দাখিল দরওয়াজা


দাখিল দরওয়াজা অর্থ প্রবেশদ্বার (আরবি-দাখিল, ফারসি-দরওয়াজা)। সুলতানি বাংলার স্থাপত্যের ইতিহাসে এটি এ ধরনের সর্ববৃহৎ নিদর্শন। এটি ছিল মুসলিম শাসকদের কাছে লখনৌতি নামে পরিচিত গৌড়-দুর্গের প্রধান প্রবেশপথ এবং বাংলায় সর্বকালের সবচেয়ে সুদৃঢ় ও সুন্দর প্রবেশ-তোরণ।

দাখিল দরওয়াজা

সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯) গৌড়ের নগরদুর্গ নির্মাণকালে এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে যে মত প্রকাশ করা হয়েছে তা সমর্থনযোগ্য নয়। পরবর্তী ইলিয়াস শাহী শাসকদের রাজধানী শহরের জামে মসজিদ গুণমন্ত মসজিদ এর প্রবেশ-তোরণই যখন দীর্ঘকাল স্থায়ী হওয়ার মতো করে নির্মাণ করা সম্ভব হয় নি, তখন দাখিল দরওয়াজার মতো সুদৃঢ় এবং সুষম একটি স্থাপত্য নিদর্শন নির্মাণের বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। এমনকি নিকটবর্তী পান্ডুয়াতে, যেখানে দ্বিতীয় ইলিয়াসশাহী সুলতান এবং বাংলার স্বাধীন শাসকদের মধ্যে প্রথম সার্থক নির্মাতা সিকান্দর শাহ বাংলার বৃহত্তম জামে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন, সেখানেও আমরা এ ধরনের কোনো উদাহরণ পাই না। এ প্রবেশ-তোরণটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত পরিশীলিত এবং এরূপ পরিশীলিত ইমারত কেবল তখনই নির্মিত হতে পারে যখন স্থাপত্যশিল্প পরিপূর্ণতা অর্জন করে। এ কারণে দাখিল দরওয়াজা হোসেনশাহী আমলে নির্মিত বলে ধরে নেয়া যায়। পর্তুগিজ দোভাষি এন্টোরিও ডি ব্রিট্টো (১৫২১) দাখিল দরওয়াজার সামনের এক কোণে একটি মসজিদের অবস্থানের কথা বর্ণনা করেছেন। তাই এমনও হতে পারে যে, বড় সোনা মসজিদের নির্মাতা আলাউদ্দীন হোসেন শাহই এ প্রবেশ-তোরণ নির্মাণ করেছেন। দুটি স্থাপত্য নিদর্শনের রাজকীয় আবহ দেখেও এদেরকে একই সময়ের বলে মনে হয়। সম্ভবত নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহ কর্তৃক দুর্গ নির্মাণকালে নির্মিত দুর্বল একটি তোরণের স্থলে পরবর্তীকালে এ মজবুত তোরণটি নির্মিত হয়েছিল। দুর্বল নির্মাণশৈলীর কারণেই দুর্গের ভেতরের একই ধরনের দুটি তোরণ চান্দ দরওয়াজা ও নিম দরওয়াজা ধ্বংস হয়ে গেছে।

ভেতরের প্রবেশপথে মাঝের ভারি স্তম্ভগুলি ছাড়া তোরণটি সম্পূর্ণ ইটনির্মিত। স্তম্ভের খিলানের উত্থানরেখা পর্যন্ত রয়েছে পাথরের আবরণ। ১০২.৫ মিটার দীর্ঘ এবং ২২.৫ মিটার প্রশস্ত এ তোরণের মাঝ বরাবর রয়েছে ৪.৫ মিটার প্রশস্ত একটি গলিপথ। এ গলিপথের দুধারে আছে দুটি প্রহরা-কক্ষ। এগুলির পরিমাপ দৈর্ঘে ২২.৭ মিটার এবং প্রস্থে ২.৯ মিটার। প্রতি দিকে চারটি করে ছোট প্রবেশপথ দিয়ে গলিপথ থেকে এ প্রহরা-কক্ষে প্রবেশ করা যায়। এছাড়া উভয় প্রহরা-কক্ষেই বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উল্টা দিকে রয়েছে আরও দুটি করে দরজা। আলেকজান্ডার কানিংহাম এর দেওয়া পরিমাপে এ তোরণের উচ্চতা ১৪.৯৫ মিটার। প্রবেশপথের খিলানটি ১০.৩৫ মিটার উচুঁ। প্রশস্ততর খিলান পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট খিলান-পথ হয়ে ‘ভল্ট’ আকারের গলিপথটিতে প্রবেশ করতে হয়। প্রবেশপথের প্রশস্ত খিলানটি ঈওয়ান-এর আকারে প্রক্ষিপ্ত। এর দুপাশে রয়েছে বিশাল আকৃতির ১২ ভুজবিশিষ্ট পার্শ্ববুরুজ যা এ ইমারতটির পুরো স্থাপত্যিক নকশার সঙ্গে চমৎকারভাবে মানানসই এক মহান শাসকের সম্মান ও মর্যাদার উপযোগী একটি প্রবেশপথের ধারণা সৃষ্টি করেছে। বড় সোনা মসজিদছোট সোনা মসজিদ এর প্রবেশ-তোরণগুলির সঙ্গে তুলনা করলে যুক্তিসঙ্গত কারণেই মনে হয় যে, এ তোরণটির কার্নিসও ছিল বক্রাকার।

তোরণটির অংলকরণে প্রাচুর্য নেই। সমকালীন অন্যান্য ইমারতের মতোই এখানে সম্পূর্ণ অলংকরণই পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা) ভিত্তিক। ভিত্তি বরাবর রয়েছে ছাঁচে ঢালা অলংকরণের সারি আর পার্শ্ববুরুজগুলিকে ঘিরে রয়েছে নিচু জালি নকশা, যেগুলিকে বিভক্ত করা হয়েছে উল্লম্বভাবে বিন্যস্ত অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশ (অফসেট), আর জানালার আকৃতির খিলানকৃত প্যানেল দিয়ে। এ প্যানেলের ভেতরে রয়েছে ঝুলন্ত নকশা আর খিলানের ‘স্প্যানড্রেল’-এ রয়েছে গোলাপ-নকশা। অভ্যন্তরের খিলানসমূহের ওপরে এবং দুদিকেরই বহিস্থ খিলানসমূহের দুপাশে ব্যবহূত এ খিলানাকৃতি জানালার নকশা সুলতানি বাংলার স্থাপত্যে ব্যবহূত বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ অলংকরণের চমৎকার নিদর্শন। দৃষ্টিনন্দন এ অলংকরণের বিকাশ ঘটেছিল পান্ডুয়া-ফিরুজাবাদের  আদিনা মসজিদএ। গৌড়-লখনৌতির ইমারতসমূহের মধ্যে দাখিল দরওয়াজাই সবচেয়ে জাঁকাল ও রাজোচিত ইমারত।  [এ.বি.এম হোসেন]