধক সমাজ। ১৮৯২ সালে স্থাপিত হয় মাদ্রাজ আদি দ্রাবিড় জনসভা। ১৯৩২ সালে মহাত্মা গান্ধীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় অস্পৃশ্যতা বিরোধী লীগ। শেষোক্ত সংগঠনটি হরিজন সেবক সংঘ নামে পরিচিতি হয়। বি.আর আম্বেদকারের উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে একটি শ্রমিক সংগঠন এবং ১৯৪২ সালে সিডিউল কাস্ট ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৬ সালে ঢাকায় গঠিত হয় ঢাকা জেলা ধাঙড় ইউনিয়ন। ১৯৪১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় হরিজন সেবক সমিতি, বর্তমানে যা বাংলাদেশ হরিজন সেবক সমিতি নামে পরিচিত।  [অনুপম হায়াৎ]